দ্য ওয়াল ব্যুরো: শহরের দুুই প্রান্তে দুই ঘটনা ঘটেছিল বুধবার। সাতসকালে খবর আসে, ইএম বাইপাসে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় তিন জন আহত হয়েছেন। প্রায় একই সময়ে জানা যায়, ট্যাংরার একটি বাড়িতে এক কিশোরী-সহ তিন মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করেছেন বলে অনুমান।
শহর কলকাতায় এমন নানা চাঞ্চল্যকর ঘটনা বিরল নয়। কিন্তু এই দুটি ঘটনা বিরল হয়ে গেল, যখন দু'টি ঘটনার মধ্যে বেরিয়ে এল যোগসূত্র। যে দুই গৃহবধূর দেহ উদ্ধার হয়েছে ট্যাংরায়, তাঁদেরই দুই স্বামী দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন বাইপাসে। তাঁরা দুই ভাই। মৃতেরা তাঁদেরই দুই স্ত্রী। ট্যাংরায় বধূদের সঙ্গেই মৃত ছোটভাইয়ের কিশোরী মেয়ে, আবার বাইপাসে স্বামীদের সঙ্গেই আহত বড়ভাইয়ের কিশোর ছেলে।
অদ্ভুত এই কাণ্ডে অঙ্ক মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। প্রাথমিক ভাবে ট্যাংরার বাড়িতে হাতের শিরা কাটা মহিলাদের আত্মহত্যার তত্ত্ব উঠে এলেও, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট, খুন হয়েছেন তাঁরা। আবার দুর্ঘটনায় আহত দুই ভাই পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, সপরিবার আত্মহত্যা করবেন বলেই, স্ত্রীদের মৃত্যুর পরে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে গোটা তদন্ত এখনও বিশবাঁও জলে।
তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে বিস্মিত প্রতিবেশীরা। কারণ ট্যাংরার অটল শূর রোডে, একসঙ্গে, একপাড়ায় থেকেও, রোজ দেখাসাক্ষাৎ হয়েও, ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পাননি তাঁরা। ভাই এই পরিবারের মধ্যে এমন কিছু ঘটতে পারে, তা কল্পনাও করেননি।
শুধু কি তাই?
ঘটনার দু'দিন আগেই, রবিবার, দে পরিবারের ছোট বউ রোমি দে মুদিখানার কিছু জিনিসও অর্ডার করেছিলেন। সেই অর্ডার যথাসময়ে পৌঁছে দেন পাড়ারই দোকানদার দিলীপ সাউ। দিলীপ জানান, দে পরিবারের দুই গৃহবধূর সঙ্গেই তাঁর মাঝেমাঝে যোগাযোগ হতো, ওঁরা সাধারণত হোয়াটসঅ্যাপে জিনিসের লিস্ট পাঠাতেন। রবিবারও তাই করেছিলেন। তিনি সময়মতো পৌঁছে দিয়েছিলেন।
দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী শিপ্রা দাস জানিয়েছেন, দে পরিবারের বড় বউ সুদেষ্ণা দে ছিলেন খুবই অমায়িক স্বভাবের। প্রতিবেশীদের বাড়িতে নিয়মিত নিমন্ত্রণ করতেন, বিশেষত পুজোর সময়। বাড়ির ছোট মেয়ে প্রিয়ম্বদাও সবার প্রিয় ছিল। শিপ্রা বলেন, 'ওদের কখনও খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি, তবুও এখন যা ঘটল, সন্দেহ হচ্ছে অনেক কিছুই।' এই সন্দেহের তির মূলত বাড়ির দুই কর্তা প্রণয় ও প্রসূন দে-র দিকে। দুর্ঘটনা ঘটিয়ে হাসপাতালে ভর্তি তাঁরা।
সব মিলিয়ে বাড়ির তিন মহিলা সদস্যের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউ।
এদিকে আহতদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ প্রথমে জানতে পারে, পরিবারের ছয় জনই ঘুমের অষুধ খেয়েছিলেন সোমবার কিন্তু মঙ্গলবার সকাল হতে ঘুম ভেঙে যায় প্রণয়, প্রসূন ও নাবালকের। সম্ভবত পরিবারের মৃত তিন সদস্য সেসময় ঘুমোচ্ছিলেনই। পুলিশের অনুমান, পরে তাঁদের শিরা কেটে খুন করা হতে পারে।
অন্যদিকে, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টও বলছে, মৃত তিনজন আত্মহত্যার করেননি। তাঁদের খুন করা হয়েছে। হাতে শিরা কাটার ধরন তিনজনেরই এক। কারও পক্ষে এভাবে আত্মহত্যা করা সম্ভব নয় বলেও মনে করা হচ্ছে। পুলিশ রিপোর্ট সূত্রের দাবি, বাড়ির বধূ রোমির গলায় একটি ক্ষত ছিল। এছাড়াও দুই হাতের কব্জির শিরা কাটা ছিল। হাতের শিরা কাটা ছিল সুদেষ্ণাদেবীরও। তাঁরও দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। একাধিক ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গিয়েছে নাবালিকা কিশোরী প্রিয়ম্বদার দেহেও।
সূত্রের দাবি, বিষ মেশানো খাদ্য খাওয়ার ৩ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ওই তিনজনের। যা থেকে পুলিশের অনুমান, খাদ্য বিষক্রিয়ার পাশাপাশি মৃত্যু নিশ্চিত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে দুই বধূর হাতের কব্জি কেটে দেওয়া হয়েছিল।
এই গোটা ঘটনায় এখনও পর্যন্ত পুলিশি তদন্তে যে বিষয়টি বেশি করে ধরা পড়েছে, তা হল আর্থিক অনটন। এমনিতে দে পরিবারের ব্যবসা নেহাত ছোট ছিল না। তারা মোট ছ'টি সংস্থা চালাত। তবে প্রথমদিকে এই সব ব্যবসা ভাল চললেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দে পরিবারের অর্থনীতি। দেনার পরিমাণ বাড়তে থাকে। পাওনাদারদের দাবিও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। বহু ব্যবসায়িক চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ফলে প্রচণ্ড আর্থিক চাপে পড়ে গোটা পরিবার। জানা যায়, অন্তত ৬টি এজেন্সি থেকে কয়েক কোটি টাকার ঋণও নিতে হয়েছিল।
এখন সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই, দেনার চাপেই কি এই খুনখারাপি, নাকি অন্য কোনও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল এই পরিবার।