
শেষ আপডেট: 14 January 2024 18:05
শত শত রোগীর ভরসা এঁদের কাঁধ। শনিবার দুপুর পর্যন্ত গঙ্গাসাগরে মোট পুণ্যার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৫ লক্ষ। সোমবার ভোরে অনেকেই মকর স্নান করে ফিরে যাবেন নিজের নিজের জায়গায়। অনেকদিন আগে থেকেই এই সাগর তটে লোকজনের আসা শুরু হয়ে গেলেও রবিবার ভিড় সর্বোচ্চ সীমা ছোঁবে বলে ধারণা করছেন কতৃপক্ষ।
যে কোনও তীর্থক্ষেত্রে বা ভিড়ের জায়গায় মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। গঙ্গাসাগরও এর ব্যতিক্রম নয়। জায়গায় জায়গায় মেডিক্যাল ক্যাম্প, বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন সংস্থা দিনরাত কাজ করে চলেছে পুণ্যার্থীদের সমস্যা সমাধানে।
সাগরে যেদিন থেকে এসেছি সেদিন থেকেই কানে আসছে হারিয়ে যাওয়ার গল্প আর অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা। ক্যাম্প থ্যেকে বেরোলেই শুনতে পাচ্ছি, "দু'নম্বর ঘাটের কাছে একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মেলায় উপস্থিত থাকা স্বেচ্ছাসেবকরা বা মেডিক্যাল ক্যাম্পের লোকেদের জানানো হচ্ছে অতি শীঘ্রই এখানে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চলে আসার জন্য।"
সেই মতো কাজ হচ্ছেও। আজ রবিবার সকালে মেলা চত্বরে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল এক খালি অ্যাম্বুলেন্স। ভিড় ঠেলে রোগীর কাছে এসে পৌঁছতেই পারছে না সেটা। ওদিকে রোগীর শরীর খারাপ হচ্ছে ক্রমেই। তড়িঘড়ি সামনে থাকা কিছু পুলিশকর্মী এগিয়ে এসে ভিড় সরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের যাওয়ার রাস্তা করে দিলেন। দেখলাম পাশেই এক নম্বর ঘাটের কাছে ক্যাম্প বসিয়েছে একটি সর্বভারতীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। নাম, রো রয়েল লাইফ সেভিং সোসাইটি। সারা দেশ তথা পৃথিবী জুড়েই তাঁরা এই ধরনের চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন।
তাঁদের ক্যাম্পে সারাক্ষণই উদ্বিগ্ন মানুষের যাতায়াত। কারও পেটে ব্যথা, কারও মাথা ব্যথা, কারও জ্বর, কারও বা শ্বাসকষ্ট। নানা রকমের সমস্যা নিয়ে শয়ে শয়ে পুণ্যার্থীদের যাওয়া আসা লেগেই আছে এখানে। মেলায় কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হচ্ছে এই ক্যাম্পে। খুব গুরুতর অসুস্থ না হলে সেখানেই ডাক্তার দেখে ওষুধপত্র দিয়ে দিচ্ছেন। তবে তাতেও সমস্যা না মিটলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্থানীয় গ্রামীণ হাসপাতালে। আর যদি রোগীর অবস্থা সঙ্কটজনক হয়, তাহলে তাঁকে নিয়ে চলে আসা হচ্ছে গঙ্গাসাগর মেলার হেলিপ্যাড গ্রাউন্ডে। সেখান থেকেই এয়ারলিফট করে রোগীকে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কলকাতার সরকারি হাসপাতালে।
ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা ডাক্তার রবীন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তাঁদের এখানে মেডিক্যাল ইউনিটের পাশাপাশি রয়েছে লাইফ সেভিং ইউনিটও, যার কাজ জলে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে সেখান থেকে তীর্থযাত্রীদের উদ্ধার করা। এবারে এখনও পর্যন্ত প্রায় ২৭-২৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে। অন্যদিকে প্রায় ৩৭৫০০ জন মানুষকে তাঁদের ক্যাম্পেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছে রয়েল লাইভ সেভিং সোসাইটি।
জানা গেছে, রবিবার পর্যন্ত ৭ জন রোগীকে এয়ার লিফ্ট করে পাঠানো হয়েছে কলকাতায়। তাঁদের মধ্যে ৬ জনকে কলকাতার এমআর বাঙুর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। একজনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এসএসকেএম হাসপাতালে। মেডিক্যাল ক্যাম্প থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগীকে হেলিপ্যাড পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, সেখান থেকে এয়ারলিফট করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া, এই পুরো সময়টাই সঙ্গে থাকেন একজন চিকিৎসক এবং একজন নার্স। রোগীর অবস্থার কথা ভেবেই যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তাঁরা, জানালেন হেলিপ্যাডে কর্মরত নার্স নমিতা মোদক।
সারাদিনে সর্বোচ্চ ৩ জন রোগীকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে এয়ার লিফ্ট করে। এছাড়া রয়েছে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা। রোগী বেশি থাকলে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স করেও নিয়ে যাওয়া হয়। ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে কচুবেড়িয়া ঘাটে।
হেলিপ্যাডে কর্মরত গ্রুপ ক্যাপ্টেন ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তিনি গর্ববোধ করছেন এতজন মানুষকে এই এয়ারলিফ্ট পরিষেবা দিতে পেরে। গঙ্গাসাগর কতৃপক্ষ রাজ্য সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে পরিকল্পনা করে খুব সুন্দরভাবে সব ব্যবস্থা করেছে। হেলিকপ্টারে মজুত আছে সমস্ত মেডিক্যাল সরঞ্জাম।
মেডিক্যাল এমার্জেন্সিতে হেলিপ্যাড কীভাবে অপারেট করে, জানা গেল ক্যাপ্টেনের থেকেই। জানালেন, বায়ুর চাপ ঠিকঠাক থাকলে খুব তাড়াতাড়ি রোগীকে নিয়ে কলকাতায় রওনা দেয় হেলিকপ্টার। মেলার মাঠের একদম মাঝে রয়েছে দুটো বেলুন তাতে লেখা 'লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড'। সেই বেলুন সবসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বেলুন সোজাসুজি দাঁড়িয়ে থাকলে হেলিকপ্টারের ক্যাপ্টেন বুঝে যান যে বায়ুর চাপ ঠিকঠাক আছে, তখন এসে নামেন গঙ্গাসাগর হেলিপ্যাডে। তারপর রোগীকে নিয়ে রওনা হন কলকাতার উদ্দেশে।