
শেষ আপডেট: 3 July 2023 05:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত মঙ্গলবার ফ্রান্সে এক ১৭ বছর বয়সি তরুণকে গুলি করে মেরেছিল পুলিশ। তার পর থেকেই বিক্ষোভের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে রাজধানী প্যারিস সহ প্রায় গোটা ফ্রান্স (France unrest)। টানা প্রায় চারদিন প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বিভিন্ন শহরে। বিপুল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করেও যা এখনও থামানো যায়নি।
উত্তেজিত জনতা সরকারি অফিস কাছারিতে ঢুকে পড়ে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, গাড়ি ভাঙচুর করছে, বহুতলের কাচে ঢিল মেরে ভেঙে দিচ্ছে—সবমিলিয়ে লন্ডভন্ড অবস্থা ফ্রান্সের।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল মাকরঁ। ১৭ বছরের তরুণকে গুলি করে মারার ঘটনার নিন্দা করেছেন তিনি। কিন্তু তাতেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি পরিস্থিতি।

কী থেকে লাগল এই আগুন?
প্যারিসের উপকণ্ঠে রয়েছে একটি মফস্বল শহর। তার নাম নানতের। সেখানে মায়ের সঙ্গে থাকত আলজেরিয়ার বংশোদ্ভূত ১৭ বছরের তরুণ নাহেল। গত মঙ্গলবার ট্রাফিক স্টপে তার গাড়ি আটকায় পুলিশ। সেই সময়ে পথ চলতি এক ব্যক্তি গোটা ঘটনাটা ভিডিও রেকর্ড করে নেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, গাড়িটা থামিয়ে দুই পুলিশ অফিসার মাথা ঝুঁকিয়ে কথা বলছেন। একজনের হাতে রয়েছে একটি পিস্তল। তার পর হঠাৎই ওই অফিসার গুলি করে দেন নাহেলকে।

ওই পুলিশ অফিসারের দাবি, তাঁর আশঙ্কা ছিল যে ওই যুবক পালানোর চেষ্টা করছে। এত জোরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসবে। তাতে অন্য লোকের প্রাণ যেতে পারে।
স্বাভাবিকভাবে ওই পুলিশ অফিসারের যুক্তি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি অনেকেরই। ফ্রান্সের পুলিশ তাঁকে আটক করে খুনের মামলার তদন্ত শুরু করেছে।

এর পর থেকেই প্রতিবাদ, বিক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করে ফ্রান্স জুড়ে। ‘দ্য পুলিশ কিলস’ স্লোগান তুলে শয়ে শয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, জাতিগত পক্ষপাতে আক্রান্ত ফরাসি পুলিশ। আলজেরিয়া, মরক্কো থেকে আসা ফ্রান্সের উদ্বাস্তু, ফরাসি মুসলমানদের সঙ্গে এরকমই বৈষম্যমূলক আচরণ করে তারা।
প্যারিসের উপকন্ঠে ছোট ছোট মফস্বল এলাকায় আলজেরিয়ান, মরক্কো উদ্বাস্তু পরিবারগুলি থাকে। ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে রয়েছে। তাদের বক্তব্য, ফ্রান্সের সাদা চামড়ার নাগরিকদের আলজেরিয়ার উপর অত্যাচারের ঔপনিবেশিক মানিসকতা এখনও যায়নি। সেই কারণেই বিনা কারণে পুলিশ ১৭ বছরের এক তরতাজা ছেলেকে গুলি করে মেরে দিল।

ফ্রান্সের অনেক সমাজকর্মীর মতে, নাহেলের জাতিই মূল আক্রোশের কারণ। ফ্রান্সে সংখ্যালঘুদের প্রতি সরকারের একাংশের মানসিকতা খুব খারাপ। ধর্মনিরপেক্ষতা ফ্রান্সের সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ। দেশের সংবিধান অনুযায়ী জাতপাত, বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে কোনও বৈষম্য চলবে না।

কিন্তু কাগজেকলমে তা থাকলেও সমাজকর্মীদের মতে, সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে সাদা চামড়ার ফরাসি নাগরিকদের তুলনায় আলজেরিয়া, মরক্কো থেকে আসা উদ্বাস্তু বা কৃষাঙ্গ ফরাসিদের প্রতি পুলিশের আচরণে বৈষম্য রয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ বা আরবদের উপর অনেক বেশি অত্যাচারী ফরাসি পুলিশ।
অনেকের মতে, বৈষম্য নিয়ে মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত রাগ ছিলই। নাহেলের মৃত্যু সেই আগুন উস্কে দিয়েছে। বিক্ষোভ এমন সুনামির মতো আছড়ে পড়েছে যে প্রথমে দিশেহারা হয়ে পড়ে ফরাসি পুলিশ। গোটা দেশ জুড়ে অন্তত চল্লিশ হাজার পুলিশ নামানো হয়েছে এই দাঙ্গা পরিস্থিতি দমন করতে। প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২০০ জন পুলিশ অফিসার।

শুধু প্যারিসেই পাঁচ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গেরার্ড দারমানিন জানিয়েছেন, দেশে শান্তি পরিস্থিতি ফেরাতে নিরাপত্তা অফিসারদের সমস্ত রকম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই অস্থির পরিস্থিতি চলতে দেওয়া যায় না।

তবে গোটা ঘটনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছে মাকরঁ প্রশাসন। ২০০৫ সালে দুই কিশোরকে গুলি করে মেরেছিল ফরাসি পুলিশ। তার পর তিন সপ্তাহ ধরে দাঙ্গা চলেছিল। এবার যাতে তেমন পরিস্থিতি না হয় সেজন্য মরিয়া চেষ্টায় নেমেছে মাকরঁপ্রশাসন। টিকটক, স্ন্যাপ চ্যাটের মতো সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে দাঙ্গার ফুটেজ মুছে দেওয়ার অনুরোধ করেছে সরকার।

তবে শনিবার সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। পুলিশের আশা, সপ্তাহান্তে গোটা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
তৃণমূলের এই নেত্রী জেলা পরিষদে জিতলে সভাধিপতি হতে পারেন, ঘাসফুলে দ্রুত উত্থান