
শেষ আপডেট: 28 September 2021 15:41
'বাজল তোমার আলোর বেণু মাতল রে ভুবন।' সুপ্রীতি ঘোষের কণ্ঠে এই গান ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দরাজ কণ্ঠের মহিষাসুরমর্দিনী ছাড়া বাঙালির মহালয়া আজও অসম্পূর্ণ। তাই মহালয়ার আগে বিকল হয়ে যাওয়া ভালভ-রেডিও সারাতে কাঁকুড়গাছি থেকে কুমোরটুলির 'ভালব মাস্টার'-এর দোকানে ছুটলেন প্রৌঢ়!
ইট বালি আর কংক্রিট দিয়ে ঘেরা শহরে শিউলির গন্ধ আর পাওয়া যায় না। কিন্তু ভোর চারটেয় এবারও বেজে উঠবে সেই পরিচিত কন্ঠ। তাই ব্যস্ততা তুঙ্গে রেডিওর 'ভালব মাস্টার' অমিত রঞ্জন কর্মকারের।
কুমোরটুলির সরু গলির ছোট ছোট স্টুডিওগুলোর মধ্যেই রয়েছে এক ছোট্ট 'রেডিও মিউজিয়াম' এবং রয়েছেন মিস্ত্রি অমিত রঞ্জন। এক চিলতে ছোট্ট দোকান ঘরে কাজ করেন অমিতবাবু। সেখানেই সাজানো রয়েছে পুরনো থেকে নতুন, একের পর এক রেডিওর মডেল। ১৯৬৭ সালে অমিতবাবুর বাবা দোকানটি চালু করেন। যা আজও ছেলে চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাজার মন্দা, কুমোরটুলির বর্তমান প্রজন্ম মূর্তি গড়া ছেড়ে পা বাড়াচ্ছে অন্য পেশায়
কাঁকুড়গাছি থেকে রেডিও সারাতে এসেছিলেন সুনীল দাস। বললেন, 'রেডিও আমার হবি। বহু পুরোনো রেডিও আমার। যার তার হাতে ছাড়তে ভরসা হয়না। তখনকার দিনেই ৩০০ টাকা দাম। সন্তোষের রেডিও। তাই ওঁর কাছে এলাম।'
বুশ, মারফি, টেলিফাঙ্কেন, ফিলিপস থেকে শুরু করে এক সময়ের প্রায় সমস্ত নামী ব্র্যান্ডের রেডিও দিয়ে সাজানো দোকান অমিতবাবুর। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনোটি ১৯৪৪ সালের। কিছু রেডিওর রীতিমতো অ্যান্টিক ভ্যালু আছে। অনেকেই সেগুলো মোটা টাকার বিনিময়ে কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু বিক্রি করতে নারাজ অমিতবাবু। বললেন, 'এইসব রেডিও খদ্দেররা সারাতে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভালব পাওয়া যায়নি। তাই আর নিতে আসেননি অনেকে। অনেকের কাছেই এগুলো জঞ্জাল। কিন্তু আমার কাছে ভালোবাসা। সবাই অন্য পেশায় চলে গেছে। আমি রয়ে গেলাম। রেডিও ছাড়া কিছু ভাবতে পারিনা।'
মহালয়ার কথা উঠতেই অমিতবাবুর বললেন, 'এক সময় রমরমা বাজার ছিল আমার। রাত তিনটে পর্যন্ত দোকানের বাইরে লাইন থাকত।'
১৯৮১ সালের মহালয়া আজও ভুলতে পারেন না তিনি। জানালেন, ওটা ছিল স্বর্ণযুগ। শুধু মহালয়ার আগেই ৭ হাজার ৩৩০ টাকা উপার্জন হয়েছিল। জীবনে বহু বিখ্যাত মানুষের ভালব রেডিও সারিয়েছেন তিনি। স্বনামধন্য সংগীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের শ্যামপুকুরের বাড়িতে গিয়ে রেডিও ঠিক করে দিয়ে পেয়েছিলেন ৮০ টাকা। যাত্রাশিল্পী স্বপনকুমারের রেডিও সারিয়েছেন। অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর বাড়িতেও তাঁর ডাক পড়েছিল ১৯৮৫ সালে। তাঁর চার ব্যাটারির বিলিতি রেডিও সারিয়ে মিলেছিল ১০০ টাকা। তখন ওই টাকার মূল্য অনেক। ক্রিকেটার পঙ্কজ লাল রায়ের মারফি ঠিক করে বখশিশ পেয়েছিলেন ৮০ টাকা। বললেন, 'এখন যারা রেডিও সারাতে আসেন তারা অধিকাংশ বাবা বা দাদুর রেডিও নিয়ে আসেন, মূলত মহালয়াতে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার জন্য।'
অমিতবাবুও জানেন যে রেডিওর সেই স্বর্ণযুগ আর ফিরবে না। তবুও মাত্র একটা দিন বাঙালির আবেগের কাঁটাগুলোকে নিখুঁত কম্পাঙ্কে মিলিয়ে দিতে সারাবছর দোকান আঁকড়ে বসে থাকেন। যে দিন সমস্ত টাচস্ক্রিন, ইয়ারফোন, অ্যান্ড্রয়েড, এলইডি-রা হেরে যায় অবিস্মরণীয় ওই কণ্ঠের কাছে। কাছেই কোনও রেডিওয় গমগমিয়ে বেজে ওঠে আশ্বিনের শারদপ্রাতে...
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'