দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘড়ির কাঁটা রাত আড়াইটে ছুঁলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেতেন তেইশের তরুণী। দরজার খিল খুলে মাটিতে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতে হত। কারণ তখনই তাঁর ঘরে ঢুকত তিন-চার জন ষণ্ডামার্কা রক্ষী। তাদের হাতে থাকত লাঠি। তরুণীকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হত স্বামীজির ঘরে। মানা করলেই লাঠির ঘায়ে হাত-পা ফাটবে। তারপর..এতটুকু বলে যন্ত্রণায় মুচড়ে গিয়েছিলেন নির্যাতিতা। তাঁর চোখের জলে কেঁপে গিয়েছিলেন জেরা করতে আসা দুঁদে পুলিশকর্তারাও। দুঃস্বপ্নের সেই দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে লজ্জার আগল সরিয়েই তরুণীই গর্জে উঠেছিলেন, “ভোর ৬টায় নগ্ন হয়ে আমাকে মাসাজ করতে বলতেন স্বামীজি। রাত আড়াইটে উদ্দাম সেক্স। আমি যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলে, তিনি আনন্দ পেতেন। ছেড়ে দিতে বললে, চুলের মুঠি ধরে চড়-থাপ্পড় মারতেন।”
নির্যাতিতার অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে সেই ব্যক্তির কীর্তিকলাপ এতদিনে জেনে গেছে গোটা দেশ। বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিন্ময়ানন্দকে গ্রেফতারও করেছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। তারপরেও পুলিশ জানিয়েছিল, ধর্ষণ নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক ছাত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন তিনি। আশ্রমের রীতি ভাঙার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হবে লঘু ধারায়। এমনকী প্রভাবশালী নেতার গায়ে কাদা ছেটানোর চেষ্টায় কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল খোদ নির্যাতিতাকেই। চিন্ময়ানন্দের সহযোগীদের দেওয়া বয়ানের ভিত্তিতে নির্যাতিতা ছাত্রীর বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগও আনা হয়েছিল।
“যাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে, তিনি কী কী করেছেন জানেন? কতটা অমানুষিক নির্যাতনের পথ পেরোতে হয়েছে আমাকে সেটা কী জানতে চেয়েছেন কেউ?” গোপন ক্যামেরায় বন্দি প্রমাণ নয়, পুলিশের সামনে তরুণী জানিয়েছেন আশ্রমের সেই বিভীষিকাময় রাতগুলোর কথা।
স্বামীজির লালসা থেকে বাঁচতে কখনও বলেছি ঋতুস্রাব হয়েছে, কখনও সংক্রমণের দোহাই দিয়েছি..
নির্যাতিতা বলেছেন, স্বামী চিন্ময়ানন্দের যৌন খিদে ছিল অস্বাভাবিক। ঠিক রাত আড়াইটে বাজলেই তাঁর ব্যক্তিগত রক্ষীরা তরুণীকে নিয়ে যেত স্বামীজির ঘরে। ভোর রাত অবধি চলত যৌন নির্যাতন। ছাত্রীর কথায়, “আমার শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে যেত। চেঁচিয়ে উঠলেই মারধর করতেন স্বামীজি। দরজার বাইরেই পাহারা দিত বন্দুকধারীরা।” বাঁচার একটা উপায় বার করেছিলেন তরুণী। সেটা রোজ কাজে না লাগলেও মাঝে মাঝে রেহাই দিত তাঁর আত্মাকে। “আমি বলতাম আমার ঋতুস্রাব চলছে। ওই কটা দিন ছাড় পেতাম। অন্য সময় বলতাম ইউটিআই-তে (মূত্রনালীর সংক্রমণ) ভুগছি। সংক্রমণ শুনলেই ভয় পেয়ে স্বামীজি ছেড়ে দিতেন,” তবে এই ফন্দি বেশিদিন খাটেনি, বলেছেন নির্যাতিতা।
রক্তাক্ত পড়ে থাকতাম নিজের ঘরে, ডাক্তার দেখাতে হয়েছিল বহুবার
রাতভর নির্যাতনের পরে ছাড় ছিল এক-দু’ঘণ্টা। তার মধ্যে স্নান সেরে ফের স্বামীজির ঘরে ডাক পড়ত তরুণীর। ঠিক ভোর ৬টায়। তখন ছিল মাসাজ-সেশন। স্বামীজি বলতেন ‘সেবা।’
“প্রথম প্রথম আমাকে গা-হাত পা টিপে দিতে বলতেন স্বামীজি। তখন কিছু মনে হয়নি। একদিন বললেন নগ্ন হয়ে মাসাজ করতে, ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, কেঁদে ফেলেছিলাম,” নির্যাতিতা বলেছেন, সহযোগীদের সামনেই এমন অশালীন ভাষায় তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। সেই কাজ করতে বাধ্যও করতেন। তরুণীর কথায়, “স্বামীজি বলেছেন ধর্ষণ করেননি। তাঁর নির্যাতন এতটাই সাঙ্ঘাতিক ছিল যে আমাকে প্রায় প্রতিবারই ডাক্তার দেখাতে হত। আমার জন্য প্রাইভেট ডাক্তার ঠিক করেও রেখেছিলেন স্বামীজি। বাইরে নিপাট ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে তাঁর আসল খোলসটা ছিল একটা পিশাচের।”
[caption id="attachment_144440" align="aligncenter" width="571"]
শাহজাহানপুরের মুমুক্ষু আশ্রম[/caption]
‘বেটি’ কাকে বলে উনি জানেন?
গত বছর অক্টোবরে স্বামী চিন্ময়ানন্দের বিরুদ্ধে প্রথম মুখ খোলেন নির্যাতিতা। সেই সময় যে ঝড় উঠেছিল, সেটা চাপা পড়ে গিয়েছিল প্রমাণের অভাবে। তরুণী জানিয়েছেন, স্বামীজির আশ্রম পরিচালিত ইনস্টিটিউটে পাঁচ বছরের কোর্স শেষ করে আইন নিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। কলেজের প্রিন্সিপালই তাঁকে স্বামীজির সঙ্গে দেখা করে অ্যাডমিশন নিতে বলেন। প্রথম বার তাঁর ঘরে গিয়ে স্বামীজির মধুর বচন শুনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তখনও জানতেন না, কত বড় ঝড় উঠতে চলেছে তাঁর জীবনে।
নির্যাতিতার দাবি, “আশ্রমের মেয়েদের এ ভাবেই ব্যবহার করেন স্বামীজি। তাঁর কাছে যেটা ‘সেবা’, এক মহিলার কাছে সেটা ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নের এক ভয়ঙ্করতম অধ্যায়, যা আমাকে পেরোতে হয়েছে। বেটি বলে ডেকেছিলেন উনি। মেয়ে-বাবার সম্পর্ক কী, উনি সেটা জানেন?”
কালো রাত থেকে বাঁচতে প্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টা করি, হাতে আসে স্পাই ক্যাম
প্রথমবার স্বামীজির বিরুদ্ধে তোলা তাঁর অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যায়। পুলিশকে নির্যাতিতা জানিয়েছেন, এর পর আরও সতর্ক হয়ে যান স্বামীজি। আশ্রমের অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ হয়ে যায়। সকলেই কেমন কলের পুতুল হয়ে যান, কেউ মুখে কোনও কথা বলতেন না। ছাত্রী বলেছেন, “মেয়েদের হোস্টেলের সব ঘরেই গোপন ক্যামেরা লাগাত থাকত। বাথরুমেও। মেয়েদের স্নানের ভিডিও তুলে ব্ল্যাকমেল করা হত। মুখ বন্ধ করিয়ে রাখা হত। আমার ক্ষেত্রেও একই রকম শুরু হয়।”
স্বামীজিকে জব্দ করার একটাই রাস্তা ছিল, সেটা হল জলজ্যান্ত প্রমাণ জোগাড়। গুগল অ্যাপে স্পাই ক্যামেরা অর্ডার দিতে বেশি দেরি হয়নি। “উনি যদি আমার ভিডিও করতে পারেন, আমি কেন পারব না। এটুকু বুঝেছিলাম মুখের কথায় কেউ বিশ্বাস করবে না। সম্ভ্রমের পর্দা খসলেও তাঁর কীর্তিকলাপ ক্যামেরাবন্দি করতেই হবে। তাতে আমার মানসম্মান গেলেও জীবনটা তো বাঁচবে,” পুলিশকর্তাদের সামনে চোখ ভিজে গিয়েছিল তরুণীর। চশমায় লাগানো স্পাই-ক্যামে তোলা সেই সব ভিডিও পেন ড্রাইভে জমা করেছিলেন দিনের পর দিন। সেই ভিডিও এখন পুলিশের হাতে। সিটের অফিসাররা জানিয়েছেন, ৪২টি ভাগে সেই ভিডিও সামনে এনেছেন নির্যাতিতা তরুণী। সেই ভিডিও যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে ফরেন্সিক ল্যাবে।
“আমি ন্যায় বিচার পাব কিনা জানি না। টাকা আর প্রভাবের জোরে আশ্রমের সমস্ত প্রমাণ ইতিমধ্যেই লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে আড়াল করতে মুখিয়ে আছে অনেকেই। তবু বলবো আশ্রমে আমারই মতো অনেক মেয়ে যৌন লালসার বলি হচ্ছেন প্রতিদিন, দয়া করে তাঁদের বাঁচান,” পুলিশের কাছে এখন একটাই আকুতি নির্যাতিতার।
