দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক দল দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বুঁদ। অন্য দলের কাছে প্রথমবারের জন্য বিশ্বকাপ ছোঁয়ার হাতছানি। এক দলের তারুণ্যের কাছে হার মেনেছে তাবড় তাবড় তারকা খচিত দল। অন্য দলের ‘চারমুর্তি’ ফুল ফোটায় মাঝমাঠে। একদিকে আইফেল টাওয়ার সেজে উঠেছে বিশ্বকাপের রঙে। অন্য দিকে মোৎসার্ট, বেটোফেনের সিম্ফনি। এরই মাঝে লুঝনিকির সবুজ গালিচায় বিশ্ব জয়ের লক্ষ্যে নামছে ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া।
বিশ্বকাপের দল নির্বাচনের পর সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল ‘জিদানের দেশে’। কোথায় বেঞ্জেমা, ভালবুয়েনা? বা নিদেনপক্ষে পায়েত। এ কোন দল? অভিজ্ঞতার লেশমাত্র নেই। এই অভিজ্ঞতার অভাবেই তো হারতে হয়েছিল ইউরো কাপের ফাইনালে। শুরুটাও হয়েছিল সেভাবেই। অস্ট্রেলিয়া, পেরুর বিরুদ্ধে কষ্টার্জিত জয়, ডেনমার্কের সঙ্গে ড্র। কিন্তু নক আউট পর্বে গিয়ে যেন ভোল পালটে ফেললেন দেশঁ’র ছেলেরা। আর্জেন্টিনাকে স্রেফ গতিতে উড়িয়ে দিয়ে, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে একতরফা খেলে, বেলজিয়ামকে পরিকল্পনায় টেক্কা দিয়ে গ্রিজম্যান, এমব্যাপে, পোগবারা আজ বিশ্বকাপের ফাইনালে। দেশঁকে নিয়ে সমালোচনা বদলে গিয়েছে সুখ্যাতিতে।
অন্যদিকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার ক্ষুদ্র প্রদেশ, মাত্র ৪১ লক্ষ জনসংখ্যার ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বকাপের আগে তাঁদের নিয়ে কেউ বাজি ধরলে তাঁকে হয়তো বলা হতো ফুটবলের কিছুই বোঝেন না। গ্রুপে আর্জেন্টিনার মতো দল। সঙ্গে আবার ‘সুপার ঈগলস’ নাইজিরিয়া। গ্রুপ থেকেই না বাদ হয়ে যায়। কিন্তু ২১ জুন টনক নড়ল ফুটবল মহলের। মড্রিচ, রাকিতিচদের খেলায় মাটিতে মিশল ‘মারাদোনার’ দেশের সম্মান। তারপর বাকিটা রূপকথা। প্রি কোয়ার্টারে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে জয়, কোয়ার্টারে রুশদের কাঁদিয়ে ফের টাইব্রেকারে জয়। সেমিফাইনালে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মোটেই ফেভারিট ছিলেন না। পাঁচ মিনিটের মাথায় গোল খেয়ে যাওয়ার পরেও এক্সট্রা টাইমে ছিনিয়ে আনলেন জয়।
চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্সের তুরুপের তাস হলেন এমব্যাপে। এখনও ‘টিন এজার’ এমব্যাপের বল নিয়ে ও বল ছাড়া দৌড়গুলো বিপদে ফেলছে সব দলকে। কিন্তু এমব্যাপের চোখে তারকা অন্য খেলোয়াড়। তাঁর মতে এই দলের ‘জিজু হলেন গ্রিজু’। গ্রিজম্যানই নাকি দলটাকে খেলান। আসলে দেখতে গেলে এই দলে কোনও তারকা নেই। লরিস, উমতিতি, ভারানে, পাভার্ড, কান্তে, মাতুইদি, পোগবা, গ্রিজম্যান, এমব্যাপে, জিরু এঁরা প্রত্যেকে মিলে একটা দল, ফ্রান্স। আর এই দলগত খেলারই ফসল তুলে আনছেন দেশঁ।
ক্রোয়েশিয়া দলে আবার এমন কিছু খেলোয়াড় রয়েছেন, যাঁরা প্রত্যেকে ক্লাবস্তরে কোনও না কোনও দলের তারকা। মড্রিচ রিয়েল মাদ্রিদ মাঝমাঠের স্তম্ভ, রাকিতিচ আবার ইনিয়েস্তার সঙ্গে মিলে বার্সার খেলা পরিচালনা করেন। মানজুকিচ আবার রোনাল্ডোর নতুন দল জুভেন্টাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। কিন্তা বাকিরা? পেরিসিচ, রেবিচ, ক্রামারিচ, ব্রোজোভিচ, ভিদা, সুবাসিচদের ক’জন চেনেন, থুড়ি চিনতেন? রাশিয়া বিশ্বকাপ জন্ম দিয়েছে এই তারকাদের। যাঁরা নিজের সামর্থ্যের থেকেও বেশি দেওয়ার চেষ্টা করেন দলকে। যাঁরা স্বপ্নের উপর বিশ্বাস করে ছুটতে জানেন। পরপর তিন ম্যাচ ১২০ মিনিট ধরে খেলার ধকল নিয়েও স্রেফ মনের জোরে দলকে জেতাতে পারেন।
এই ফরাসী দলে আধিক্য আফ্রিকান খেলোয়াড়ের। ২৩ জনের দলের ১৪ জনই আফ্রিকান। কিন্তু তাঁরা নিজেদের মনে প্রাণে ফরাসী বলেই মনে করেন। আর করেন বলেই এমব্যাপে কোনও দিন ফ্রান্সের হয়ে খেলার জন্য পারিশ্রমিক নেন না। তাঁর পারিশ্রমিক চলে যায় বিভিন্ন অনাথ আশ্রম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে। আর এমব্যাপে বলেন, ‘দেশের হয়ে খেলার জন্য টাকা কেন নেব? এটা তো আমার কর্তব্য।’ অথচ তাঁর ছোটবেলা কেটেছে হিংসা আর রক্তের আবহে, ফ্রান্সের এক প্রান্তে।
ক্রোট’রা আবার দেখেছেন স্বাধীনতার লড়াই, সহ্য করেছেন রিফিউজি হওয়ার যন্ত্রণা। তাঁদের অধিনায়ক লুকা মড্রিচ ৬ বছর বয়সে চোখের সামনে দেখছেন ঠাকুর্দা’কে খুন হতে। সার্বিয়ান সেনার হাতে বাড়ি পুড়ে খাক হয়ে যেতে। সাত বছর কাটিয়েছেন শরনার্থী শিবিরে। অপুষ্টির ফলে শরীর দেখে ডাক্তার বলেছিলেন কোনও দিন ফুটবল খেলতে পারবেন না। সেই মড্রিচের পায়ের জাদুতেই ক্রোয়েশিয়ান মাঝমাঠে ওঠে সুরের ঝঙ্কার। সেই আবেগেই মাঠে, এমনকী ড্রেসিং রুমে ছুটে আসেন দেশের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি কলিন্দা গ্র্যাবার কিতারোভিচ।
প্রথম দিন থেকেই ‘অঘটনের বিশ্বকাপ’ বিশেষণে ভূষিত রাশিয়ার মাটিতে তাই রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় মুখোমুখি হবে এমন দুই দল যাঁদের খেলোয়াড়েরা বিশ্বকাপ জয়ের আগেই গোটা পৃথিবীর ফুটবল প্রেমী মানুষের মন জিতে বসে আছেন। হিংসা, সন্ত্রাসকে পেছনে ফেলে এমব্যাপের দৌড় দেখিয়ে দিচ্ছে স্বপ্নের পিছনে ছুটলে কোনও লক্ষ্যই কঠিন নেই। অন্যদিকে ‘রিফিউজি’ তকমা ঘুঁচিয়ে, অপুষ্টিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতার লক্ষ্যে ছুটছেন মড্রিচ। শরীর হার মানলেও হার মানছে না মন, থামছে না স্বপ্ন দেখা।
কে হাসবে শেষ হাসি? কে পাবে বিজয়ীর সম্মান? তবে, যে লড়াই করে তাঁরা আজ এখানে পৌঁছেছেন, তাকে কুর্নিশ করছে গোটা দুনিয়া। হার-জিত তখন গৌন হয়ে যায়, হয়ে যায় নিয়ম রক্ষার।