লকডাউন চলছে। তাই উপায় না পেয়ে আমরা ফিরে এসেছি পাড়ার মধুদার মুদি দোকানে। শপিংমল-প্রেমী বাঙালি মুখে মাস্ক লাগিয়ে ঠেলায় পড়ে কিনছি চাল, ডাল, তেল। এই দুর্দিনে খেয়েপরে বাঁচছি। শপিংমলের তীব্র আলোয় ঝলসে যাওয়া মধুদা আর তাঁর দোকান অন্নপূর্ণার মতো এই অবেলায় পাড়ার লোককে অন্ন যুগিয়ে চলেছেন। লাইনের কে যেন বলে উঠলেন, ‘সত্যি, মধুদা না থাকলে এই সময় কী যে হত!
এসব আমরা ভুলে যাব। আমরা বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাই। প্রতিদিন দূর গ্রাম থেকে সবজি আনা অসংখ্য রামুর মা, রহিম চাচা যাঁরা এই লকডাউনে শহরের পাকস্থলিকে সচল রেখেছেন, যাঁরা মাস্কের কথা বললে লজ্জা পেয়ে নোংরা কাপড়ের আঁচল বা ঘেমো গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে নেন আর তীব্র গরমে শুকিয়ে যেতে যেতে আমাদের রান্নাঘরে যুগিয়ে যাচ্ছেন টাটকা সবজি।
এই ভয়ঙ্কর মহামারী শেষ হলে এঁদের আমরা ভুলে যাব। শপিংমলের চিলড এসির আমেজ গায়ে মেখে এক এক করে বেছে নেব কুকুম্বার কিংবা করেলা। এঁদের আমরা ভুলে যাব। কারণ বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাই আমরা।
যে পুলিশের চোদ্দো গুষ্টি উদ্ধার না করলে পেটের ভাত হজম হয় না, আজ তাঁদের নিয়েই বীরপুজো সোশাল মিডিয়ার দেয়ালে দেয়ালে। কত আহ্লাদিত কমেন্ট, কত প্রশস্তিবার্তা। দোতলার নিরাপদ দূরত্ব থেকে লকডাউনে বন্দি জনতা পুলিশের মাথায় ছড়িয়ে দিচ্ছে ফুল, কেউ প্রণাম করছেন। এ ভিডিও ভাইরাল হয়েছে দেখলাম।
সাব-ইন্সপেক্টর সমীর চৌধুরি। যাঁর লাঠি হাতে তেড়ে যাওয়া আর অবাধ্য জনতাকে ঘরে ঢোকানোর ভিডিও নেটিজেনরা ভাইরাল করেছিলেন কিংবা পুলিশের অন্ন বিতরণ দরিদ্রকে, বা গান গেয়ে শিক্ষিত নাগরিকবৃন্দকে সচেতন করা-- তাও খুব উচ্চপ্রশংসিত। সেই সব ভিডিওর পরেও কিছু দৃশ্য থাকে, আমরা যার খোঁজ রাখি না!
না, সেই পুলিশকর্মীরা অনেকেই আজ আঠারো-বিশ দিন বাড়ির ভেতরে পা রাখেননি। সমীরের চার বছরের মেয়ে অভিমানে কাঁদে, বাবা কেন তাকে কোলে নেয় না আজকাল। চৌকাঠের ওপারে তাঁর বৃদ্ধা মা রোজ জিজ্ঞেস করেন, তোর শরীর ঠিক আছে তো বাবা? বউটি কিছু বলেন না। শুধু কী এক আশঙ্কা নিয়ে চেয়ে থাকেন। পুলিশকর্মীটি বাইরের বারান্দায় বসে খাওয়া শেষ হলে আবার বেরিয়ে যান ডিউটিতে।
বউটি চিৎকার করে বলেন, মুখে মাস্ক পরতে ভুলো না। আর অস্ফুটে বলেন, মানুষটাকে দেখো ভগবান!
জানি, এই মহামারীর দিন শেষ হলে এই সব আমরা ভুলে যাব। তখন ভাইরাল হবে দোতলার বারান্দা থেকে পুলিশকে গালি দেবার ভিডিও। এঁদের আমরা ভুলে যাব, কারণ আমরা বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাই।
নার্স নমিতার বাচ্চাটি বুকের দুধ না খেলে এই সেদিনও ঘুমোতে পারত না, আজ কাঁদতে কাঁদতে পুতুল আঁকড়ে বাবার পাশে ঘুমোচ্ছে। মা তাকে কোলে নেয়নি আজ কত্তদিন। হাসপাতালের চেঞ্জিং রুমের দরজা আটকে চোখের জল মুছে এক এক করে দেহে আটকে নেন বর্ম: মাস্ক, গ্লাভস, পি.পি.ই.।
এঁদের আমরা ভুলে যাব। বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাই আমরা।

ডাক্তার পেটানো বিপ্লবী জনতা এখন বলছে, ডাক্তার আর নার্সরাই ভগবান। চলছে hero worship হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে। ভয়ংকর এক শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাদা অ্যাপ্রন, মুখে মাস্ক আর গ্লাভস পরা কিছু মানুষ শুধুমাত্র সাহসকে সম্বল করে মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে লড়ছেন। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়ছেন। যেকোনও মুহূর্তে সাক্ষাৎ মৃত্যু তাঁকেও থাবা মারতে পারে জেনেও। একটা করোনা আক্রান্তকে যমের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারলে ফেটে পড়ছেন উল্লাসে-- বাঁচানো গেছে, বাঁচানো গেছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্ভবত তাঁকে স্যালুট জানাচ্ছেন স্বয়ং ‘ঈশ্বর’।
এসব দিন আমরা ভুলে যাব। আবার দল বেঁধে ডাক্তার পেটাব, নার্সকে খিস্তি করব, করোনা হাসপাতালে কাজ করে জানলে পাড়া বা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব।
আমরা সব ভুলে যাব। এই পাড়ার মুদি দোকানি, রাস্তার সবজিওলা, পুলিশ, নার্স, ডাক্তার, আরও অসংখ্য সৈনিককে ভুলে যাব। যাঁরা চোয়াল শক্ত করে মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে কবজি শক্ত করে লড়ছেন।
সহনাগরিকদের বাঁচিয়ে রাখার লড়াই জারি রাখছেন আর প্রতিনিয়ত অভয় দিয়ে বলছেন, ‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয় নিশ্চয়।’ এই অতিমারির অনিশ্চয়তা শেষ হলেই এঁদের আমরা ভুলে যাব। এইসব ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো বা সুপারম্যানদের আমরা ভুলে যাব। আসলে, আমরা বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাই। বড্ড তাড়াতাড়ি ভুলে যাই আমরা!
শিবনাথ
কাঁচরাপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনা
পাঠকের চিঠি। আপনার সুচিন্তিত মতামত জানাতে আমাদের মেল করুন, myletters.thewall@gmail.com এই অ্যাড্রেসে।