
শেষ আপডেট: 15 October 2020 12:17
সুষ্মিতা রায়চৌধুরী, নিউ জার্সি
পিতৃপক্ষের অবসানের পরে কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। কিন্তু মহামায়ার মহিমায় এবার পুজো মানেই শিউলি ভোর আর নতুন জামা একেবারেই নয়। বরং দেবীপক্ষে করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের ক্ষমতাটা ঠিক কতটা হবে তা নিয়ে বেশ আতঙ্কিত অনেকেই। এর মধ্যেই সরগরম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর স্ত্রী করোনা আক্রান্ত। চোখ রগড়ে খবরটা দেখতে যেতেই পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, “ইট্স এ হোক্স!” যত্তসব নিন্দুকদের দল। এমন কথা বলতে নেই হাল্লারাজার দেশে। মা দুগ্গা পাপ দেয়। যখন ধাপ্পাবাজিতে চলে সারা বিশ্ব, তখন সেটাই হয়ে যায় সত্য।
সদ্য হয়ে যাওয়া “ফার্স্ট ডিবেট লাইভে” যেমন প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করায় ‘আমেরিকায় মৃত্যুর হার এতো বাড়ল কেন’র উত্তরে জবাব আসে, “ফুটবল শুরু হতে চলেছে ফ্রি কান্ট্রি”তে, তেমনই রামরাজত্বে সঠিক উত্তর আসে না কেন হাথরসে সাংবাদিককে আটকানো হয় ধর্ষিতার মৃত্যুর পর তাঁর বাড়িতে যেতে। আসলে আমরা সবাই বিভ্রান্ত, নাজেহাল, ক্লান্ত। শুধু হুঙ্কার হানছে দুর্নীতি।
মর্ত্যে উমাদের শিরদাঁড়া ভেঙে-গুঁড়িয়ে দিয়ে উলঙ্গ প্রহসন চলছে নাটকের মঞ্চে। শরীর জুড়ে কাঁটাঝোপ, যোনির মাঝখান দিয়ে চেরা জিভের মতো বয়ে চলেছে সাইরেনের চোরাস্রোত। পুলিশ থেকে নেতা অক্লেশে দাবি করে, "দে দে জ্বালিয়ে দে নিংড়ানো শরীরটা।” নিচু জাত আর নারীশরীর, মেরুদন্ড মেরে গুঁড়িয়ে দিলেই পুজো হয় 'গেরুয়া বসনের'। অন্য দিকে তার লাভ তোলে বিপক্ষ রং।
ফোটেনি তখনও গোলাপ পূর্ণরূপে, কুঁড়ি ছিঁড়ে নিয়ে শয্যা সাজানো হচ্ছে রামরাজত্বের অগ্নিবাসরে। কেটে দেওয়া জিভে, ভয়াবহ কোনও চিৎকারে কেঁদেও উঠতে পারে না উমারা। নির্ভয়ারা শুধুই আমাদের ফেসবুক স্টেটাস আর পিশাচদের বিছানা গরম করে।
অবশ্য হঠাৎ আসা অতিমারীর ক্ষয়ক্ষতিই যেখানে পারল না একটা বছর উৎসবের আড়ম্বর রুখতে সেখানে ধর্ষণ তো জলভাত। মা দুর্গাও বোধহয় এবার খানিক ত্রস্ত। প্যান্ডেলে তো দুগ্গাঠাকুরেরও রূপ বিচার হয়। কজন আর মহাশক্তির উৎস ভেবে প্যান্ডেল হপিং করে? শেষ অবধি তো, কোন ঠাকুরের চোখ সুন্দর, এই বিশ্লেষণেই চাপা পড়ে যায় ত্রিশুলের ধার।
বাংলার বিপুল জনস্রোত যেখানে আটকানো অসম্ভব জেনেও পুজোকমিটির কর্তৃপক্ষ অনায়াসে দাবি করেন পুজো হবেই, সেখানে অনেক মাস, অনেকটা ভেবেচিন্তে তবে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে নিউজার্সির সবথেকে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী অ্যাসোসিয়েশন “কল্লোল, নিউজার্সি”।

উৎসবের আড়ম্বরে নয়, এখানে পুজো হচ্ছে ভাল থাকার জন্য। প্রচুর নিয়ম এবং সুরক্ষার ঘেরাটোপে এবার পুজো। কারণ মায়ের সঠিক আরাধনা তখনই হয় যখন বিবেকবোধ এবং সংযম দুটোকেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কল্লোলের পুজোয় এবারও আছে জাঁকজমক কিন্তু সেটা সীমিত নিজস্ব সদস্যদের মধ্যে। নন-মেম্বার হলেও প্রবেশের সংখ্যা সীমিত। রোটেশন বেসিসে অর্থাৎ একটা দল বেরোলে তবেই প্রবেশ করবে অন্যদল, এই নিয়মে মায়ের মুখ দেখতে পাবে মানুষ। স্যানিটাইজ করা হবে প্রত্যেকবার, বাইরে খাটানো হবে তাঁবু যাতে ঠান্ডায় বাইরে থাকা দর্শনার্থীদের কষ্ট না হয়। ফ্লু সিজনের চিন্তা করেও এই ব্যবস্থা। ঢাকের প্রত্যেকটি তালে এবার সুস্থ থাকার মহাযজ্ঞ চলবে পুজোয়। অন্যবার পুজোর অনুষ্ঠান মানেই তাবড় সব শিল্পী সমাবেশ, সেখানে এবার সবটাই ভার্চুয়াল।
আবার নিউ জার্সির 'আই.সি.সি.গার্ডেন স্টেট'-এর পুজোয় এবার শুধুমাত্র সদস্যদের প্রবেশ অধিকার থাকলে। তাও টেম্পারেচর মাপার যন্ত্রে যদি পাশ হয়, তবেই মিলবে অনুমতি। লিপস্টিক ঘেঁটে গেলেও মাস্ক পড়ে থাকতে হবে সারাক্ষণ। স্যানিটাইজার রাখা থাকবে সর্বত্র। যাঁরা ভোগ রান্না করছেন, তাঁদের সাস্থ্যের ওপর আগে থেকেই রাখা হয়েছে কড়া নজরদারি। অর্থনীতির ভঙ্গুর পরিস্থিতির কথা ভেবে এই পুজোয় এখানে নেই কোনও রেজিস্ট্রেশন ফি-ও। অন্যবারের মতোই নাটক থেকে গান, কবিতা, মহড়া চলছে পুরোদমে। কিন্তু সে সবটাই ডিজিটালি। আমন্ত্রিত প্রখ্যাত লোকগীতিকার পৌষালি ব্যানার্জি এবং সারেগামাপা-খ্যাত শোভন গাঙ্গুলি।

এ ছাড়াও পঞ্জিকার দিনক্ষণ, নিয়ম মেনে পুজো হয় ভারত সেবাশ্রম, আনন্দ মন্দির এবং দক্ষিণেশ্বর রামকৃষ্ণ সংঘ আদ্যাপীঠ, নিউজার্সিতে। সেসবখানেও কঠোর নিয়মে বলে দেওয়া হয়েছে মন্দিরের ভেতরে কোনও ফোটো এবং ভিডিও করা যাবে না পুজোর সময়। কারণ একটাই, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করার বিধি। শুধুমাত্র ভারত সেবাশ্রমে ভোগ পাওয়া গেলেও, তা পাওয়া যাবে মন্দিরের বাইরে থেকে। তবে এই প্রথমবার বেশ চড়া অঙ্কের প্রবেশ মুল্য রেখেছে ভারত সেবাশ্রম। আগে যেখানে প্রত্যেকটি মানুষের প্রবেশ ছিল অবারিত, তা এখন বেঁধে দেওয়া হচ্ছে মূল্যে। জনসমুদ্রের রাশ টানতেই এই সিদ্ধান্ত। টাকার অঙ্ক শুনে আসবেন না অনেকেই।
অনেকেই মনে করছেন, এই 'ফ্লু সিজনে' বেড়ে যাবে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা। তার উপর পুজোর পরে-পরেই এই দেশে হ্যালোয়িন এবং থ্যাংক্স গিভিং। দেশটা তখন সেজে ওঠে উৎসবের লাল-সবুজ আলোয়। তখন কতটা রোখা যাবে ফ্রি কান্ট্রির উন্মাদনা, তা কারও জানা নেই। তাই দুর্গাপুজোটা নিরাপদ থাকুক, এতটুকুই চেষ্টা। অঞ্জন দত্ত হোন বা কবীর সুমন বা মন যদি চায় 'বাউল অফ বেঙ্গল', সব কিছুই এবার বাড়ির ভিতরে বন্দি থাকুক ডিজিটালি। এভাবেই ভাবছি আমরা, নিউজার্সির বাঙালিরা। দেবী আরাধনায় এগিয়ে রাখছি মানুষের সুস্থতাকেই।
তবে বাংলার জন্য আমরা চিন্তিত। মৃৎশিল্পীদের অর্থসাহায্য করতে পুজো করতে হয় না, বরং তাদের হাতে ফান্ডের জমানো টাকা তুলে দিলে আরও ভাল হয়, সংক্রমণও রোখা যায়। কলকাতায় দুর্গাপুজো হলে জনস্রোত আটকানো কার্যত অসম্ভব! শহরের অতি সাধারণ মানুষদের কথা ভেবে দুর্গাপুজো কোনও বারই হয় না, এবারেও হবে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। বিশ্বের একননম্বর দেশ যেখানে দাবি করছে করোনা নির্মূল করা এখনই অসম্ভব, তখন বাংলায় প্যান্ডেল হপিংয়ের সুযোগ করে দেওয়াটা কি কিঞ্চিৎ ধৃষ্টতা নয়?
(নিউ জার্সির বাসিন্দা সুষ্মিতা রায়চৌধুরী একজন ব্লগার ও লেখিকা।)