কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে সচেতনতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, তার মধ্যেই এই থেরাপি এখন পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্পোরেট ক্যালেন্ডারে ঠাঁই পাচ্ছে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 3 August 2025 17:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একসময় বিভিন্ন থেরাপিকে শুধুই যোগা রিট্রিট বা আধ্যাত্মিক ওয়ার্কশপের অংশ হিসেবে দেখা হত, সেটাই এখন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে কর্পোরেট ভারতের ওয়েলনেস প্রোগ্রামগুলিতে (corporate wellness India)। আইটি থেকে শুরু করে ডিজাইন, বিভিন্ন খাতে কাজ করা সংস্থাগুলি এখন কর্মীদের মানসিক সুস্থতার জন্য নির্ধারিত ‘সাউন্ড বাথ’ সেশন (sound bath therapy) আয়োজন করছে।
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য (workplace stress relief) নিয়ে যে সচেতনতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, তার মধ্যেই এই থেরাপি এখন পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্পোরেট ক্যালেন্ডারে ঠাঁই পাচ্ছে। বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে, এবং এই সেশনগুলি (sound healing sessions) একটি স্থায়ী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী এই ‘সাউন্ড বাথ’ সেশন?
সেশনে থেরাপিস্টরা হিমালয়ান সিংগিং বাউল, গং, বাঁশের রেইনস্টিক, ওশান ড্রাম, টিউনিং ফর্ক এবং কালিম্বা (একটি আফ্রিকান বাদ্যযন্ত্র) ব্যবহার করেন। অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত ম্যাটে বসে বা শুয়ে থাকেন, চোখ বন্ধ থাকে, এবং বিভিন্ন স্তরের সুর-শব্দের আবরণে ধীরে ধীরে পৌঁছে যান গভীর শিথিলতার স্তরে। সেশন শুরুর আগে ছোট্ট একটি ব্রিফিং হয়, শেষে হয় কখনও আলোচনা, আবার কখনও টিম-বিল্ডিং অ্যাক্টিভিটির মতো সংগঠিত প্রয়াস।
বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, দিল্লি, চেন্নাই এবং মুম্বইয়ের মতো বড় শহরগুলিতে এখন এই থেরাপির চাহিদা বাড়ছে। মানবসম্পদ (HR) বিভাগগুলি পেশাদার থেরাপিস্টদের নিয়ে এসে এই ধরনের সেশন করাচ্ছে, বিশেষ করে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এবং তাঁদের টিমের জন্য। সাধারণত ৪৫ মিনিটের একটি গ্রুপ সেশন, যা অফিস প্রাঙ্গণেই বা কোনও পার্টনার ওয়েলনেস স্টুডিওতে হয়, তার খরচ পড়ছে ২৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে। খরচ নির্ভর করে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, যন্ত্রপাতির ধরন এবং কাস্টমাইজেশনের মাত্রার উপর।
হায়দরাবাদের “The Healing Frequency”-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা জুহি রেড্ডি বলছেন, “আমরা কিছু কাস্টম ওয়েলনেস অ্যাড-অন অফার করি।” কেউ কেউ মাসে একবার এই সেশন করায়, কেউ আবার রেকর্ড করা গাইডেড মেডিটেশন নেয়, যা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে ব্র্যান্ডেড থাকে। সাধারণত এগুলি ছোট বিরতির সময় ব্যবহার হয়, বা কোম্পানির ইন্টারনাল অ্যাপে আপলোড করে দেওয়া হয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলের অংশ হিসেবে।
বেঙ্গালুরুর এক প্রযুক্তি সংস্থার HR প্রধান অশ্বিন রাও বলেন, “আমাদের টিমের সদস্যরা দিনের বেশিরভাগ সময় স্ক্রিনের সামনে কাটান, কড়া সময়সীমা মেনে কাজ করেন। এই প্রথমবার আমরা তাঁদের এমন একটি ঘর দিলাম, যেখানে কোনও সমস্যা মেটাতে নয়, শুধুই উপস্থিত থাকতে বলা হল। সবাই উপভোগ করেছে।”
যদিও অফিসের স্ট্রেসই এই থেরাপির মূল চাহিদার উৎস, তবে মনোবিদ এবং চিকিৎসকেরা বলছেন, এর আরও অনেক আবেগজনিত ও মানসিক উপকারিতা রয়েছে।
মনোবিদ অনিতা রাও বলছেন, “সুর ধীরে ধীরে ব্রেনকে পরিষ্কার ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যখন মনে ভীষণ চাপ থাকে। এক নিঃশব্দ পরিবেশ আর সুরের মেলবন্ধন একসঙ্গে আবেগগত ভার যেমন রাগ বা দুঃখকে প্রকাশের সুযোগ দেয়, যা সাধারণত চাপে চটজলদি চাপা পড়ে যায়। এই থেরাপি কোনও সমস্যা মেটানোর নয়, বরং মনের নিজস্ব গঠনকে সুযোগ দেওয়ার।”
চণ্ডীগড়ের Institute of Sound Healing-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. সন্দীপ জ্যোত জানাচ্ছেন, গত তিন বছরে ভারতে এই চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখন ৫০০-রও বেশি সাউন্ড থেরাপি প্র্যাকটিশনার কাজ করছেন। তাঁর নিজের কাজ ছড়িয়ে আছে মুম্বই থেকে দিল্লি-এনসিআর পর্যন্ত।
এই সাউন্ড থেরাপি ধীরে ধীরে কর্পোরেট গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন বিভিন্ন ব্যক্তিগত মুহূর্তেও প্রবেশ করছে। বিশেষ জন্মদিনের পার্টি, কিংবা বিয়ের আগে বন্ধুবান্ধবদের ছোট্ট জমায়েতে, এখন মাঝে মাঝে হিমালয়ান বাউলের মৃদু ধ্বনি চটকদার পার্টি মিউজিককে সাময়িক বিরতি দিচ্ছে।
বিশাখাপত্তনমের রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট ডা. সুমন দাস বলছেন, সাউন্ড থেরাপিকে সরাসরি কোনও রোগের ওষুধ হিসেবে না দেখতে। তবে তিনি মানেন, “প্যালিয়েটিভ কেয়ারে, রোগী ও কেয়ারগিভার - দু’জনেরই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্লান্তি থাকে। সাউন্ড থেরাপি আবেগকে বেরিয়ে আসার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। শোককে মোকাবিলা করতে প্রয়োজন স্থিরতা, আর শব্দ সেই জায়গা তৈরি করে দিতে পারে।”