
শেষ আপডেট: 1 April 2024 17:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডেটা এন্ট্রির চাকরিতে মোটা টাকা বেতনের লোভ দেখিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে ভারতীয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা বা প্রোগ্রামারদের। প্রথমে চাকরির লোভ, তারপরে বিদেশে যাওয়ার টিকিট, এই প্রতারণায় পা দিলেই ফাঁদে বন্দি হচ্ছেন ভারতীয়রা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও সাইবার সেলের তরফে জানানো হয়েছে, এই মুহূর্তে কম্বোডিয়ায় পাঁচ হাজারের বেশি ভারতীয়কে বন্দি করে রেখেছে চিনা হ্যাকাররা। জোর করে তাদের দিয়ে ‘সেক্সটরসন’ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর সবই হাই প্রোফাইল ডিজিটাল ফাঁদ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্য নিচ্ছে হ্যাকাররা। সেই প্রতারণার জাল ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গোটা বিশ্বে। লোকজনকে ফাঁসিয়ে কোটি কোটি টাকা লুঠ করছে চিনের সাইবার অপরাধীরা।
সেক্সটরসন (Sextortion) বা যৌন কেলেঙ্কারি এখন সাইবার অপরাধীদের নতুন কৌশল। নানাভাবে সেক্সটরটনের ফাঁদ পাতা হচ্ছে। যেমন মেয়েদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলকে বিকৃত করে, পর্ন ভিডিওর সঙ্গে তা জুড়ে দিয়ে ব্ল্যাকমেল করছে হ্যাকাররা, আবার হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল করে মেয়েদের বিবস্ত্র ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে। সেক্সটরসনের সঙ্গেই আত্মহত্যার নাটক সাজানো হচ্ছে। ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেট দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করে টাকা আদায় করা হচ্ছে। খাস কলকাতা শহরেই এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকে। কেন্দ্রের সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সেক্সটরসনের শিকর অনেক গভীরে জড়িয়ে। সুদূর কম্বোডিয়ায় বসে এই কলকাঠি নাড়ছে চিনারা। আর তাদের হয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে অনেক ভারতীয়ই। তাদের ‘সাইবার স্লেভ’ (Cyber Slave) বানিয়ে রাখা হচ্ছে।
কীভাবে ফাঁসানো হচ্ছে?
স্টিফেন নামে এক ভারতীয় যুবককে সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়েছে কম্বোডিয়া থেকে। তিনিই জানিয়েছেন, কীভাবে তাঁর মতো হাজার হাজার ভারতীয় তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কম্বোডিয়ায় চিনা হ্যাকারদের কবলে রয়েছে। স্টিফেন বলছেন, কম্বোডিয়ায় মোটা টাকা মাইনের চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। অথবা হ্যাকারদের এজেন্টরা নানাভাবে ভুলিয়ে চাকরির লোভ দেখিয়ে কম্বোডিয়া নিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় যুবকদের। তাঁকেও এমনই একজন এজেন্ট এমন চাকরির কথা বলেছিল। ম্যাঙ্গালোর থেকে এসেছিল সে। বিভিন্ন কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে ঘুরে ঘুরে যুবকদের তালিকা তৈরি করছিল। সেই ব্যক্তি তাকে জানিয়েছিল যে ডেটা এন্ট্রির খুব ভাল চাকরি আছে কম্বোডিয়ায়। বেতনও অনেক বেশি। যেতে চাইলে প্লেনের টিকিটও কোম্পানিই কেটে দেবে। ভিসার ব্যবস্থাও করে দেবে। লোভনীয় চাকরির অফার পেয়ে স্টিফেন হ্যাঁ বলে দিয়েছিলেন। বুঝতেও পারেননি কী ভয়ানক বিপদ অপেক্ষা করছে।
স্টিফেন বলছেন, তিনি ও তাঁর মতো আরও কয়েকজনকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল সেই ব্যক্তি। সেখানে ভুয়ো ইন্টারভিউ হয়। প্রথমে সন্দেহ না হলেও পরে ধীরে ধীরে বিষয়টা পরিষ্কার হতে থাকে তাঁদের কাছে। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় সকলের। বুঝিয়ে দেওয়া হয় কী কাজ করতে হবে। স্টিফেন বলছেন, তাঁদের দিয়ে বিভিন্ন মহিলার ফেসবুক বা অন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল হ্যাক করানো হত। তারপর সেখান থেকে ছবি ও যাবতীয় তথ্য নিয়ে পর্নোগ্রাফি ভিডিও বানানো হত। এরপর সেই ভিডিও দেখিয়ে নানাভাবে মেয়েটিকে প্রতারণা করা হত। দক্ষিণ ভারতীয় একটি মেয়ের প্রোফাইল এইভাবে হ্যাক করে ভিডিও বানিয়েছিলেন স্টিফেন।
কাজ আরও ছিল। বিভিন্ন মহিলার ছবি নিয়ে ভুয়ো প্রোফাইলও বানাতে হত। ডার্ক ওয়েব থেকে সেইসব ডেটা নিতে হত তাদের। এই ভুয়ো প্রোফাইল দেখিয়ে বিভিন্ন নামী ব্যক্তিকে যৌন কেলেঙ্কারিতে ফাঁসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হত। স্টিফেন বলছেন, শুধু ভারতীয় নয় আরও নানা দেশ থেকে এমন তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির লোভ দেখিয়ে ডেকে এনেছে চিনা হ্যাকাররা। এমন নোংরা কাজ করতে রাজি না হলেই হুমকি দিত তারা। খেতে দেওয়া হত না। প্রত্যেককে টার্গেট দেওয়া হত। সেই টার্গেট পূরণ না হলেই চলত অত্যাচার। স্টিফেন বলছেন এই নেটওয়ার্ক অনেক বড়। চিনের বাঘা বাঘা সাইবার অপরাধীরা জড়িত। বিশাল ব়্যাকেট চলছে। কোটি কোটি টাকার স্ক্যাম ইন্ডাস্ট্রি চলছে। পাঁচ হাজারের বেশি ভারতীয়কে সেখানে সাইবার স্লেভ বানিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের পাসপোর্টও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, বিদেশ মন্ত্রক, ভারতীয় সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার ও ইলেকট্রনিক ও টেলিকম মন্ত্রকের তরফে এই বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। কম্বোডিয়ায় বন্দি ভারতীয়দের কীভাবে উদ্ধার করা যায় সে নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০০ জন ভারতীয়কে প্রথম দফায় উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৭৮ জনই জানিয়েছেন তাদের দিয়ে জোর করে সেক্সটরসনের ফাঁদ তৈরি করিয়েছে চিনারা। গোটা বিশ্বেই কোটি কোটি মানুষকে প্রতারণা করছে ওই ব়্যাকেট।