
শেষ আপডেট: 16 April 2020 05:10
গ্যাবনের রেডিও স্টেশন দখল করে বেতারে বক্তব্য রাখছে সেনারা।[/caption]
কিন্তু প্রেসিডেন্ট আলি বংগো ওডিম্বাকে গদিচ্যুত করার চেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দুপুরের মধ্যেই সামরিক অভ্যুত্থানকে দমন করে ফেলেছিল গ্যাবন সরকার। বর্তমান গ্যাবন প্রেসিডেন্ট আলি বংগো ওডিম্বা এক সময় পপ গায়ক ছিলেন। দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও ছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদে আছেন মাত্র ১০ বছর। মাত্র বলা হল কারণ আফ্রিকায় প্রেসিডেন্টের কুর্সি ধরে রাখার ক্ষেত্রে ১০ বছরটা কোনও সময়ই নয়। তবে তাঁর পরিবার গ্যাবন দেশটি চালাচ্ছে ১৯৬৭ সাল থেকে। তাঁর বাবা ওমর বংগোর মৃত্যুর পর মসনদে বসেছিলেন ওডিম্বা। গ্যাবনে তাই আজও পরিবারতন্ত্র চলছে, চলবেও।
শুধু গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট বংগো নন, রোগশয্যায় শুয়ে দেশ চালাচ্ছেন নাইজেরিয়ার সত্তরোর্ধ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদু বুহারিও। এই প্রেসিডেন্ট আবার ২০১৭ সালের পুরোটাই কাটিয়েছিলেন বিদেশে। রোগশয্যায় শুয়ে। তাঁর রোগের কারণও ছিল অজানা। তিনি কোথায়, তিনি জীবিত না মৃত তা নিয়ে ধন্দে পড়েছিলেন নাইজেরিয়াবাসী। নিঁখোজ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদু বুহারিওকে মসনদ থেকে হঠিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিলেন সেনা অফিসারেরা। অবস্থা এমন গিয়ে দাঁড়ায়, ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদু বুহারিওকে টেলিভিশনের সামনে এসে জানাতে হয়, তিনি মারা যাননি। তাঁর হয়ে তাঁর ডামি, মোহাম্মাদু বুহারি সেজে দেশ চালাচ্ছে না। শরীরের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে তিনি আজও আছেন নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনিও।
[caption id="attachment_209254" align="aligncenter" width="897"]
ইনিই নাইজেরিয়ার সত্তরোর্ধ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদু বুহারি, না তাঁর ডামি![/caption]
আলজিরিয়ার মানুষরাও তাঁদের প্রেসিডেন্ট ৮১ বছরের আবডেল আজিজ বৌতেফিকাকে নিয়ে প্রায় ধন্দে থাকেন। তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায় না। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও দেশ চালাচ্ছেন ২০ বছর ধরে। অতীতের কথা বাদই দিলাম, বর্তমানে আফ্রিকার বহু দেশে শাসকেরা, ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটার পর একটা রেকর্ড করে চলেছেন। ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া রাজত্ব চালাচ্ছেন প্রায় ৪৫ বছর, ইকুইটরিয়াল গিনির শাসক টিওডোরো ওবিয়াং এম্বাসোগো ৪১ বছর, কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ডেনিস সাসসাউ এনগুয়েসসো ৩৬ বছর, উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইউয়েরি মুসেভেনি ৩৪ বছর, চাদ রিপাব্লিকের প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস দেবি ৩০ বছর, এরিট্রিয়ার শাসক ইসাইয়াস আফয়ের্কি ২৬ বছর, জিবুতির প্রেসিডেন্ট ইসমাইল ওমর গুয়েল্লে ২১ বছর, নাবিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হেগ গেইনগব ২০ বছর ধরে দেশ শাসন করছেন।
[caption id="attachment_209253" align="aligncenter" width="500"]
প্রায় ৪৫ বছর রাজত্ব চালাচ্ছেন ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া।[/caption]
এই ধরণের অশক্ত ও নড়বড়ে নেতাদের জন্যই, মিলিটারির তরুণ তুর্কি সেনানায়করা নিয়মিত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাবার চেষ্টা করে থাকেন। তাই আফ্রিকা মহাদেশের রাষ্ট্রগুলিতে সামরিক অভ্যুত্থান অতি সাধারণ ঘটনা। ১৯৫২ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩৩টি দেশে মোট ৮৫ বার সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকাতেই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে ৪২ বার। অধিকাংশ সামরিক অভ্যুত্থানই সংঘটিত হয়েছিল দেশগুলির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে। ২৭ বার সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে পাঁচবার সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল নির্মম গণহত্যার মাধ্যমে।
১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আফ্রিকায় ৩৮টি সফল সামরিক অভ্যুথান হয়েছিল। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত, এই ২০ বছরে মাত্র ১৫টি সামরিক অভ্যুত্থান দেখেছে আফ্রিকা। তবে কি আফ্রিকায় সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা ক্রমশ কমছে! আফ্রিকায় গণতন্ত্রের বিকাশ হচ্ছে! না আফ্রিকায় গণতন্ত্রের বিকাশ হয়নি, অদূর ভবিষ্যতেও আফ্রিকার দেশগুলিতে গনতন্ত্রের বিকাশ হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। সামরিক অভ্যুত্থানে কমার কারণ হল, আফ্রিকার দেশগুলির বর্তমান শাসকেরা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নতুন কৌশল নিয়েছেন।
দেশগুলির বর্তমান প্রেসিডেন্টরা, কুর্সিতে বসেই সবার আগে সেনাবাহিনীর মন জয় করার চেষ্টা করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর জেনারেল পদে বর্তমান প্রেসিডেন্টরা বসিয়ে দেন তাঁদের নিকট আত্মীয়দের। দেশের সেনাবাহিনীকে দূর্বল করার জন্য বিভিন্ন গ্রুপে ভেঙে দেওয়া হয় এবং সেনাদের একটি দলকে অপর দলের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে, একদল সেনা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটালে, অন্যদলের সেনারা সামরিক অভ্যুত্থান দমন করতে নেমে পড়ে। সুরক্ষিত থাকে প্রেসিডেন্টের গদি। সাম্প্রতিক অতীতে আফ্রিকায়, একটাই সফল সামরিক অভ্যুত্থান দেখা গেছে। জিম্বাবোয়ের ৯৩ বছরের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে-কে ২০১৭ সালে গদিচ্যুত করেছিল সে দেশের সেনাবাহিনী।
তবে কয়েক দশক ধরেই আফ্রিকাতে সামরিক অভ্যুত্থান রুখতে অনমনীয় মনোভাব নিয়েছে আফ্রিকান ইউনিয়ন।২০১৫ সালে বুরকিনা ফাসোতে মিলিটারিরা সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে গদিচ্যুত করেছিল। বুরকিনা ফাসোর মিলিটারি শাসকের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিয়ে সে দেশের ক্ষমতা জনতার হাতে তুলে দিতে সচেষ্ট ছিল আফ্রিকান ইউনিয়ন। তবে কখনও কখনও আফ্রিকান ইউনিয়ন সামরিক অভ্যুত্থানের সময় ধৃতরাষ্ট্রের ভুমিকা পালন করে থাকে। যেমন জিম্বাবোয়ের প্রেসিডেন্ট মুগাবের বিরুদ্ধে যখন সেনা অভ্যুত্থান হয়েছিল তখন আফ্রিকান ইউনিয়ন মুখে কুলুপ এঁটে ছিল। কারণ মুগাবে তাঁর দেশে জনপ্রিয়তা হারিয়েছিলেন। এই ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল আফ্রিকান ইউনিয়নের দ্বিচারিতা।
আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের সংখ্যা হয়তো কমেছে, কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ পদের জন্য রাজনৈতিক সংঘর্ষ কমেনি। আফ্রিকার প্রত্যেকটি দেশেই রাষ্টপতির কার্যকাল নির্ধারিত। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে আজ অবধি আফ্রিকার দশটি দেশের প্রেসিডেন্ট, কুর্সিতে থাকার জন্য দেশের সংবিধানই পালটে দিয়েছেন। একই সঙ্গে বেড়েছে আফ্রিকা মহাদেশের প্রেসিডেন্টদের গড় বয়েস। ১৯৮০ সালে আফ্রিকার প্রেসিডেন্টদের গড় বয়েস ছিল ৫২। এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৬৬ বছরে। এর কারণ হলো স্বৈরাচার, রুগ্ন গণতন্ত্র। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ক্ষমতার গদিতে ছিনে জোঁক হয়ে বসে থাকা বৃদ্ধ নেতাদের ক্ষমতা ছাড়ার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। তাই আফ্রিকার পালাবদলের ময়দানে আজও তাই তুরুপের তাস হয়ে আছে সামরিক অভ্যুত্থান।