
শেষ আপডেট: 11 August 2023 12:21
পৃথিবীর ইতিহাসে মহামারী বারবার এসেছে। কখনও কখনও তা করোনার মতোই বিশ্বজোড়া প্যানডেমিকের আকার নিয়েছে, কখনও আবার সীমাবদ্ধ থেকেছে এক একটি দেশেই। এই মহামারীর তালিকায় সবথেকে ভয়াবহ রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে প্লেগ। যা একাধিক বার ফিরে ফিরে এসেছে। যতবার এসেছে, ততবার লক্ষ লক্ষ প্রাণ সাথে নিয়ে গেছে। কিন্তু ভারতে এই প্লেগ মহামারীর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য অধ্যায়। যে অধ্যায় আজও রয়ে গেছে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে বা গবেষকদের পেপারে।
১৮৫৫ সালে তৃতীয় বারের জন্য যখন প্লেগ মহামারী এল পৃথিবীর বুকে, ভারতে তখন ইংরেজদের শাসন চলছে। ইতিহাস বলে, এই মহামারীরও উৎস ছিল চিন। ১৮৯৬ সালে এই মহামারী ঢুকে পড়ে ভারতে। প্রথমে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে মহারাষ্ট্রে। ভারতেই লক্ষাধিক মানুষ মারা যান।
এই সময়ে দেশজুড়ে প্লেগ মহামারী দমনের নির্দেশ পেলেন পুণেতে নিযুক্ত এক সরকারি আমলা ওয়াল্টার চার্লস র্যান্ড। সরাসরি ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া অফিস থেকে আসে নির্দেশ। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, নিজের ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে প্রচুর ভারতবাসীর ওপর নির্মম অত্যাচার চালান তিনি। এই থেকেই শুরু লড়াই। এক সময়ে চার তরুণ স্বাধীনতা সংগ্রামী মিলে তাঁকে হত্যা করে পরে শহিদ হন। ইতিহাসে র্যান্ড পরিচিত 'প্লেগ কমিশনার' নামে। আর ওই শহিদরা পরিচিত 'চাপেকর ব্রাদার্স' নামে।
এই সময়ে প্লেগ ভারতে থাবা বসানোর প্রথম ২৬ দিনেই প্রায় ৭০০ মানুষ মারা যান। ক্রমশ ভয়ঙ্কর হতে থাকে অবস্থা।
এই অবস্থায় ব়্যান্ডকে নিয়োগ করে ব্রিটিশ সরকার পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছিল, মানুষকে রোগের সম্পর্কে সচেতন করার জন্যই এই কমিশন বসানো। এর কোনও অপব্যবহার যেন না হয়। বিশেষ করে মহিলাদের ব্যাপারে অতি সচেতন থাকতে হবে। প্লেগ পরীক্ষার অজুহাতে কোনও মহিলাকে খোলা জায়গায় পরীক্ষা করা যাবে না।
সব শুনে, বুঝে ১৮৯৭ সালের ৮ই মার্চ সরকারি ভাবে প্লেগ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব হাতে নেন র্যান্ড সাহেব। কিন্তু ইতিহাস বলছে, দায়িত্ব পাওয়া মাত্রই অবিশাস্য ভাবে প্লেগের থেকেও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেন র্যান্ড নিজেই। যেভাবে তিনি কাজ চালাতে থাকেন, তাতে মনে হয় রোগ নির্মূল করা নয়, দরিদ্র ভারতীয়দের ওপর অত্যাচার করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
কোনও ডাক্তার বা গবেষক নয়, প্লেগ দমনের জন্য প্রথমেই তিনি প্রায় ৯০০ গোরা অফিসারকে নিযুক্ত করলেন প্লেগ দমনে। এবং নির্দেশ দিলেন, কোথাও রোগ বা রোগীর হদিস পেলেই যেন সেই অঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। শোনা যায়, একের পর এক গাঁ উজাড় হয়ে যায় এই অত্যাচারে। মানুষ পালাতে শুরু করেন সংক্রামিত এলাকা থেকে। ফলে আরও ছড়ায় অসুখ
এই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদের ঝড় উঠল সাহেবের বিরুদ্ধে। সরব হয়েছিল তৎকালীন অমৃতবাজার পত্রিকা। বাল গঙ্গাধর তিলক সম্পাদিত 'কেশরী' পত্রিকায় তিনি ব্রিটিশ রানিকে উদ্দেশ্য করে সম্পাদকীয় চিঠি লিখলেন। স্পষ্ট বললেন, রোগ দমনের নামে ভারতের জনগণের ওপর অত্যাচার চালানোর কোন অধিকার নেই ব্রিটিশদের। র্যান্ডের মতো একজন অযোগ্য, অত্যাচারীকে এই দায়িত্ব দেওয়া উচিত হয়নি।
এই লেখালেখিতে কাজ হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকদের শীর্ষ পর্যায়ের আধিকারিকদের কানে গেল সব কিছু। সতর্কও করা হল সাহেব র্যান্ডকে।
কিন্তু এতে ফল হল উল্টো। আরও বেশি খেপে গেলেন র্যান্ড। বাড়িয়ে দিলেন অত্যাচারের মাত্রা। আগেই নির্দেশ ছিল, পর্যাপ্ত আব্রু ছাড়া কোনও মহিলাদের পরীক্ষা করা যাবে না। ব্রিটিশ অফিসাররা এবার ব়্যান্ডের নির্দেশে নির্বিচারে মহিলাদের পরীক্ষার নামে বিবস্ত্র করতেন থাকেন। চলে পাশবিক অত্যাচারও। আগুন লাগানোর ঘটনা তো চলছিলই। এক বেপরোয়া অত্যাচারী শাসকের দাপটে অস্থির গোটা দেশের নানা প্রান্ত।
এই সমস্ত ঘটনা শুনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে গেছিল পুণের অখ্যাত এক গ্রামের তিন ভাইয়ের বুকে। দামোদর হরি চাপেকর, বালকৃষ্ণ হরি চাপেকর, বাসুদেও হরি চাপেকর। তরতাজা প্রান তাঁরা। টগবগ করে ফুটছে ভরপুর দেশপ্রেম। 'কেশরী' পত্রিকায় লোকমান্য তিলকের লেখনী তাঁদের আরও উদ্বুদ্ধ করতো। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, এই অত্যাচারী শাসককে যেভাবে হোক থামাতে হবে। এ যেন একশো বছর আগে লেখা আর এক 'রং দে বাসন্তী'র চিত্রনাট্য। তিন ভাইয়ের সঙ্গে যোগদান করলেন তাঁদেরই আর এক বন্ধু, মহাদেব বিনায়ক রানাডে।
২২ শে জুন, ১৮৯৭। রানি ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন হবে পুণেতে। খবর ছিল, সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবেন র্যান্ড সাহেবও। তৎকালীন পুণের গনেশখিন্দ রোড, এখন সেনাপতি বাপত রোড-- সেখানেই লুকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন চার জন।
তিন ভাইয়ের হাতে পিস্তল। আর একজন তখন নজর রাখছেন সাহেবের গাড়ির দিকে। হঠাৎ চিৎকার করলেন তিনি “গন্দিয়া আলা রে”! একটি মারাঠি স্লোগান, যার অর্থ, শত্রর এসে গেছে! নিমেষের মধ্যে বেরিয়ে এলেন বাকিরা। ঘুষি মেরে গারির চালককে ফেলে দিলেন। তার পরেই পরপর চলল গুলি। মাথায় গুলি লেগে মারা গেলেন র্যান্ড। আহত হলেন তাঁর অপর এক সাহেব সঙ্গী। যিনি পরে মারা যান হাসপাতালে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর চার জনকে গ্রেফতার করা হয়। আদতে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন তাঁরা। ধরা পড়ে শিকার করে নেন, দেশের মানুষকে র্যান্ডের হাত থেকে বাঁচাতে তাঁরা এইকাজ করেছেন। বিচারের পর পুনের ইয়ারভেদা জেলে ফাঁসি দেওয়া হয় একে একে চার জনকে।
শহিদ হন চার তরুণ প্রাণ। তিন ভাই ইতিহাসের পাতায় পরিচিত 'চাপেকর ভাই' নামে পরিচিত। মহামারী রোধে ভূমিকা রাখতে না পারলেও, তার থেকেও ভয়ঙ্কর এক শাসকের হাত থেকে দেশকে বাঁচিয়েছিলেন তাঁরা।প্লেগের মতো এক মহামারী পরোক্ষ ভাবে জন্ম দিয়েছিল তিন দেশপ্রেমিকের। ভারতের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামকেও সমৃদ্ধ করেছিল এই ঘটনা।।
স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিস্মৃত নায়ক, ফাঁসির দড়ি যাঁর কাছে ছিল জয়ের মালা