
শেষ আপডেট: 18 December 2020 08:06
পাথরপ্রতিমার দক্ষিণ দিকের একটি দ্বীপভূমি হল জি প্লট। এই প্লটের পূর্ব দিকে দিয়ে বয়ে চলেছে চালতাবনী নদী ও পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে চলেছে কার্জন ক্রিক নদী। চালতাবনী নদী মিশেছে জগদ্দল নদীর সঙ্গে আর কার্জন ক্রিক নদী মিশেছে সপ্তমুখী নদীর সঙ্গে, জগদ্দল ও সপ্তমুখী নদী যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সেখানেই জি প্লটের একদম দক্ষিণের গ্রাম গোবর্ধনপুর। রামগঙ্গা অথবা পাথরপ্রতিমা থেকে লঞ্চে সীতারামপুর, সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিনঘণ্টা, তারপর সেখান থেকে মোটরভ্যানে আধঘণ্টার পথ গেলেই গোবর্ধনপুর। টানা বোট সারাদিনে দু-একটি থাকে তাই রামগঙ্গা থেকে বটচূড়া নদী হয়ে বনশ্যামনগরের অশ্বিনীর ঘাট, সেখান থেকে ভ্যানে কালি বাঙাল ঘাট গিয়ে চালতাবনী নদী পেরিয়ে চাঁদমারী ঘাট হয়ে ভ্যানে গোবর্ধনপুর আবার পাথরপ্রতিমা থেকে ওয়ালস ক্রিক নদী পেরিয়ে ব্রজবল্লভপুরের সামন্তর ঘাট তারপরে ভ্যানে তটের বাজার যাওয়ার ঘাট, সেখান থেকে কার্জন ক্রিক পেরিয়ে ভ্যানে গোবর্ধনপুর আসা যায়। এইভাবে পৌঁছলে সুন্দরবনের নদী, জঙ্গল, গ্রাম দেখতে দেখতে এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ হয়ে যাবে।
গোবর্ধনপুর বুড়াবুড়িরতট, ইন্দ্রপুর, সীতারামপুর, উত্তর ও দক্ষিণ সুরেন্দ্রগঞ্জ প্রভৃতি গ্রাম নিয়ে জি প্লট। ২০০০ সালের পর থেকে গোবর্ধনপুরের বঙ্গোপসাগরের রাশি রাশি বালি জমা হতে থাকে। কয়েক বছর বাদে গ্রামের কিছু উৎসাহী মানুষ সেই চরে গাছ লাগাতে শুরু করেন। তারপরে কয়েক বছরে সেই সব গাছ বড় হয়ে সাগরপাড়ে এক বিস্তীর্ণ ঝাউবন তৈরি হয়ে এক নতুন বেলাভূমি গড়ে ওঠে। ঝাউবনের মধ্য দিয়ে বালির পথ ধরে সৈকতে যাওয়ার মজাই আলাদা। সৈকতে কিছু বসার জায়গা ও কিছু সৌন্দর্যায়নের চেষ্টা শুরু হয়েছে। এমন নির্জনে দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির সামনে দাঁড়াতে রোমাঞ্চ লাগে। ভাটার সময়ে সমুদ্র এখানে অনেকটা পিছিয়ে যায়। তখন বেলাভূমির বিস্তার অনেকটা বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে গোবর্ধনপুরের সি বিচের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পশ্চিমবাংলার অন্য সি বিচের থেকে আলাদা। এখানে বাঘের ভয় নেই তবে দু-একবার এখানে বাঘ এসেছিল। শীতকালে এখানে মনোরম তবে বর্ষায় এলে টাটকা ইলিশের স্বাদের জন্য অনেকদিন মনে থাকবে এই জায়গাকে। যারা এখানে যেতে উৎসাহী তাদের থাকা খাওয়ার জন্য স্থানীয় গ্রামবাসী সুধাংশু মাইতি (৯৭৩৪০৪৯৬৩৭) বা ভৈরব দাসের (৯৭৩৫৫৫৭৮৫৬) সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
এছাড়া ঘুরে দেখা যেতে পারে সুন্দরবন রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম সংঘ। মূলত প্রদ্যোৎকুমার সাঁতরা, ভুবনচন্দ্র পাত্র প্রমুখের চেষ্টায় ১৯৭৪ সালে ৩১ অক্টোবর কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা হয়। গোবর্ধনপুরে খুব শ্রদ্ধার জায়গা এই আশ্রম শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের লোকশিক্ষা পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচি প্রভৃতি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। এখানে রামকৃষ্ণ উপাসনালয়টি খুব পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর। এখানে ছোট তোরণ, গদাধর মঞ্চ, সিদ্ধিদানন্দ ভবন অতিথিনিবাস, ছোট উদ্যান প্রভৃতি নিয়ে নির্জনে আশ্রমটি বেশ ভাল। রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের জন্মদিন খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে এখানে পালিত হয়। থাকার জন্য রিপ্লাই কার্ডে লিখতে পারেন-– সুন্দরবন রামকৃষ্ণ সেবা সংঘ, গোবর্ধনপুর, পো. : বুড়াবুড়ির তট, পাথরপ্রতিমা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পিন : ৭৪৩৩৭১।
গ্রামে পুরাতন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে রয়েছে গ্রামদেবী বিশালাক্ষী দেবীর মন্দির। একটি শিলামূর্তিতে দেবী এখানে অধিষ্ঠান করেছেন। মাঘী পূর্ণিমার দিন দেবীর বার্ষিক পূজা হয়, সারা গ্রাম মেতে ওঠে এই সময়। আরও একটি বিশালাক্ষী দেবী পূজিতা হন গ্রামের বেনু পাণ্ডার বাড়িতে।
গোবর্ধনপুর সুন্দরবন প্রত্নসংগ্রহশালা : সীতারামপুর ও গোবর্ধনপুরের মাঝের গ্রাম বুড়াবুড়ির তটে বিশ্বজিৎ সাউয়ের বাড়িতেই এই সংগ্রহশালা। গোবর্ধনপুর গ্রামে বিশ্বজিৎবাবুর দাদা বিমল সাউয়ের বাড়িতেও তার সংগৃহীত বহু প্রত্নবস্তু সংগৃহীত আছে। ভাঙাচোরা মাটির হাঁড়ি, থালা সহ নানান তৈজসপত্র, দেবদেবীর ভাঙামূর্তি, খেলনা, প্রদীপসহ নানান পূজার সামগ্রী, বেশ কিছু প্রাণীর হাড়গোড়ের ফসিল, বাঘের পায়ের ছাপ প্রভৃতি সংগৃহীত আছে প্রত্ন সংগ্রহশালায়। এগুলি বিশ্বজিৎবাবু মাছ ধরতে যাবার সময় সংগ্রহ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুন্দরবনে মানব বসতির ইতিহাস খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে পাল-সেন যুগ অর্থাৎ দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ছিল, এগুলি তারই চিহ্ণ। গোবর্ধনপুর ভ্রমণকালে এই মিউজিয়ামটি অবশ্যই দেখা উচিত।
ইংরেজ রাজত্বকালে সুন্দরবনে জঙ্গল কেটে বসতি শুরুর সময় গদামথুরা দ্বীপেও বন কেটে বসত শুরু হয়েছিল। প্রায় ১২৫ বছর আগে পূর্ব মেদিনীপুরের মুগবেড়িয়া গ্রামের জমিদার ভোলানাথ নন্দের তিন পুত্র ছিল গোবিন্দ, দিগম্বর ও গঙ্গাধর। এঁদের মধ্যে দিগম্বর ছিলেন বিদ্বান ও সুপণ্ডিত, তাঁর পাণ্ডিত্যের যৌতুক হিসাবে তিনি সুন্দরবনের বনাঞ্চল পরিপূর্ণ লাট নং ১১৪ অর্থাৎ গদামথুরা দ্বীপের দ্বিতীয়, অষ্টম ও নবম খণ্ডটি পান। যৌথ পরিবারে এটি তিন ভাইয়ের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। বড় ভাই গোবিন্দ পান অষ্টম খণ্ড, তিনি ১৩০০ সন নাগাদ তাঁর বড় ছেলে শ্যামচরণকে কিছু লোকলস্কর দিয়ে পাঠান। দুই-তিন বছরের চেষ্টায় জঙ্গল কিছুটা পরিষ্কার হলে তিনি মুগবেড়িয়া অঞ্চল থেকে গরিব লোকেদের প্রজা হিসাবে এখানে এনে বসান এবং চাষবাস শুরু করেন। শ্বাপদশঙ্কুল বনভূমি এইভাবে ক্রমশ শস্যশ্যামলা হয়ে উঠল। এই ভাবে কুড়ি বছর কেটে যাবার পরে ধানের ফলন বৃদ্ধি হওয়ায় ধান সঞ্চিত করে রাখার সমস্যা দেখা দিল। মেদিনীপুরের মতো এখানে বাঁশ বা বেত পাওয়া যেত না যা দিয়ে ধানের গোলা করা যায়। এই সময় একজন খবর দিল কাছারিবাড়ির পূর্বদিকে যে বড় পুকুর আছে সেখানকার ঝোপেঝাড়ে প্রচুর পোড়া ইট পড়ে আছে, ধান রাখার ঘর বানানো যেতে পারে। ইট সংগ্রহের কাজ শুরু হল, ইটের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করতেই পাওয়া গেল একটি ঘন কৃষ্ণপাথরের বিষ্ণুমূর্তি। শ্যামচরণবাবুর সন্দেহ হল এটি হয়তো প্রাচীন দেবস্থান ছিল। তিনি সব ইট সরানোর নির্দেশ দিলেন। একে একে বেরিয়ে এল আট-দশটি পাথরের মূর্তি। আরও খোঁড়াখুঁড়ির পর প্রায় তিন ফুট চওড়া দেওয়ালের একটি মন্দিরের গর্ভস্থল পাওয়া গেল। সাবধানে গাঁইতি-কোদাল দিয়ে গর্ভস্থলের মাটি সরানোর সময় প্রায় চারফুট নীচে কোদাল একটি পাথরে আঘাত করল, খুব সাবধানে কাজ চলতে লাগল যাতে পাথরের ক্ষতি না হয়। সব মাটি তুলে ফেলার পর এক বৃহদাকার শিবলিঙ্গ খুঁজে পাওয়া গেল যা শক্তপোক্তভাবে মাটির সঙ্গে প্রোথিত। গর্ভগৃহের মাটি সরিয়ে আবিষ্কৃত হল নেত্রনালা ও চরণামৃত সঞ্চয়ের প্রকোষ্ঠ।
বহু প্রাচীনকালে আদিগঙ্গার ধারে পবিত্রস্থানে মানুষের বসতি ও বহু দেবদেবীর মন্দির ছিল। ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতির কারণে এখানে জনবসতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছিল। সমুদ্রের নোনাজল সবকিছুকে গ্রাস করে নিয়েছিল। ঘরবাড়ি সব ধূলিসাৎ হয়ে শিবালয়ও ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছিল। কিন্তু অক্ষত থেকে গেছিল শিবলিঙ্গ সহ কিছু প্রস্তর মূর্তি। সুন্দরবনে বহু জায়গায় এবং পাথরপ্রতিমা ব্লকের বহু জায়গায় প্রাপ্ত নিদর্শন এই জায়গার প্রাচীনত্বের কথা জানান দেয়।
শিবলিঙ্গ আবিষ্কার হওয়ায় পরেই শ্যামাচরণবাবু নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে মেদিনীপুর থেকে পুরোহিত আনিয়ে দেবাদিদেবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন। শিবস্থানের উপর ছোট কুটির তৈরি করলেন। সামনেই ছিল ফাল্গুনের শিব চতুর্দশী অর্থাৎ শিবরাত্রি, খবর ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন এলাকার মানুষ শিবরাত্রি পালনের জন্য মন্দিরে এসে উপস্থিত হলেন, মন্দির প্রাঙ্গণে এক উৎসবের চেহারা নিল। সেই ১৩২১ সন থেকে আজ অবধি মন্দিরে শিবরাত্রি উৎসব পালিত হয়ে আসছে। একশো বছর অতিক্রান্ত মেলা এখন বিরাট আকার নিয়েছে। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় মেলা গঙ্গাসাগর মেলা, এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা হিসাবে এখন চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় ১৫ দিন ধরে চলে এই মেলা, খাবারের নানা দোকান, খেলনা, সাজগোজ, মণিহারি, মাদুর, বাদ্যযন্ত্র, কবিরাজি ঔষধ থেকে নানান জিনিসের দোকান, সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে পুরনো ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দোকান, প্রতিরাতে যাত্রাসহ নানান উৎসব হয়।
বড়ভাই গোবিন্দ নন্দের নাম অনুসারে এই জায়গার নাম দক্ষিণ গোবিন্দপুর, সারাবছর ধরে বহু মানুষ এখানে আসেন। পরম সাধক ওঙ্কারনাথ ঠাকুর এখানে এসে বলেছিলেন-– ‘এটি শিবসাগর, বড় পবিত্র তীর্থস্থান।’ ১৯৬৪ সালে ছয়টি প্রাচীন বিগ্রহ চুরি হয়ে যায়, বাকিগুলি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়ামে সুরক্ষিত আছে। শিক্ষাব্রতী প্রদ্যোৎকুমার জানার উদ্যোগে বিশাল মন্দির তৈরি হয়েছে। মূল ভূমিস্তর থেকে কিছুটা নেমে দর্শন করতে হয় শিবলিঙ্গকে। পাশে দেখে নেওয়া যায় নেত্রনালা, চরণামৃত সঞ্চয়ের প্রকোষ্ঠ, হরিসভা, যাত্রামঞ্চ, বাবার পুকুর, বিশালাক্ষী, কালী প্রভৃতি মন্দির। কয়েক পা এগিয়ে দেখে নেওয়া যায় দক্ষিণ গোবিন্দপুর প্রথম ঘেরি মা নারায়ণী মন্দির। রামগঙ্গায় রাত্রিবাস করে জায়গাটি দেখে নিলে সুবিধার হবে।
গোবর্ধনপুরে রাত্রিবাসের ঠিকানা : ঝাউমন হোম স্টে, চলভাষ— ৯৮৩১৩০৯৫১২, ৯৮৩৬৮৩০৩৪২।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।