
এবারের ইউরোই শেষ, জানিয়ে দিয়েছেন রোনাল্ডো।
শেষ আপডেট: 4 July 2024 16:25
'মাদেইরা... ম্যাঞ্চেস্টার... মাদ্রিদ... তুরিন... ম্যাঞ্চেস্টার এগেইন...'
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১। তারিখটা কেউ মনে রাখেনি। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে নিউকাসল ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে নামছে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড। এই অবধি পড়েও অনেকে জিজ্ঞেস করবেন, ওহো, নিউকাসল ছিল? সেও তলিয়ে গিয়েছে বিস্মৃতিতে। শুধু রয়ে গিয়েছে শব্দগুলো। মন্দ্র, অননুকরণীয়, অবিস্মরণীয় কণ্ঠে কমেন্ট্রি বক্সে বসে বলছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি। বারো বছর পরে, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের মাঠে নামছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। ড্রুরি বলছিলেন, 'রিস্টোরড টু দিস গ্রেট গ্যালারি অফ দ্য গেম... আ ওয়াকিং ওয়ার্ক অফ আর্ট... ভিন্টেজ... বিয়ন্ড ভ্যালুয়েশন...'
শব্দগুলোই টিকে গিয়েছে। উল্কার বেগে ছেয়ে গিয়েছে সমাজমাধ্যম। পিটার ড্রুরির অনবদ্য শিল্পের সঙ্গে যারা পরিচিত, জানেন, ওই বিবরণের চাইতে ভালো ভাবে হয়ত ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো নামক ইতিহাসকে ধরা যায় না। এই প্রজন্ম ভাগ্যবান, তারা বিশ্বফুটবলের দুই জিনিয়াসের দ্বৈরথ চাক্ষুষ দেখতে পারছে। এই প্রজন্ম ভাগ্যবান, যারা এমন একটা সময় লাইভ খেলা দেখছে, যখন ফুটবলে রাজত্ব করছেন লিওনেল মেসি ও রোনাল্ডো, টেনিসে রজার ফেডেরার-রাফায়েল নাদাল, ক্রিকেটে বিরাট কোহলি-রোহিত শর্মা...।
শব্দ থেকে যায়। ভাষ্য, কবিতা, আলেখ্য দীর্ঘস্থায়ী। বাস্তব ততটা হতে পারে কই? এক মরসুমেই ম্যাঞ্চেস্টারে রোনাল্ডোর সঙ্গে সংঘাত শুরু হয় ম্যানেজার এরিক টেন হ্যাগের। ফিটনেস, ক্ষিপ্রতা, ধার সবেতেই বয়স ছাপ ফেলতে শুরু করেছে। অথচ রোনাল্ডো মানবেন না। কোচ টেন হ্যাগ রোনাল্ডোকে বসিয়ে দিলেন। অসন্তোষ আরও বাড়ল। এদিকে ইউরোপের কোনও ক্লাব রোনাল্ডোকে নিতে আগ্রহী নয়। শেষে পিয়ার্স মর্গ্যানের টক শো-তে গিয়ে রোনাল্ডো বলে এলেন, ম্যানেজার টেন হ্যাগের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র সম্মান নেই। এই পরিস্থিতিতে দলে টেকা দায়। কাতার বিশ্বকাপের আগেই অতএব পুরনো ক্লাবের সঙ্গে গাঁটছড়া ছিঁড়ে গেল। ইউরোপ ছেড়ে দুই মহাতারকা চলে গেলেন দুই দিকে। রোনাল্ডো পাড়ি দিলেন সৌদি আরবে। লিওনেল মেসি চললেন অতলান্তিকের ওপারে, ইন্টার মায়ামিতে।
মেসি সমালোচকদের বিশেষ কথা বলার সুযোগ দেননি। ইন্টার মায়ামি নিয়ে কোনও বিতর্কও ওঠেনি। কাতারে বিশ্বকাপ জিতে যা জবাব দেওয়ার দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু টালমাটাল হয়েছেন রোনাল্ডো। সৌদি ক্লাব আল নাসেরের হয়ে যেমনই খেলুন, বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা গেল, আর পারছেন না সিআর সেভেন। সেই পুরনো ধার আর নেই। শুরু থেকে আর তাঁকে নামালেন না কোচ ফেরনান্দো স্যান্টোস। শেষে মরক্কোর কাছে হেরে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়লেন সিআর সেভেন। সবাই ভেবেছিল, শেষ। আর নয়। সব ভাল যার শেষ ভাল... হয়ত সবার কপালে লেখা থাকে না।
মানেননি শুধু রোনাল্ডো। চলে এসেছেন ২০২৪ ইউরো খেলতে, জার্মানিতে।
ফেরনান্দো স্যান্টোস আর নেই। নতুন কোচ রবের্তো মার্তিনেজ। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামকে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপ খেলতে যখন রোমেলু লুকাকুদের সঙ্গে কাতারে নামছেন, বেলজিয়াম বিশ্বে দুই নম্বরে থাকা দল। অথচ গ্রুপ থেকেই ছিটকে গিয়েছিল তারা। চাকরি খোয়াতে হয় মার্তিনেজকে। যোগ দেন পর্তুগালে। মার্তিনেজ বাস্তবটা বোঝেন। জানেন, রোনাল্ডোকে বসিয়ে দিলে হয়ত ফলাফল অন্য রকম হতে পারে। কিন্তু আর একজনকে বসানো আর পর্তুগাল দল থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে বসানো, দুটো তো এক নয়!
বয়স ছাপ ফেলেছে। এখনও ইউরোতে একটাও গোল পাননি সিআর সেভেন। তারপরেও, তর্কাতীতভাবে এই ইউরোতে সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা তিনিই। স্রেফ তাঁর জন্য ভিড় উপচে পড়ছে অনুশীলনে। টিম বাস থেকে কখন তিনি নামবেন, দেখতে ঠায় দাঁড়িয়ে হাজার হাজার আমজনতা। এই জনপ্রিয়তাই কি কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে? জীবনের শেষ ইউরোতে কিছু করে দেখাতে মরিয়া রোনাল্ডো। মেসি বিশ্বকাপ জেতার পর ব্যাপারটা একেবারে সম্মুখ সমরে চলে গিয়েছে। যতই জীবনের সোনাঝরা সময়টায় ফুটবলকে ভরিয়ে দিন রোনাল্ডো। যায় আসে না। একবার ইউরো জিতিয়েছেন পর্তুগালকে। তিনি নিজেই বলেন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি'অর, প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা সবকিছুর চাইতে তাঁর কাছে বেশি আনন্দের ওই ইউরো। আরও একবার সেটা জিতিয়েই শেষ করতে চান তিনি।
এদিকে তিনি যাতে গোল পান, সে জন্য চেষ্টায় ত্রুটি রাখছে না পর্তুগিজ দলের বাকিরা। এখনও তিনি ফ্রি ফিক নিতে দাঁড়ালে উৎসুক হয়ে ওঠে গ্যালারি। এখনও তিনি পেনিট্রেটিং জোনে বল পেলে গর্জন করে ওঠে জনতা। কিন্তু গোল অধরাই থেকে গিয়েছে রোনাল্ডোর। ক্রমশ মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এক একটা সুযোগ ফস্কানোর পরে শরীরী ভাষাতেই বোঝা যাচ্ছে, একটা গোল পাওয়ার জন্য কতটা মরিয়া হয়ে রয়েছেন। ফুটবল দেবতা নৃশংস উপেক্ষায় এড়িয়ে গিয়েছেন। যে পেনাল্টি মারার জন্য তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি, স্লোভেনিয়ার জ্যান ওবলাক বাঁ হাতে সেটিও আটকে দিয়েছেন। আর স্থির থাকতে পারেননি সিআর সেভেন। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছেন মাঠে। হাজার মাইল দূর থেকে, টিভির পর্দাতেও মালুম হচ্ছিল মুহূর্তটা। দুই দশক ধরে ফুটবল দুনিয়াকে শাসন করা সম্রাটের সবটুকু ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল ওই একটা পেনাল্টি আটকানোয়। সতীর্থরা জড়িয়ে ধরে মনোবল জোগালেন। টাইব্রেকারে গোল দিলেনও। কিন্তু জোড়হাতে মাফ চেয়ে গেলেন। সেই 'স্যু' সেলিব্রেশন দেখা গেল না এখনও।
সাংবাদিক সম্মেলনে একজন প্রশ্নটা করেই ফেললেন মার্তিনেজকে। 'কী মনে হয়, খুব কি প্রেডিক্টেবল হয়ে যাচ্ছে? এই যে সবাই মিলে শুধু রোনাল্ডোর দিকেই বল বাড়াচ্ছে...'। সারা টুর্নামেন্টে ২০ বার গোলে শট নিয়েছেন রোনাল্ডো। যা এবারের ইউরোয় এখনও অবধি সর্বোচ্চ। অথচ জালে বল যায়নি। ১৯৮০ সাল থেকে নাকি গোল না করেও তাঁর চেয়ে বেশি গোলে শট নিয়েছেন মাত্র চার জন। ২০২০ ইউরোতে দানিয়েল ওলমো (২১), ২০১৬ ইউরোতে কেভিন দে ব্রুইন (২১), ১৯৯৬ ইউরোতে স্পেনের ফেরনান্দো হিয়েরো (২৩) ও ২০০৪ ইউরোতে পর্তুগালেরই ডেকো (২৪)। এখনও অবধি রোনাল্ডোই একমাত্র ফুটবলার, যিনি ছ'টা ইউরোতে খেলছেন। ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনও নজির নেই আর।
ইতিমধ্যে একটি সংবাদমাধ্যমে রোনাল্ডো জানিয়ে দিয়েছেন, এবারের ইউরোই তাঁর শেষ ইউরো হতে চলেছে। ভাল হোক কি খারাপ, এর পর আর দেশের জার্সিতে হয়ত তাঁকে দেখা যাবে না। সিআর সেভেন ভক্তরা একবাক্যে চাইছেন, অন্তত ইউরোটা জিতেই শেষ করুন তিনি। কিন্তু ফুটবল-বুদ্ধিতে বলে, ফরাসি বাধা টপকানো কঠিন রোনাল্ডোর পক্ষে। পর্তুগাল ভক্তদের আশা, ফ্রান্স যেভাবে নড়বড় করছে, তাতে ম্যাচের ফলাফল কী হবে বলা কঠিন। জিততে পারলে অবশ্য মিউনিখে জার্মানি বা স্পেনের সামনে পড়তে হবে। সে আরও কঠিন গাঁট। সেই অবধি যেতে গেলে, আগামীকাল গোল করতেই হবে সিআর সেভেনকে।