এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্লেষকদের মতে, একগুচ্ছ নতুন সাইনিং। আক্রমণভাগে বড় রদবদল ঘটেছে—স্লোভেনিয়ান স্ট্রাইকার বেনজামিন শেস্কো, প্রিমিয়ার লিগে পরীক্ষিত ব্রায়ান মবেউমো আর ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মাতেউস কুনা।

ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড
শেষ আপডেট: 15 August 2025 12:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক লিলিপুট দল এসে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে দাদাগিরি দেখাচ্ছে, ছিনিয়ে নিচ্ছে তিন পয়েন্ট, খেলোয়াড়রা অসন্তুষ্ট, কেউ ট্রেনিংয়ে আসছেন না, কেউ ম্যানেজারের মুখের উপর কথা বলছেন, প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন, গ্যালারির ছাদ ছাদ ভেঙে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঝরে পড়ছে বর্ষার জল—এই সমস্ত ছবি ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে ঠিক মানানসই নয়!
তাই বলে বাস্তবকে তো আর অগ্রাহ্য করা যায় না। গ্লেজারদের হাতে পড়ে ক্লাবের যা দৈন্যদশা, তাতে সমর্থকদের রোষ দেখানো সঙ্গত। নতুন মালিক স্যার জিম র্যাটক্লিফ এসে কিছুটা মেরামতির চেষ্টা করেছেন। পুরনো ম্যানেজার এরিক টেন হাগকে প্রবল বিতর্কের মুখেও সিজন শুরুর আগে সরিয়ে না দেওয়াটা ছিল একটা সংকেত: নয়া মালিকপক্ষ সময় দিতে প্রস্তুত। তাঁরা বিনিয়োগ করবেন ঠিকই। কিন্তু স্থিতিবস্থা আনতে এই মুহূর্তে জরুরি হচ্ছে ‘সময়’ আর ‘আস্থা’।
টেন হাগের নিষ্ক্রমণ দেওয়ালে লেখা ছিল। ধারাবাহিক খারাপ পারফরম্যান্সের জেরে সিজনের মাঝপথে ডাচ ম্যানেজার চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব বুঝে নেন তুলনায় অনভিজ্ঞ ও নবীন পর্তুগিজ কোচ রুবেন অ্যামোরিম। এমন সময় মসনদে বসেছিলেন, যখন ক্লাব অবনমনের গাড্ডায়। সেই অবস্থা থেকে কুড়ি টিমের লিগে পনেরো নম্বরে শেষ করাটা মস্ত বড় সাফল্য না হলেও একটা আশার সংকেত তো বটেই। বিশেষ করে ইউরোপা লিগের ফাইনালে ওঠা টিম বুঝিয়ে দিয়েছে, তরুণ ব্রিগেডকে ঠিকভাবে চালাতে পারলে সুদিন আসন্ন! কিন্তু সেটা কি এই মরশুম? প্রশ্ন আপাতত এটাই।
গত মরশুম ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায়। প্রিমিয়ার লিগের তলানিতে কোনও রকমে মুখ লুকোনো, ইউরোপের প্রতিযোগিতায় জায়গা না পাওয়া—এমন অবস্থা অকল্পনীয় ছিল। স্যার অ্যালেক্সের সোনালি আমলে যে ক্লাব আকছার ‘ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নে’র মুকুট পরে সিজনের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামত, তারা এখন চূড়ান্ত অবক্ষয় আর অবনতির কিনারে দাঁড়িয়ে। মাঠে ফলাফল যেমন হতাশাজনক, তেমনই ভেতরে দানা বেঁধেছে বিভ্রান্তি, চোট এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব। পুরো মরশুমে ৩৮ ম্যাচে মাত্র ৪৪ গোল আর ৪২ পয়েন্ট নিয়ে রেলিগেশন অঞ্চলের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি—পরিসংখ্যানই বলছে বিপর্যয়ের বিষ কতটা গভীরে! এই ধস সামাল দিতে বোর্ড হাত বাড়িয়েছেন অ্যামোরিমের দিকে। তাঁর দায়িত্ব—ধুলো জমা আত্মসম্মানকে ঝেড়ে ফেলা, দলের হারানো ধার ফিরিয়ে আনা।
নতুন মরশুমে আগে সমর্থকদের নজর ছিল প্রিসিজনে। কিছুটা হলেও আশার ঝলক স্পষ্ট। প্রথম ম্যাচে লিডসের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র—খুব আকর্ষণীয় না হলেও রক্ষণে দৃঢ়তা দেখা গিয়েছে। এরপর আমেরিকায় প্রিমিয়ার লিগ সামার সিরিজে দলের পারফরম্যান্স অনেকটাই প্রাণবন্ত—ওয়েস্ট হ্যামের বিরুদ্ধে ২-১ জয়, বরনমাউথকে ৪-১ উড়িয়ে দেওয়া আর এভারটনের সঙ্গে ২-২ ড্র করে শেষমেশ শিরোপা জেতা। এই ছোট টুর্নামেন্টের সাফল্য হয়তো আস্ত সিজনের চিত্রনাট্য বদলে দেবে না। কিন্তু ড্রেসিংরুমে আত্মবিশ্বাস ফেরানোয় কার্যকর হতে পারে। ঘরের মাঠ ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে স্ন্যাপড্রাগন কাপে ফিওরেন্তিনার সঙ্গে ১-১ ড্র করে পেনাল্টিতে জয়ে নতুনদের সঙ্গে পুরোনোদের বোঝাপড়ার ট্রেডমার্ক ছাপ। যদিও প্রিসিজন ন্যূনতম মাপকাঠি নয়, তাহলে ম্যান ইউনাইটেডের লড়াইয়ে একটা অদম্য জেদ দেখা গিয়েছে, যা গত সিজনে সেভাবে চোখেই পড়েনি।
এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্লেষকদের মতে, একগুচ্ছ নতুন সাইনিং। আক্রমণভাগে বড় রদবদল ঘটেছে—স্লোভেনিয়ান স্ট্রাইকার বেনজামিন শেস্কো, প্রিমিয়ার লিগে পরীক্ষিত ব্রায়ান মবেউমো আর ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মাতেউস কুনা। তিনজনই গত মরশুমে গোল করা এবং অ্যাসিস্ট বাড়ানোয় ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। শেস্কো লেইপজিগে ৩৯ ম্যাচে ১৮ গোল করে নিজের সুনাম ধরে রেখেছেন। মবেউমো ব্রেন্টফোর্ডে ছিলেন দলের সেরা গোলদাতা, কুনা উলভসের আক্রমণের চালিকাশক্তি। এই ত্রয়ীকে ঘিরেই অ্যামোরিম আক্রমণের নতুন নকশা গড়ছেন। আগের বছরের প্রধান সমস্যা ছিল গোলের অভাব—মাঝমাঠ থেকে ফরোয়ার্ড লাইনে সঠিক সাপ্লাই, এবং বক্সে ফিনিশিং টাচ—দুটোই কম পড়ছিল। নতুনদের আগমনে অন্তত কাগজে-কলমে সেই ফাঁক পূরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে সব কিছু এত সহজে মিটে যাওয়ার কথা নয়। প্রিসিজন বুঝিয়ে দিয়েছে, মিডফিল্ডে গতির অভাব এখনও প্রকট। লিডসের বিরুদ্ধে খেলায় যা স্পষ্ট। প্রতিপক্ষের দ্রুত আক্রমণ ঠেকাতে গতি ও পজিশনিংয়ে দুর্বলতা রয়ে গিয়েছে। অ্যামোরিম জানেন, শুধু আক্রমণ সাজালেই হবে না, মাঝমাঠ ও রক্ষণেও ভারসাম্য আনতে হবে।
আরেকটি প্রশ্নচিহ্ন গোলকিপার পজিশন—ডেভিড ডি গিয়া চলে যাওয়ার পর থেকে ক্লাবে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি ভরাট হয়নি। ওনানা সম্ভবত ক্লাব ছাড়বেন। তাঁর বিকল্প কে? পিএসজি-প্রত্যাখ্যাত ডোনারুমা?
সবকিছু মিলিয়ে সমর্থকদের মধ্যে এখন দু’ধরনের চিন্তা কাজ করছে। একদল আশাবাদী। তাঁদের মতে, গত মরশুমের ধাক্কা দলকে শিখিয়েছে, নতুন সাইনিং রক্তাল্পতার অভাব দূর করবে। আর অ্যামোরিমের নেতৃত্বে আস্থা রাখলে অন্তত টপ সিক্সে ফেরা সম্ভব।
অন্যদিকে সংশয়ীরা মনে করছেন, দলে এখনও যথেষ্ট গভীরতা নেই। মরশুমের দীর্ঘ চাপ সামলাতে গিয়ে পুরোনো সমস্যাগুলো ফের মাথা তুলতে পারে। প্রেডিকশন মডেলগুলোও দ্বিধায়—কেউ বলছে নবম স্থান, কেউ পাঁচ নম্বর পজিশন পর্যন্ত বাজি ধরতে প্রস্তুত। শিরোপা জয়ের লড়াই? সেটা আপাতত কল্পনায়। অবাস্তব।
কিন্তু ফুটবল এমন এক খেলা যেখানে গল্প বদলাতে সময় লাগে না। যদি শেস্কো দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন, মবেউমো ও কুনা ধারাবাহিকভাবে গোল এবং অ্যাসিস্ট যোগান আর মিডফিল্ডে সঠিক রোটেশন হয়, তাহলে ছবিটা দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। আর সেখানেই অ্যামোরিমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—একটি ছন্নছাড়া দলকে একসূত্রে বেঁধে, চোট ও ফর্মহীনতার ধাক্কা সামলে চাপের মুহূর্তে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?
ভ্যান গাল পারেননি, জোসে মোরিনহো ব্যর্থ হয়েছেন। অ্যামোরিম? দলের পারফরম্যান্সের পাশপাশি তাঁর গতিবিধিতেও আতশকাচ পাতা।