কেন নিজেদের চিরাচরিত খেলার ধরন, ট্রেডমার্ক রণকৌশল বদলে ফেলল ইংল্যান্ড? নেপথ্যে একাধিক কারণ দাঁড় করিয়েছেন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ।

বেন স্টোকস ও ঋষভ পন্থ
শেষ আপডেট: 11 July 2025 11:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটা চালু প্রবাদ। কিন্তু ভুল করে শিক্ষার খোলনলচে আমূল পালটে ফেলা সচরাচর দেখা যায় না।
যেটা দেখা গেল গতকাল। লর্ডসের ময়দানে। বাজবলের ডানায় ভর করে লিডসে কেল্লাফতে করেছিলেন বেন স্টোকসরা। কিন্তু সেই নব্য-আধুনিক ট্যাকটিক্সই দলকে এজবাস্টন টেস্টে খাদের কিনারে নিয়ে আসে। পালটা রুখে দাঁড়ায় টিম ইন্ডিয়া। বাজবলের আগ্রাসন ফিকে করে দেন শুভমান গিল, আকাশ দীপ। একজনের জোড়া সেঞ্চুরি, অন্যজনের দুই ইনিংস মিলিয়ে দশ উইকেট ইংল্যান্ডকে খোলসের ভেতর গুটিয়ে যেতে বাধ্য করে।
তৃতীয় পরীক্ষা লর্ডসে। নজরে ছিল ইংল্যান্ডের রণকৌশল। ভারত যে ধারাবাহিক টিম গেম উপহার দেবে, সেই বিষয়ে কারও কোনও সন্দেহ ছিল না। লোয়ার অর্ডার নিয়ে ধোঁয়াশা অনেকটাই কেটে গিয়েছে। মিডল অর্ডার নিয়েও ধাঁধা নেই। বোলাররা দুর্দান্ত ছন্দে। টপ অর্ডার দুরন্ত ফর্মে। ফলে সবার নিশানায় ইংল্যান্ড। সেই বাজবলের তত্ত্ব মেনেই কি ঘুঁটি সাজাবেন কোচ ব্র্যান্ডন ম্যাকালাম? নাকি আগের পন্থা থেকে সরে এসে আরেকটু বুঝেশুনে, ধরে-বেঁধে পারফর্ম করবে ইংল্যান্ড শিবির?
টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এর একটা প্রাথমিক উত্তর দেন অধিনায়ক বেন স্টোকস। যেহেতু বাজবলের হ্যান্ডবুক রান তাড়া করার দর্শনে আস্থা রাখতে শেখায়, তাই চতুর্থ ইনিংসে যাতে ব্যাট করার সুযোগ জোটে—এই কথা মাথায় রেখে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিবারই টসে জিতলে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের অপশন বেছে নিয়েছেন স্টোকস।
গতকাল এর অন্যথা দেখল লর্ডসের জনতা। স্টোকস জানালেন, তাঁরা প্রথমে ব্যাটিং করবেন। তাহলে কোথায় গেল বাজবল? উপরন্তু, লর্ডসের পিচ ঘাসে ছাওয়া বলে যে হাওয়া ছড়িয়েছিল, তার কী হবে? প্রথমে ব্যাট করতে নেমে আগুনে ফর্মে থাকা বুমরাহ, গত ম্যাচে ঘুম কেড়ে নেওয়া আকাশ দীপের সামনে পড়াটা কি আত্মঘাতী হবে না?
এমনই প্রশ্ন যখন ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন দেখা গেল উলটপুরাণ। বাইশ গজ যেমনটা ভয়ানক হবে বলে মনে করা হচ্ছিল, তেমনটা মোটেও নয়। ঘাস রয়েছে। কিন্তু সিম কিংবা সুইং বিপজ্জনক ঠেকছে না। সহজে ব্যাট করা যাচ্ছে।
তাহলে বাজবল খেলতে অসুবিধা কোথায়? প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল প্রেস বক্সে, গ্যালারিজুড়ে, বাড়ি বসা দর্শকদের মনে। মহম্মদ সিরাজও নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে যখন উইকেট তুলতে ব্যর্থ, হাল্কা মশকরা-মাখানো স্লেজিংয়ের ছলে জো রুটের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেন: ‘বাজ… বাজ… বাজবল! কই, দেখাও দেখি!’
কিন্তু সেই ফাঁদে পা দেননি কোনও ব্যাটার। ওপেনার বেন ডাকেট, লাল বলের ক্রিকেটেও চালিয়ে খেলতে ভালোবাসেন যিনি, তিনি পর্যন্ত ঠুকে ঠুকে রান তুললেন। দিনের শেষে স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে মাত্র ২৫১! রান রেট মাত্র ৩.০২/ ওভার।
কিন্তু কেন নিজেদের চিরাচরিত খেলার ধরন, ট্রেডমার্ক রণকৌশল বদলে ফেলল ইংল্যান্ড? নেপথ্যে একাধিক কারণ দাঁড় করিয়েছেন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ।
প্রথমত, ভারতীয় বোলারদের আঁটসাঁট বোলিং। মধ্যমণি অবশ্যই জসপ্রীত বুমরাহ। সঙ্গত দিলেন মহম্মদ সিরাজ, আকাশ দীপ, নীতীশ রেড্ডি। চাপ বজায় রাখলেন ধারাবাহিকভাবে। ফাঁস আলগা হল না এতটুকু। হাত খুলে ইচ্ছেমতো স্ট্রোক প্লে—যা বাজবলের হলমার্ক—দেখল না লর্ডস। কীভাবে নিখুঁত সংযম আর নিয়ন্ত্রণে বোলিং করেছেন সিরাজরা, তার প্রমাণ দ্বিতীয় সেশন। মোট ১৫ ওভার খেলা হল। ইংল্যান্ড তুলল… বলা ভাল, তুলতে পারল ৩৩ রান। তার মধ্যে টানা ২৭ খানা ডেলিভারি ডট বল। জো রুট, অলি পোপ আগ্রাসনের বদলে খোলসে আত্মগোপন করতে বাধ্য হলেন। ১৮ ওভার বল করে বুমরাহ উইকেট না পেলেও দিলেন ৩৫ রান। আর প্রথম সারির পেসারদের মিলিত ফাঁসের চাপে হাঁসফাঁস করতে থাকা ইংরেজ ব্যাটাররা নীতীশ বল করতে এলে উৎসাহী হয়ে একটু আক্রমণে যেতেই ব্যুমেরাং! এক ওভারে দুই উইকেট টপাটপ পড়ে গেল। এরপর ভয় বাড়ল। আরও পিছু হটল ইংল্যান্ড।
দু’নম্বর কারণ ইংরেজদের বদলে ফেলা রণনীতি। ধাক্কাটা এসেছিল এজবাস্টনে। অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে আগ্রাসী হওয়াটা কাজে দেয়নি। কোচ ম্যাকালাম, বাজবলের উদগাতা পর্যন্ত মেনে নেন, তাঁরা ঘুঁটি সাজাতে, চাল দিতে কিছু ভল করেছেন। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্তই বুঝিয়ে দেয় শুধু প্রথম ইনিংস নয়, গোটা টেস্ট, প্রয়োজনে আস্ত সিরিজ ইংল্যান্ড টেস্টের প্রাচীন, চিরাচরিত ধারা মেনে খেলবে। বাজবল ‘মৃত’ বলাটা ভুল; ‘মুলতবি’ অবশ্যই।
তৃতীয়ত, লর্ডসের পিচ। আগাম আন্দাজ তৈরি হয়েছিল—উইকেট পেসারের স্বর্গোদ্যান হতে চলেছে। বুমরাহ ঘাতক হতে পারেন। এজবাস্টন, লিডসের মতো পাটা না হলেও লর্ডসের বাইশ গজে তেমন জুজু অন্তত প্রথম দিন কেউই আবিষ্কার করতে পারেননি। কিন্তু ভয় কাটিয়ে চালিয়ে খেলার আত্মবিশ্বাস বা সাহস—কোনওটাই ইংল্যান্ড দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে রান উঠেছে। উইকেটও হুড়মুড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু সবই হয়েছে ঢিমেতালে।
এই পরিস্থিতিতে বাজবল থেকে সরে আসা ভারতের পক্ষে আশীর্বাদ না অভিশাপ? সবকিছু নির্ভর করছে কালকের প্রথম সেশনের উপর। যদি জো রুট সেঞ্চুরির পর আরও প্রবলবেগে ছুটতে থাকেন, অন্যদিকে স্টোকসও অফ ফর্ম কাটিয়ে ছন্দ ফিরে পান, তাহলে ইংল্যান্ডের পক্ষে পাহাড়প্রমাণ রান খাড়া করাটা অসম্ভব কিছু নয়।
কিন্তু প্রথম সেশনই যদি আপাতত খালি হাতে থাকা বুমরাহ পরপর ঝটকা দিতে পারেন, তাহলে ইংল্যান্ডের বেসামাল হতে সময় লাগবে না। সেক্ষেত্রে বাজবল থেকে সরে আসাটা কিন্তু আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে!
অতএব সবার নজরে লর্ডসের দ্বিতীয় দিনের প্রথম কয়েক ঘণ্টা!