দ্বিতীয় ইনিংসে জাদেজা প্রায় ছয় ঘণ্টা ব্যাট করেছেন এবং ১৮১ বল অর্থাৎ ৩০ ওভার খেলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি মাঠে টেল-এন্ডারদের আগলে রেখে দলের ইনিংস এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।

লর্ডস টেস্টে জয়ী ইংল্যান্ড
শেষ আপডেট: 15 July 2025 13:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লর্ডসে অঘটন প্রায় ঘটিয়েই ফেলেছিলেন রবীন্দ্র জাদেজা। ইংল্যান্ড-ভারত চলতি টেস্ট সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে (England vs India Third Test) ১১২ রানে অষ্টম উইকেটের পতন হয়েছিল টিম ইন্ডিয়ার। এরপর জসপ্রীত বুমরাহ ও মহম্মদ সিরাজকে সঙ্গে নিয়ে জাদেজা সেই রান পৌঁছে দেন ১৭০-এ। ভারত ২২ রানে হেরে গেলেও জাড্ডুর প্রশংসায় মেতেছেন সকলেই।
তৃতীয় টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিনে ইংল্যান্ড ভারতকে ২২ রানে হারিয়ে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। পরের ম্যাচটি ২৩ জুলাই থেকে ম্যাঞ্চেস্টারে অনুষ্ঠিত হবে।
লর্ডসে ইংল্যান্ডের ১৯৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতীয় দল অলআউট হয়ে যায় ১৭০ রানে। সফরকারী দলের হয়ে রবীন্দ্র জাদেজা সর্বোচ্চ ৬১ রান করেন, ওপেনার লোকেশ রাহুল করেন ৩৯ রান। ইংল্যান্ডের হয়ে জোফরা আর্চার এবং বেন স্টোকস তিনটি করে উইকেট নেন।
দ্বিতীয় ইনিংসে জাদেজা প্রায় ছয় ঘণ্টা ব্যাট করেছেন এবং ১৮১ বল অর্থাৎ ৩০ ওভার খেলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি মাঠে টেল-এন্ডারদের আগলে রেখে দলের ইনিংস এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
জাদেজা বুমরাহকে পুল শট না খেলতে বলেছিলেন। বুমরাহ তাঁর কথা মেনে ৫৩ বল খেলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে বেন স্টোকসের একটি শর্ট বল ওড়াতে গিয়ে ক্যাচ আউট হন। এরপর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন সিরাজও। কিন্তু শোয়েব বশিরের বলে তাঁকেও বোল্ড হয়ে ফিরতে হয়।
লর্ডসে ভারতের হারের প্রধান পাঁচ কারণ:
১. যশস্বী-গিল ফ্লপ
যশস্বী জয়সওয়াল এবং শুভমান গিল প্রথম দুই টেস্টে দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছিলেন। যশস্বীকে ভবিষ্যতের তারকা বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এই টেস্টে তাঁর দুর্বল শট নির্বাচন টিম ইন্ডিয়ার পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। প্রথম ইনিংসে জোফরা আর্চারের বলে স্লিপে হ্যারি ব্রুকের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি আর্চারের বলে একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে ক্যাচ আউট হন। প্রথম ইনিংসে, যশস্বী আট বল খেলে ১৩ রান করেন, দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি সাতটি বল খেলে খাতাও খুলতে পারেননি।
অধিনায়ক শুভমান গিল এই সিরিজে ৬০০+ রান করেছেন, কিন্তু যখন দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন তাঁর ব্যাট নীরব ছিল। প্রথম ইনিংসে, তিনি ৪৪ বলে ১৬ রান করে আউট হন এবং দ্বিতীয় ইনিংসে, নয় বলে ছয় রান করে আউট হন।
২. তিন নম্বর সমস্যাটি রয়ে গিয়েছে
করুণ নায়ারের প্রত্যাবর্তনের পর তাঁকে নিয়ে অনেক আশা-ভরসা ছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রচুর রান করেছেন এবং কঠোর পরিশ্রমের ভিত্তিতে তিনি প্রত্যাবর্তন করেন। তবে, সুযোগ পেলেও তিনটি টেস্টেই ব্যর্থ তিনি। প্রথম টেস্টে যখন তাঁকে ছয় নম্বরে ব্যাট করতে বলা হয়েছিল, তখন সবাই বলেছিল যে এটি তাঁর স্বাভাবিক ব্যাটিং পজিশন নয়। এর পরে, এজবাস্টনের ফ্ল্যাট পিচে এবং লর্ডসে কঠিন পিচে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে চারটি ইনিংসেই ব্যর্থ হয়েছেন। এখনও পর্যন্ত তিনটি টেস্টের ছয় ইনিংসে নায়ারের স্কোর যথাক্রমে ০, ২০, ৩১, ২৬, ৪০ এবং ১৪। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে ভারতকে তিন নম্বরে আরও ভাল বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।
৩. টেল-এন্ডারদের দ্রুত আউট করতে না পারা
ইংল্যান্ড তাদের প্রথম ইনিংসে ২৭১ রানে সাত উইকেট হারিয়ে ফেলে। এর পরেও, ভারত দ্রুত বেন স্টোকসদের ইনিংস শেষ করতে পারেনি। জেমি স্মিথ অষ্টম উইকেটে ব্রাইডন কার্সের সঙ্গে ৮৪ রানের জুটি গড়েন। এর ফলে ইংল্যান্ড ৩৮৭ রানের স্কোর ছুঁতে সক্ষম হয়।
আসলে ভারতের কাছে এই সমস্যা নতুন নয়। এর আগেও, অনেকবারই প্রতিপক্ষ দলের টেল-এন্ডাররা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভারতের বিরুদ্ধে রান করেছেন।
৪. প্রথম ইনিংসে ঋষভ পন্থের রান আউট হওয়া
ভারতীয় অধিনায়ক শুভমান গিলের পাশাপাশি ইংলিশ অধিনায়ক বেন স্টোকসও স্বীকার করেছেন, পন্থের রান আউট একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। গিল ম্যাচের পরে বলেছেন, পন্থের আউট হওয়া বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। গিল বলেন, “প্রথম ইনিংসে স্কোর সমান হওয়ার পরিবর্তে যদি আমরা ৮০ রানের লিড পেতাম, তাহলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারত।”
প্রথম ইনিংসে পন্থ খুব ভাল ফর্মে ছিলেন, কিন্তু ৭৪ রান করে ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকসের নির্ভুল থ্রোতে তিনি রান আউট হন। সেই সময় ভারতের স্কোর ছিল তিন উইকেটে ২৪৮। সেই সময় মনে হচ্ছিল টিম ইন্ডিয়া লিড পাবে। পন্থ এবং রাহুলের মধ্যে চতুর্থ উইকেটে ১৪১ রানের জুটি ছিল। পন্থের আউটের পর, টিম ইন্ডিয়ার উইকেট নিয়মিত বিরতিতে পতন হতে থাকে এবং মাত্র ৩৮৭ রান করতে পারে।
৫. অতিরিক্ত ৬৩ রান
ভারত এই টেস্টে অতিরিক্ত ৬৩ রান দিয়েছে। টিম ইন্ডিয়া প্রথম ইনিংসে অতিরিক্ত ৩১ রান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে অতিরিক্ত ৩২ রান দেয়। যেখানে ইংল্যান্ড দিয়েছে মোট ৩০ রান, যার মধ্যে প্রথম ইনিংসে ১২ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮ রান। এই অতিরিক্ত রান ভারতের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতীয় দল প্রচুর বাই রান দিয়েছে। টিম ইন্ডিয়া ছয়বার চারটি বাই দিয়েছে। যার অর্থ ইংল্যান্ড অতিরিক্ত ২৪ রান পেয়েছে। আর সেই রানই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ম্যাচে। টিম ইন্ডিয়ার পরাজয়ের ব্যবধান ছিল ২২ রান।
৬. দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতীয় ব্যাটারদের মানসিকতা
লর্ডস টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য লোয়ার অর্ডার ব্যাটাররা ক্রিজে টিকে থাকার ক্ষেত্রে যথেষ্ট দৃড়তা দেখিয়েছেন। তবে দলের শীর্ষ ব্যাটারদের কাছ থেকে সেটা পাওয়া যায়নি। কেএল রাহুল ছাড়া কেউই মাঠে কিছুটা সময় কাটানোর এবং বল খেলার আবেগ দেখাননি। রাহুল ৫৮ বলে ৩৯ রান করেন। তিনি অবশ্যই করুণের (১৪) সঙ্গে জুটি বেঁধে স্কোর বোর্ড সচল রেখেছিলেন। কিন্তু অপরপ্রান্তে ক্রমাগত উইকেট পতন হয়তো মনোসংযোগ নষ্ট করে দিয়েছিল। এরপর তিনিও আউট হয়ে যান। জাদেজা ১৮১ বলে চারটি চার এবং একটি ছক্কার সাহায্যে অপরাজিত ৬১ রান করেন। নীতিশ ৫৩ বলে করেন ১৩ রান, বুমরাহ ৫৪ বলে পাঁচ রান ও সিরাজ ৩০ বলে চার রান করেন। তাঁদের রান হয়তো খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তাঁদের মধ্যে টিকে থাকার দৃঢ়তা ছিল।
৭. আর্চার-স্টোকসের ম্যারাথন বোলিং
ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। অধিনায়ক হিসাবে নিজের দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি ধারাবাহিকভাবে বোলিং চালিয়ে গিয়েছেন। মোট ২৪ ওভার বল করেছেন তিনি। স্টোকস রাহুল, আকাশ দীপ এবং বুমরাহর উইকেট নেন।
তবে বলতে হবে আর্চারের কথাও। তিনি যশস্বী, সুন্দর এবং পন্থকে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়েছেন। স্টোকসকে তাঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করা হয়েছে।