মুসৌরির জর্জ এভারেস্ট এস্টেটের পর্যটন প্রকল্পের টেন্ডারে অংশ নেওয়া তিন সংস্থারই মালিকানা পতঞ্জলির কর্ণধার আচার্য বালকৃষ্ণের হাতে। টেন্ডার জেতার পর থেকে চড়চড় করে বাড়ছে মুনাফা, উঠছে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন।

রামদেবের সঙ্গে বালকৃষ্ণ
শেষ আপডেট: 12 September 2025 15:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুসৌরির কাছে ঐতিহাসিক জর্জ এভারেস্ট এস্টেটে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের উন্নয়নে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে টেন্ডার ডাকে উত্তরাখণ্ড পর্যটন দফতর। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, সফল সংস্থাকে দেওয়া হবে ১৪২ একর জমি, পার্কিং, পথঘাট, হেলিপ্যাড, কাঠের পাঁচটি কুটির, ক্যাফে, দুটি জাদুঘর ও একটি মানমন্দির, সবই ইতিমধ্যেই গড়ে তুলেছিল উত্তরাখণ্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (UTDB)। এর বিনিময়ে বছরে মাত্র ১ কোটি টাকার কনসেশন ফি ধার্য করা হয়েছিল।
কিন্তু এক বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের তদন্তে উঠে এসেছে অন্য গল্প। টেন্ডারে অংশ নেওয়া তিন সংস্থারই প্রধান শেয়ারহোল্ডার একজন ব্যক্তি—পতঞ্জলি আয়ুর্বেদের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও এমডি আচার্য বালকৃষ্ণ, যিনি যোগগুরু বাবা রামদেবের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহচর।
নথি অনুযায়ী, দরপত্রে অংশ নেয় তিনটি সংস্থা, প্রকৃতি অর্গ্যানিকস ইন্ডিয়া, ভারুয়া এগ্রি সায়েন্স এবং রাজাস অ্যারোস্পোর্টস অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার্স। এর মধ্যে প্রথম দুই সংস্থার ৯৯ শতাংশেরও বেশি শেয়ার বালকৃষ্ণের হাতে। তৃতীয় সংস্থা রাজাস অ্যারোস্পোর্টসে দরপত্রের সময়ে তাঁর শেয়ার ছিল ২৫.০১ শতাংশ, আর দরপত্র পাওয়ার কয়েক মাস পরেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯.৪৩ শতাংশ।
প্রকৃতি অর্গ্যানিকস ইন্ডিয়া ও ভারুয়া অ্যাগ্রি সায়েন্স, রাজাস-এ আলাদাভাবে শেয়ার কিনে নেয়। আবার ফিট ইন্ডিয়া অর্গ্যানিক, পতঞ্জলি রেভলিউশন, ভারুয়া অ্যাগ্রো সলিউশন ও ভারুয়া সলিউশনস নামের চারটি সংস্থা, সবক’টিই বালকৃষ্ণের মালিকানাধীন, রাজাস-এ বিনিয়োগ করে। অর্থাৎ দরপত্রে প্রতিযোগিতা করার কথা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত সব সংস্থার মালিকানা গিয়েছিল একই ব্যক্তির হাতে।
টেন্ডারের শর্তে স্পষ্টভাবে বলা ছিল, প্রতিযোগী সংস্থাগুলির মধ্যে কোনওরকম আঁতাত থাকলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। তবুও রাজাসকে ২০২৩ সালের ২১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রশ্ন উঠতেই উত্তরাখণ্ড পর্যটন দফতরের অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম শাখার উপ-পরিচালক অমিত লোহানি বলেন, ‘টেন্ডার উন্মুক্ত ছিল, যে কেউ অংশ নিতে পারত। এখানে অস্বাভাবিক কিছু নেই। আমাদের হিসেবে বার্ষিক ভাড়া ১ কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছিল।’ তাঁর দাবি, এই এলাকায় বিভিন্ন পরিষেবার মাধ্যমে গত দুই বছরে ৫ কোটিরও বেশি টাকা জিএসটি রাজস্ব পেয়েছে সরকার।
তৎকালীন অ্যাডিশনাল সিইও (অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস) কর্নেল অশ্বিনি পুন্ডিরও বক্তব্য, সংস্থাগুলি স্বাধীন সত্তা, তাই আঁতাত বলা যায় না।
অন্যদিকে রাজাস অ্যারোস্পোর্টসের তরফে জানানো হয়েছে, ‘শেয়ারহোল্ডার থাকা মানেই কোনওভাবে সংস্থার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ নয়। প্রকল্প পুরোপুরি স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়াতেই বরাদ্দ হয়েছে।’
জর্জ এভারেস্ট প্রকল্পের পরিকল্পনা
১৮৩২ সালে স্থাপিত ঐতিহাসিক এস্টেটটিকে নতুন করে সাজাতে ২০১৯-২২ সালের মধ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক থেকে ২৩.৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিকাঠামো উন্নয়ন করে পর্যটন দফতর। টেন্ডারে উল্লেখ ছিল প্যারাগ্লাইডিং, বাঞ্জি জাম্পিং, রক ক্লাইম্বিং, হেলিকপ্টার অপারেশন, ক্যাম্পিং, র্যাপেলিং ও হট এয়ার বেলুনিংয়ের মতো নানা অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম চালানো যাবে।
তবে এর মধ্যেই রাজাসকে আরও কিছু প্রকল্পে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ২০২৫ সালের এপ্রিলে উত্তরাখণ্ড সিভিল অ্যাভিয়েশন সেক্রেটারি সাচিন কুরভে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA)-কে চিঠি লিখে রাজাসের চারটি এয়ার সাফারি প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।
এই প্রকল্প ঘিরে মূল প্রশ্ন উঠছে স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিয়ে। বিশেষজ্ঞ মহলের মত, একই মালিকানার একাধিক সংস্থা অংশ নিলে দরপত্রের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ হয় না। তবে সরকারি কর্তারা বরাবরই দাবি করে এসেছেন, রাজস্ব বৃদ্ধিই সরকারের আসল লক্ষ্য ছিল।