কাশ্মীরি ভাষায় পদ্মকাণ্ডকে বলা হয় ‘নাদরু’। এটি কাশ্মীরি রান্নার একটি অতিপরিচিত উপাদান। বিশেষ করে ‘নাদরু ইয়াখনি’ নামের খাবারে এর ব্যবহার প্রচলিত। একসময় বহু পরিবার এই পদ্মকাণ্ড সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করত।

৩০ বছর পর কাশ্মীরের হ্রদে ফুটল পদ্ম
শেষ আপডেট: 10 July 2025 13:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাশ্মীরের বান্দিপোরা জেলার ওয়ুলার হ্রদের ধারে অবাক চোখে তাকিয়া বসে আছেন আব্দুল রশিদ দার। সামনে যতদূর চোখ যায়, হ্রদের জলের বেশিরভাগ জুড়েই ফুটে রয়েছে সেই হারিয়ে যাওয়া ফুল (Lotus blooms in Kashmir’s Wular lake after 30 years)। ৩০ বছরের অপেক্ষা! আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বললেন, 'ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে পদ্মকাণ্ড তুলতে আসতাম এখানে। ভেবেছিলাম ঈশ্বরের উপহার (God’s Gift) আর হয়তো কোনওদিন ফিরে আসবে না।'
তিন দশক পরে কাশ্মীরের ওয়ুলার হ্রদে (Kashmir’s Wular lake) আবার ফুটেছে পদ্ম। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ স্বাদুজলের হ্রদটির বুকজুড়ে আবার দেখা মিলেছে এই গোলাপি ফুলের, যা ১৯৯২ সালের ভয়াবহ বন্যায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। যে ফুল হারিয়ে গিয়েছিল, সে আজ আবার ফিরেছে। আর তার সঙ্গে ফিরেছে একটা গোটা জনপদের আশাও।
১৯৯২ সালের বন্যার ফলে ওয়ুলার হ্রদের (Kashmir’s Wular lake) জলে বিপুল পরিমাণ পলিমাটি জমেছিল। সেই পলির নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল পদ্মের মূল গোঁড়া (Rhizome)। বীজ বেঁচে থাকলেও আলো-জল পেত না বলে সেগুলি ফুটতে পারত না।
তবে সেই স্মৃতি আজ বদলে যাচ্ছে। ২০২০ সালে ওয়ুলার কনজার্ভেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (WUCMA)-র উদ্যোগে হ্রদে পলি সরানোর কাজ শুরু হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল হ্রদ পরিষ্কার করে তার জৈববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা। সেই কাজের সুফল মিলছে এখন।
জোনাল অফিসার মুদাসির আহমেদ জানান, 'যেসব জায়গা থেকে পলি সরানো হয়েছে, সেখানেই আবার পদ্ম ফুটতে শুরু করেছে। গত বছর প্রথম কয়েকটি ফুল দেখা যায়। এবছর আমরা হ্রদের জলে পদ্মবীজও ছড়িয়ে দিয়েছি। ফুলের সংখ্যা এবার অনেক বেশি।'
কাশ্মীরি ভাষায় পদ্মকাণ্ডকে বলা হয় ‘নাদরু’। এটি কাশ্মীরি রান্নার একটি অতিপরিচিত উপাদান। বিশেষ করে ‘নাদরু ইয়াখনি’ নামের খাবারে এর ব্যবহার প্রচলিত। একসময় বহু পরিবার এই পদ্মকাণ্ড সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু পদ্ম হারিয়ে যাওয়ার পর সেই পেশাটাও বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার যখন ফুল ফুটছে, তখন পুরনো পেশাও ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন গ্রামের মানুষ।
আব্দুল রশিদ দার বলেন, 'আমার বাবা এই কাজ করতেন। গত বছর যখন কয়েকটা ফুল ফুটল, তখন কাউকে তুলতে দিইনি। মনে হয়েছিল, যদি আবার হারিয়ে যায়!'
স্থানীয়দের মতে, সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ, এই ছয়মাস কাজের সুযোগ তেমন থাকে না। সেই সময়ে পদ্মকাণ্ড সংগ্রহ হতে পারে অনেকের রোজগারের মাধ্যম। ফলে শুধু প্রাকৃতিক নয়, এই 'পুনর্জন্ম' স্থানীয়দের জন্য এক বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও।
ওয়ুলার হ্রদ প্রায় ২০০ বর্গকিমি জুড়ে বিস্তৃত। বান্দিপোরা ও সোপোর শহরের মাঝামাঝি। অতীতে ডাল ও মনাসবাল হ্রদের মতো এখানেও পদ্মে ভরে থাকত জল। কিন্তু দীর্ঘদিন তার চিহ্ন ছিল না।
পদ্মের অস্তিত্ব ফিরে এলেও ঝুঁকি এখনও কাটেনি। ঝেলম নদী ও আরও ২৫টি ছোট নদী-নালার বয়ে আনা আবর্জনা ও পলিমাটি এখনও জমছে ওয়ুলারে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭৯ লক্ষ ঘনমিটার পলি তোলা হয়েছে বলে জানান এক প্রাক্তন আধিকারিক। তিনি জানান, আরও বেশ কিছু স্থানে রিটেনশন বেসিন তৈরি করা হচ্ছে যাতে আবর্জনা হ্রদে ঢুকতে না পারে।
আজ হ্রদের জলে গোলাপি রঙের চাদরে ফের জেগে উঠেছে এক হারানো ইতিহাস। শিশুরা ছবি তোলে, প্রবীণরা সেই আগের দিনের গল্প বলেন। আব্দুল রশিদ দার বলেন, 'ভেবেছিলাম, আর কখনও এই দৃশ্য দেখব না। এখন আবার দেখে মনটাই ভরে গেল। যেন ঈশ্বরের উপহার ফিরে পেলাম।'