আমার অপরাধ, চায়ের দোকানের আড্ডায় হত-দরিদ্র মানুষগুলিকে বলেছিলাম, যে লোকটা আপনাদের কোটি কোটি টাকা চুরি করে পাটনায় প্রাসাদ বানিয়েছে, ছেলেমেয়েদের নামিদামী স্কুলে পড়ায়, রাজা-বাদশার মতো জীবন যাপন করে, আপনারা কিনা তাঁর নামে জয়ধ্বনি দেন!

শেষ আপডেট: 6 November 2025 16:56
ধাক্কাধাক্কি, চড় থাপ্পড় দিয়ে শুরু। তারপর টানতে টানতে গ্রামের ভিতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। গণপিটুনির চেনা দৃশ্যগুলি চোখের সামনে ভাসতে লাগল। একটা সময় বেশ বুঝতে পারলাম, আমার পরিণতি কী হতে চলেছে। মৃত্যু যেন সামনে এসে হাজির হয়েছে। বাঁচার কোনও উপায় দেখছি না।
তবে পরিস্থিতির বদল হল। যে চায়ের দোকানে বসে বলা কথা ঘিরে স্থানীয়রা আমার উপর চটে লাল, আমাকে পিটিয়ে মারবে বুঝতে পেরে, সেই দোকানের মালিক গিয়ে এলাকার এক নেতাকে ডেকে এনেছেন। তাঁর কথায় মুক্তি পেলাম। আমার অপরাধ, চায়ের দোকানের আড্ডায় হত-দরিদ্র মানুষগুলিকে বলেছিলাম, যে লোকটা আপনাদের কোটি কোটি টাকা চুরি করে পাটনায় (Bihar Election) প্রাসাদ বানিয়েছে, ছেলেমেয়েদের নামিদামী স্কুলে পড়ায়, রাজা-বাদশার মতো জীবন যাপন করে, আপনারা কিনা তাঁর নামে জয়ধ্বনি দেন! তাঁকে মানেন মঁসিহা!

ঘটনাটি ১৯৯৬-এর। সেবারের লোকসভা ভোট কভার করতে বিহারে গিয়েছি। লোকসভার সেই ভোটে বড় ইস্যু নরসিংহ রাও সরকারের দুর্নীতি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়েছে শেয়ার কেলেঙ্কারিতে। শেয়ার দালাল হর্ষদ মেহতা দাবি করেছেন, তিনি নিজে হাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে গিয়ে স্বয়ং নরসিংহ রাওয়ের হাতে টাকা ভর্তি অ্যাটাচি তুলে দিয়েছেন। শুধু কি শেয়ার, খাদ্য, টেলিকম, সার— কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের অপকর্মের তালিকায় আর কত কী?
ওদিকে, উল্টো ছবি বিহারে। সেখানে লালুপ্রসাদের জনতা দল সরকারের বিরুদ্ধে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির অভিযোগ প্রচারে ঝড় তুলেছে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী কেলেঙ্কারির মাথা, এই অভিযোগ তুলে আইনজীবী রবিশঙ্কর প্রসাদের জনস্বার্থ মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ জারি হয়েছে। রবিশঙ্কর পরে বিজেপির সর্ব ভারতীয় মুখপাত্র, সাংসদ এবং কেন্দ্রে মন্ত্রী হন।
পশুখাদ্য অর্থাৎ ভুষি কেলেঙ্কারিতে মূল অভিযোগ ছিল ভুয়ো বিল পেশ করে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। তছরুপের ঘটনাটি প্রথম ধরা পরে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি’র অডিটে। পরে সিবিআই জানায়, দুর্নীতির সূত্রপাত লালু প্রসাদের আগের পূর্বসুরি জগন্নাথ মিশ্রের কংগ্রেস সরকারের আমলে। লালুপ্রসাদের সময়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীই অর্থ লোপাট চক্র পরিচালনা করছিলেন।
আমি তখন দফায় দফায় পাটনা ছুটছি পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির খবর করতে। কলকাতার কাগজে এই কেলেঙ্কারি নিয়ে খবরের উৎসাহ বেড়ে যায় সিবিআইয়ের জয়েন্ট ডিরেক্টর কলকাতার বাসিন্দা তথা বেঙ্গল ক্যাডারের আইপিএস উপেন বিশ্বাস তদন্তের দায়িত্বে আসার পর। তিনি ছিলেন ঝানু গোয়েন্দা। লালুপ্রসাদকে কয়েক বার জেরা করার পর তাঁর মতো গোয়েন্দা পর্যন্ত বলেছিলেন, উনি যে কোনও গোয়েন্দাকেই ঘোল খাইয়ে দিতে পারেন। আবার উপেনই প্রথম আদালতে দাবি করেন, পালের গোদা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী।
ভুষি কেলেঙ্কারির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিডিও’দের গ্রাম সফর নিয়ে প্রচলিত গল্পের খানিক মিল আছে। বিডিও অর্থাৎ ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারদের নিয়ে একটা সময় নানা গল্প কাহিনি মুখে মুখে ঘুরত। এছাড়া খবরের কাগজে প্রায়ই বিডিও-র উপর হামলা, বিডিও-কে মারধর, বিডিও বদলির দাবি সংক্রান্ত খবর ছাপা হোত। এই কারণেই বিডিও-র ফুল ফর্ম হয়ে গিয়েছিল বড় দুঃখের অফিসার।
সেই বড় দুঃখের অফিসারদের অপকীর্তি নিয়ে একটি গল্প হলেও সত্যি জাতীয় কাহিনি মুখে মুখে ফিরত। সেটা এই রকম, জনৈক বিডিও এক গ্রাম পরিদর্শনে গিয়ে বাসিন্দাদের মুখে জলের সমস্যা শুনে বড় পুকুর কেটে দিলেন। পরবর্তী বিডিও এসে সেই পুকুরের ভাঙন আটকাতে চারধার ভাল করে বাঁধিয়ে দিলেন। এলেন তৃতীয় বিডিও। তাঁর কাছে গ্রামবাসীরা বায়না করলেন, গ্রামে নলবাহিত জলের ব্যবস্থা হয়েছে। পুকুরের জল কেউ ব্যবহার না করায় সেটার মজে গিয়েছে। এবার সেটা বুজিয়ে দিলেই ভাল হয়। বিডিও জন আর্জি মেনে সেই ব্যবস্থাই করলেন। তবে সবটাই হল খাতায় কলমে। বিডিও ও পঞ্চায়েতের বাবুরা মিলে পুকুর কাহিনি ফেঁদে লাখ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে তুলে নিয়েছেন।
বিহারের বহু আলোচিত পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির মডেলটা বাংলার 'গল্প হলেও সত্যি' কাহিনির মতো। সরকারি পশু খামারের গরু, মোষের জন্য ভুষি কেনার জন্য বরাদ্দ শত শত কোটি কোটি টাকা খাতায় কলমে কেনা ও বিতরণ হয়েছে। বাস্তবে অনাহারে মারা গিয়েছে শত শত গরু-মোষ। যে ট্রাকে করে টন টন ভুষি, বিচালি সরবরাহ করা হয়েছে বলে সরকারের কাছে জমা করা বিলে উল্লেখ করা হয় তদন্তে গাড়ির নম্বর মিলিয়ে দেখা যায় সেটি স্কুটার।
তদন্তে আরও দেখা যায়, যে খামারে হাজার গরু আছে বলে ট্রাক বোঝাই করে পশুখাদ্য পাঠানো হয়েছে সেখানে একটি পশুও অবশিষ্ট নেই। খামারগুলিতে যেন মড়ক লাগে। আসলে খামারের গরু-মোষই চুরি করে আবার সেখানেই মোটা টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল। আজ থেকে বছর তিরিশ আগে সিএজি রিপোর্টে লোপাট অঙ্কের পরিমাণ ছিল হাজার কোটি টাকা। আসলে জলের মধ্যে মাছ কখন জল খায় বোঝা দায়। সরকারি কর্তাদের দুর্নীতিও তেমন বছরের পর বছর গোপন থাকে।
সিবিআই যখন লালুপ্রসাদের একের পর এক কেলেঙ্কারি ফাঁস করছে, তিনি তখন তাঁর অনুগামীদের চোখে গরিবের মঁসিহা। শুধু স্বজাতি যাদবেরাই নয়, পিছিয়ে থাকা অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও লালুপ্রসাদের হাত ধরে নিজেদের সুদিনের অপেক্ষায় দিন গুনছে। তারা মনে করে, এই মানুষটাই পারে তাদের দারিদ্র মুক্ত করতে। রাজ্যের নব্বই ভাগ এলাকা তখন বিদ্যুৎহীন। লালুপ্রসাদ দলের প্রতীক লাল্টেন অর্থাৎ লণ্ঠন তুলে ধরে গবিরগুর্বো মানুষগুলিকে আশার আলোর দেখাচ্ছেন। সভার পর সভায় আওয়াজ উঠছে, ‘যব তক সামোসামে আলু, তব তক বিহারমে লালু।’ লালুপ্রসাদের বলা কথাই তাঁর অনুগামীরা স্লোগান বানিয়ে নেয়।
এমন আবহে ছাপরার গ্রামে গিয়ে লালুপ্রসাদকে নিয়ে আমার সেই তির্যক মন্তব্যের যা প্রতিক্রিয়া হওয়ার তাই হয়েছিল। তাছাড়া, ছাপরার সঙ্গে লালুপ্রসাদের আত্মিক যোগ রয়েছে। তাঁর জন্মস্থান গোপালগঞ্জ বৃহত্তর ছাপরার অংশ। ১৯৭৭-এ ছাপরা থেকেই লালু প্রথমবার লোকসভার সদস্য হন। তারপরও বহুবার সেখান থেকে নির্বাচনে লড়াই করেছেন। তাঁর স্বজাতি যাদবেরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।
আমি ভোটের বিহারে জনতার মন বুঝতে সেদিন এমনই এক যাদব বহুল গ্রামে ঢুকে পড়েছিলাম। বিহারের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ যাদব। অন্যদিকে, ১৭ শতাংশ মুসলিম। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে লালুপ্রসাদ মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যাদবদের নানা সুবিধা বিলিয়ে এম-ওয়াই (মুসলিম ও যাদব) ভোট ব্যাঙ্ক গড়ে নেন। মানতেই হয়, তাঁর সময়ে বিহারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নজির তেমন নেই। এমনকী ১৯৯২-এ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দেশজুড়ে দাঙ্গায় ব্যতিক্রম ছিল বিহার।
চায়ের দোকানের ভিড় সেদিন তাই সমস্বরে বলেছিল, ‘হ্যাঁ লালুপ্রসাদ টাকা খেয়েছে। তাতে অন্যায়টা কী হয়েছে? অন্য নেতারা কি সাধু!’ তাদের কারও চোখে আরজেডির প্রতিষ্ঠাতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, কারও চোখে যদু কুলপতি।
আরজেডি সুপ্রিমোর আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের ব্রাহ্মণ নেতা জগন্নাথ মিশ্র। পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি শুরু হয়েছিল তাঁরই আমলে। সেদিন গ্রামের প্রতিবাদী লালু সমর্থকদের বক্তব্য ছিল, ‘জব ব্রাহ্মণ জগন্নাথ মিশ্রা জি চারা (পশুখাদ্য) খাতে থে তব আপ পত্রকার লোগ (সাংবাদিকেরা) কুছ নহি বোলা। জব হামারা আদমি চারা খানে লাগা তব আপলোগ শোর মাচানে শুরু কর দিয়া!’
অভিযোগটা একেবারে মিথ্যা ছিল না। সিএজি জগন্নাথ মিশ্রের সময় থেকেই এই কেলেঙ্কারির রিপোর্ট দিয়ে আসছিল। মিডিয়া উচ্চবাচ্য করেনি। হইচই শুরু হয় লালুপ্রসাদ যাদব কয়েক বছর ক্ষমতায় থাকার পর। সেই মামলায় তাঁকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারাতে হয়। জেল খাটতে হয় বেশ কয়েক বছর। তারপরও বিহারের রাজনীতিতে লালুপ্রসাদের প্রভাব মুছে যায়নি। তিনি জেলের ভিতরে আর বাইরে থাকার মধ্যে যে আসমান জমিন ফারাক সাম্প্রতিক অতীতে অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর একপ্রকার ঘরবন্দি হয়ে গেলেও শুধু দল নন, এখনও বিহারের রাজনীতির শেষ কথা লালুপ্রসাদ যাদব।
সিঙাড়ায় আলু আর রাজনীতিতে লালু, স্রেফ কথার কথা নয়।