দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘চা কেমন খেলে? ফেরার সময় রেসিপি নিয়ে এসো?’ পাক সেনাদের হাতে বন্দি অভিনন্দনের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী তানভি মারওয়ার কথোপকথন শুরু হয়েছিল ঠিক এমন ভাবেই। চোখ মুখে জমাট বাঁধা রক্ত, তাও দৃপ্ত মুখ। আশঙ্কা আর যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে গেলেও সংযম আর ধৈর্যের সবটুকু ধরে রেখে স্বামীর কুশল প্রশ্ন সে দিন করেননি তানভি। প্রাক্তন বায়ুসেনার অফিসার তানভি বুঝেছিলেন হাতের চায়ের কাপ নিয়ে তৈরি ভিডিও এবং ফোনে স্বামীর বলা প্রতিটা কথা শত্রু সেনাদের শেখানো বুলি মাত্র। এর পিছনে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নিয়ন্ত্রণরেখায় পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে পাক সীমায় ঢোকার পর ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কম্যান্ডার অভিনন্দন বর্তমান যখন পাক সেনাদের হাতে আটক হন, তারপর প্রতিটা মুহূর্ত আসন্ন দুর্যোগের আশঙ্কায় কেটেছে তানভির। তিনিও একসময় ছিলেন বায়ুসেনায়, সুতরাং জানতেন শত্রু ঘাঁটিতে বিশেষত পাকিস্তানের শিবিরে বন্দি হওয়ার পরিণাম কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। তাও ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের উপর বিশ্বাস রেখে, স্বামীর ফিরে আসার একটা ক্ষীণ আশা রেখেছিলেন তিনি।
বন্দি হওয়ার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর ওয়াঘা সীমান্ত পেরিয়ে অভিনন্দন ফিরে এসে পাক সেনাদের দুরভিসন্ধি এবং তাঁর উপর হওয়া অত্যাচারের প্রতিটা মুহূর্ত ব্যাখ্যা করেন। তার মধ্যে ছিল স্ত্রীয়ের সঙ্গে কথা বলার সেই বিশেষ সময়টুকুও। কী হয়েছিল সেই কয়েক মিনিটে?
পাকিস্তানের পোস্ট করা প্রথম ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল অভিনন্দনের চোখ-মুখে রক্তের ধারা, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, পাক সেনাদের ঘেরাটোপে মাথা উঁচু করে চলেছেন বায়ুসেনার এই তেজী জওয়ান। ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও নিয়ে বিশ্ব জুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলে, পাকিস্তানের তরফে দ্বিতীয় একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে দেখানো হয় হাতে চায়ের কাপ নিয়ে সোফায় বসে রয়েছেন অভিনন্দন। আদতে বলার চেষ্টা হয়, যুদ্ধবন্দির সঙ্গে শালীনতা ও সৌজন্যবোধ বজায় রেখেই আচরণ করছে পাক সেনারা। তবে সেটা ছিল পর্দার একপিঠ, অপর পিঠে ঘটে গিয়েছিল আরও কিছু ঘটনা।
অভিনন্দনের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, প্রথমে তাঁর হাত খুলে রক্ত মুছিয়ে দেওয়া হয়। তারপর সজোরে পাঁজরে কিল মারতে থাকেন সেনারা। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও সংযম ধরে রাখেন৷ হাতে চায়ের কাপ দিয়ে তাঁকে বলা হয় স্ত্রীয়ের সঙ্গে কথা বলতে। সম্ভাব্য কী প্রশ্ন ফোনের ও পার থেকে আসতে পারে এবং তার উত্তর কী হবে সবটাই পাখি পড়ার মতো শিখিয়ে দেওয়া হয় বায়ুসেনার এই অফিসারকে।
‘‘স্ক্রিনে কয়েকটা অচেনা নম্বর ও পরে অভিনন্দনের গলা পেয়েই মনের জমাট বাঁধা বরফ গলতে থাকে,’’ জানিয়েছেন তানভি। তবে আনন্দের জোয়ারে ভেসে না গিয়ে প্রাক্তন বায়ুসেনার এই অফিসার লক্ষ্য করেন নম্বরটা সৌদি আরবের। অর্থাৎ এই ফোন কল, পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের একটা চালমাত্র। সতর্ক হয়ে যান তানভি। গড়পড়তা প্রশ্নের ধারই ধারেননি তিনি। উল্টে প্রশ্ন করেন, ‘‘ছেলেকে কী বলবো, তুমি কোথায় আছো,’’ অভিনন্দনের ঝটিতি জবাব আসে, ‘‘ছেলেকে বোলো তার বাবা পাকিস্তানের জেলে রয়েছে।’’
এমন উত্তর আশা করেননি তানভি, বুঝে যান সবটাই শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে অভিনন্দনকে। তাই পরের প্রশ্নগুলিতে তিনিও মজা করা শুরু করেন। জিজ্ঞেস করেন, ‘‘চা কেমন বানিয়েছে? আমার থেকেও ভালো বানিয়েছে কি? ফেরার সময় চায়ের রেসিপি নিয়ে এসো।’’ এই প্রশ্নগুলির মধ্যেই ইঙ্গিত ছিল অভিনন্দনের ফিরে আসার। পরোক্ষে বুদ্ধিমান তানভি যেন স্বামীকে জানিয়ে দিলেন তাঁর ফিরে আসার সব ব্যবস্থাই হচ্ছে। তিনি যেন নিশ্চিন্তে থাকেন এবং ধৈর্য ধরে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন।
তবে অত্যাচারের ইতি এখানেই হয়নি। অভিনন্দন জানিয়েছেন, বন্দি হওয়ার পরে তাঁকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তাঁর কাছেই প্রচণ্ড জোরে চালিয়ে দেওয়া হয় মিউজিক। তবে অভিনন্দনের কাছ থেকে কোনও তথ্যই বার করতে পারেনি পাক সেনারা। ভারতীয় পাইলটদের শেখানো হয়, ধরা পড়লে যত বেশি সম্ভব সময় ধরে চুপ করে থাকতে হবে। শত্রু যেন সহজে কোনও গোপন তথ্য না জানতে পারে। বন্দি যদি বেশিক্ষণ নিজেদের তথ্য গোপন রাখতে পারে ততক্ষণে তার সেনাবাহিনী সতর্ক হয়ে যাবে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি, বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দ পালটে ফেলবে। সেনা অবস্থানও বদলে যাবে। তাহলে শত্রু যদি বন্দিকে জেরা করে কিছু জানতেও পারে, লাভ হবে না। অভিনন্দনকে হয়তো সেই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী তানভি।