
শেষ আপডেট: 14 August 2023 10:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৯৪ সাল। গোয়ার রাজধানী পানাজি থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে শিরোদায় থাকতেন ২১ বছরের দর্শনা নায়েক। বাবা-মা খেতের কাজে বেরিয়ে যেতেন সকাল হতে না হতেই। সারাদিন বাড়িতে একাই থাকতেন দর্শনা। দিনটা ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর। দিনভর খাটাখাটনি সেরে বাবা-মা বাড়ি ফিরে দেখলেন, ঘরের মেয়ে ঘরে নেই। বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর ব্যাম্বোলিমে একটি কাজুবাদাম গাছ থেকে তাঁরই ওড়না দিয়ে গলায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় দর্শনার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় (serial killing)।
এর থেকে ঠিক ২ মাস পিছিয়ে যেতে হবে। আরও একটি খুন। আরও এক তরুণী। বস্তুত সেটাই ছিল মহানন্দ নায়েকের প্রথম 'শিকার'। ৩০ বছরের গুলাবি গাওঁকর খান্ডে-পার এলাকার পোণ্ডা বাজারের কাছে একটি দর্জির দোকানে কাজ করতেন। পাশেই ছিল অটো স্ট্যান্ড। সেখানেই অটো চালক হিসেবে কাজ করত মহানন্দ (Mahananda Naik)। তার বিষ-দৃষ্টি পড়েছিল গুলাবির উপর। খুনের একদিন পর যখন গুলাবির ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ, তখন একজন সাক্ষী জানান, দাড়িওয়ালা এক যুবকের সঙ্গে প্রায়ই দেখা যাচ্ছিল গুলাবিকে। ছানবিন করতে করতে পুলিশ পৌঁছে যায় মহানন্দ পর্যন্ত। তাকে আটক করে হেফাজতেও নেয় পুলিশ। কিন্তু তার সহকর্মী অটোচালকরা পুলিশকে জানান, ঘটনার দিন অটোস্ট্যান্ডেই ছিল মহানন্দ। তাঁদের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করেই মহানন্দকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। আসলে ওই অটো চালকরা কেউ জানতেনও না, দুপুর বেলা তাঁরা যখন ঘুমাচ্ছিলেন, সেইটুকু সময়ের মধ্যেই কাজ হাসিল করে নিয়েছিল 'শিকারী' মহানন্দ নায়েক (Goa serial killer)।
ভারতের সিরিয়াল কিলিং-এর ইতিহাসে কুখ্যাততম খুনিদের তালিকায় বেশ উপরের দিকেই নাম থাকবে মহানন্দের। ১৯৯৪ সালে গুলাবিকে দিয়ে শুরু, তারপর একের পর এক মেয়েকে খুন করেই গেছে সে। শেষ খুনটা করেছিল ২০০৯ সালে। টানা ১৫ বছর ধরে তার বিকৃত লালসা এবং লোভের শিকার হয়েছিলেন ১৬ জন তরুণী। তার টার্গেট ছিল ২০-৩৫ বছর বয়সি অত্যন্ত গরীব ঘরের তরুণীরা। বাসস্ট্যান্ড, বাজার, কারখানা, সমস্ত জায়গা থেকে মানসিকভাবে দুর্বল এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের খুঁজে খুঁজে বের করত সে। তারপর তাদের প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে খুন করত।
গুলাবি এবং দর্শনার পর তার হাতে খুন হয়েছিলেন বাসন্তী গৌড়ে নামে ১৯ বছরের একজন তরুণী। তিনি গৃহ সহায়িকা হিসেবে কাজ করতেন লোকের বাড়িতে। ১৯৯৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৫০ হাজার টাকা বাসন্তীকে দেওয়ার নাম করে শান্তিনগর এলাকার একটি নির্জন জায়গায় তাঁকে ডেকে এনে খুন করে মহানন্দ। বাসন্তীর মৃতদেহের হদিশটুকুও পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত, এতটাই 'নিপুণ' খুনি ছিল মহানন্দ।
২০০৯ সালের ২১ এপ্রিল পুলিশের জালে ধরা পড়ে কুখ্যাত এই খুনি। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, 'শিকার'দের কাছে মহানন্দ নিজেকে ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিত। এমনকী, তরুণীদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের নাম অবধি পাল্টে ফেলত সে। গুলাবির কাছে তার পরিচয় ছিল গোবিন্দ। আবার যোগিতার বেলায় সে হয়ে গিয়েছিল যোগেশ। কিছু কিছু তরুণীকে সে বলত, তার বাবা তাঁদের পুত্রবধূ হিসেবে পছন্দ করেছেন। এই কথাতেই গলে গিয়ে তার প্রেমে পড়ে যেতেন অনেকেই। তার শুধু একটাই শর্ত ছিল। যতদিন না তার বাবা এবং বোনের সঙ্গে প্রেমিকার আলাপ হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত এই সম্পর্কের ব্যাপারে মুখ খোলা যাবে না। তার কথা মতো তাই করতেন হতভাগ্য তরুণীরা। তারপর একদিন আসত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই 'শুভ'দিনে বাবা আর বোনের সঙ্গে দেখা করার কথা ঠিক হত। প্রেমিকাকে সেদিন সবচেয়ে দামি গয়না, পোশাক পরে সেজেগুজে দেখা করতে বলত মহানন্দ। যাঁরা তার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আসন্ন বিয়ের আনন্দে দেখা করতে চলে যেতেন, তাঁরা কেউই আর বেঁচে ফিরতেন না। গয়না এবং সম্মান তো যেতই, খোয়াতে হত প্রাণটুকুও (Goa serial killer)।
গুলাবির ক্ষেত্রে পাথর মেরে তাঁকে খুন করেছিল মহানন্দ। তবে পরেরবার থেকে স্টাইল বদলে ফেলে সে। দর্শনা থেকে শুরু করে সর্বশেষ শিকার যোগিতা পর্যন্ত ১৫ জনকে তাঁদেরই ওড়নার ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করত সে। আর তা থেকেই 'দুপাট্টা খুনি' (dupatta killer) হিসেবে পরিচিত হয়েছিল সে।
পানাজি থেকে ৪০কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে শিরোডা, পোণ্ডা, বিচোলিম, মারগাঁও, কুইপেম-সমস্ত জায়গায় মহানন্দের হাড়হিম করা কীর্তির চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল। প্রত্যেকটা খুন করার পরেই আগে মৃতদেহ থেকে গয়না খুলে নিত সে। তারপর পরিবারে কারও অসুস্থতার দোহাই দিয়ে বিক্রি করে দিত সেই গয়না। তার পদচিহ্ন ছড়িয়েছিল সর্বত্রই। সেই সব ছড়িয়ে থাকা সূত্রকে একযোগে আনলে পুলিশ হয়তো আরও আগেই ধরে ফেলত তাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মহানন্দর 'ভিকটিম'রা প্রত্যেকেই এতটাই গরীব ছিল যে তারা ভাল উকিল পর্যন্ত যোগাড় করতে পারত না। ফলে শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যেত মামলা।
শেষ খুনটা সে করেছিল ২০০৯ সালে। সেই বছরের জানুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ আচমকাই নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন ৩০ বছরের যোগিতা নায়েক। তাঁর সঙ্গেই গায়েব হয়ে গিয়েছিল ৮০ হাজার টাকার গয়না। ১৫ জানুয়ারি ঠিক দর্শনার মতোই কাজু গাছের ডাল থেকে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাও হয়তো ধামাচাপা পড়ে যেত। কিন্তু যোগিতার পরিবারের লোকজন পোণ্ডা থানায় আসা নতুন ইন্সপেক্টর চেতন পাতিলের কাছে মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে দরবার করেন। চেতন এই হত্যারহস্যের তদন্ত নেমে প্রথমেই যোগিতার মোবাইলের কল রেকর্ড খতিয়ে দেখে। তাতে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে শেষ যে দুজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল যোগিতার, তাদের মধ্যে একটি নম্বর গোয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এক পড়ুয়ার, যে নিজের মোবাইল হারিয়ে ফেলেছিল। এরপর চেতন সেই হারিয়ে যাওয়া সিম কার্ডের সমস্ত কল ডিটেলস খতিয়ে দেখেন। তাতেই জানা যায়, নম্বরটি তখনও চালু রয়েছে এবং ২৩ বছরের এক তরুণীর কাছে সেই নম্বর থেকে প্রায়ই ফোন যায় (Serial murderer)।
পুলিশ সেই তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে, তরুণী নিজে ধর্ষিতা হয়েছিলেন। এবং ওই নম্বরটি থেকে যে তাঁর সঙ্গে কথা বলত সে আর কেউ নয়, মহানন্দ। এই ঘটনার পরেই চেতন মহানন্দকে আটক করে জেরা করতে শুরু করেন। সেখানে অসঙ্গতি মিলতেই ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেফতার করা হয় তাকে। জানা যায়, গত ১৫ বছরে অন্তত ১৬ জন মহিলাকে যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণ করে খুন করেছে সে। আরও জানা যায়, ধরা পড়ার আগে গত চার বছর ধরে তারই এক বন্ধুর স্ত্রীকে নিগ্রহ এবং ব্ল্যাকমেল করে আসছিল সে। ২৩ বছরের ওই তরুণীও তার শিকার হতে চলেছিলেন। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি (Dupatta Killer)।
সেই ২৫ বছর বয়স থেকে শুরু। মহানন্দের বর্তমান বয়স ৫৪ বছর। গত ১৪ বছর ধরে জেলেই জীবন কাটাচ্ছে সে। যোগিতা হত্যা-রহস্যের কিনারা হওয়ার পরেই উন্মত্ত জনতা তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। সেই ঘটনার পর তার স্ত্রী, যিনি একজন কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারী, তাঁকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। এখনও পর্যন্ত তার দ্বারা হওয়া দুটি হত্যাকাণ্ড আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। অন্যান্য মামলাগুলির শুনানি চলছে এখনও। ২০১১ সালের জুলাই মাসে ওই দুটি মামলার প্রেক্ষিতে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। এখন গরাদের পিছনের অন্ধকারই মহানন্দর জীবন। বাকি খুনের মামলাগুলিতেও দোষী প্রমাণিত হলে হয়তো তাকে মৃত্যুদন্ডেরও সাজা দেওয়া হতে পারে। তবে যাই হোক না কেন, ভারতের সিরিয়াল কিলিং-এর ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত খুনি হিসেবে নাম রয়ে যাবে মহানন্দ নায়েকের।
শ্রীদেবী চলে গেছেন, বনির সঙ্গে তাঁর প্রেম আজও চর্চায়! দেখুন তাঁদের অদেখা ছবি