কেয়া শেঠ
একটা গল্প আমরা ছোটবেলায় অনেকেই শুনেছি, হয়তো বড়বেলাতেও। সেই গল্পটাই আজ আর একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক আগে। তার পরে না হয় আসছি আন্দর-বাসের সুন্দর কথায়।
এক ভদ্রলোককে মারা যাওয়ার পরে নরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নরক নিয়ে আগে অনেক কথাই শুনেছিলেন ছিলেন। কেউ বলেছিল সেখানে গরম তেলে ঝলসানো হয়, কেউ বলেছিল সেখানে খুব মারধর করা হয়। মানুষের হাহাকার আর থামে না। তো তিনি গেলেন খুব ভয়ে ভয়ে নরকে। দেখলেন, শোনা কথা খানিকটা মিলে যাচ্ছে। শয়ে শয়ে মানুষ হাহাকার করছেন, আর্তনাদ করছেন। অসহায় ভাবে ধুঁকছে অনেকে। কিন্তু কোথায় গরম তেল, কোথায় বা মারধর। বরং অসংখ্য ভালমন্দ খাবার সাজানো বড়-বড় পাত্রে! আর মানুষগুলোর হাতে একটা করে চামচ বাঁধা। কিন্তু কেউ খেতে পারছেন না, না খেতে পেয়ে রেগে যাচ্ছেন, চিৎকার করছেন। হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে যাচ্ছেন অনেকে। কেন? কারণ সকলের হাতে যে চামচ বাঁধা রয়েছে, সেই চামচগুলো এতই বড়, যে কেউই সেটা নিজের মুখে পৌঁছতে পারছেন না। যতবার খাবার তুলে খেতে যাচ্ছেন, খাবার পড়ে যাচ্ছে। চামচের কোনও অংশ ধরলেই সেটা মুখে আসছে না।
সত্যিই তো, সামনে এত খাবার সাজানো, অথচ কেউ কিছু খেতে পারছেন না। এর চেয়ে বেশি নরকযন্ত্রণা আর কী হয়? উনি খুব করে অনুরোধ করলেন, স্বর্গও একবার দেখবেন। নরক নিয়ে ভুল ধারণা যেমন ভাঙল, স্বর্গ নিয়েও কি তেমনই কোনও ভুল ভাঙতে পারে? শুনেছেন অপ্সরারা নাচে-গানে ভরিয়ে রাখে স্বর্গ। সেখানকার বাসিন্দাদের আমোদের শেষ নেই।
অনুরোধ শুনেই হোক আর যে কারণেই হোক, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল স্বর্গে। কী আশ্চর্য! নরকের সঙ্গে স্বর্গের কোনও ফারাকই নেই! সেই একই টেবিল, একই পাত্র, একই রকম ভাল ভাল খাবার! সেখানেও শয়ে শয়ে মানুষ, কিন্তু সকলে হাসছেন। অপ্সরাদের কী দরকার, নিজেরাই নাচে-গানে ভরিয়ে রেখেছেন মানুষগুলো। কারও মুখে কোনও দুঃখ নেই, ক্ষোভ নেই। অথচ সকলের হাতে সেই একই রকম বড় বড় চামচ। তবু সকলে পরিতৃপ্ত মুখে হাসছেন। কী অবাক কাণ্ড!
খুঁটিয়ে দেখলেন তিনি। অবাক হওয়ার কোনও ব্যাপারই নয় আসলে। এখানে সকলেই হাতে বড় বড় চামচে খাবার তুলে, দূরের কোনও অন্য মানুষকে খাইয়ে দিচ্ছেন। নিজে খাওয়ার চেষ্টা করছেন না কেউ। ফলে সহজেই পেট ভরছে সকলের। সকলের মুখে তৃপ্তি, হাসি। কোনও দুঃখ নেই, কোনও না-পাওয়া নেই। স্বর্গ তো এমনই হওয়ার কথা! অথচ নরকের সঙ্গে তফাত কত ছোট! নিজের বদলে অন্যকে খাওয়ানোই বদলে দিয়েছে সবটা।
গল্পটা বেশিরভাগ পাঠকেরই জানা। কিন্তু আপনারা কি জানেন, এই গল্পটাই আমাদের এই কঠিন সময়ের মন্ত্র হতে পারে? এটা এমন একটা সময়, যেখানে আমি একা যতই সাবধানে থাকি, ভাল থাকি, নিয়ম মেনে থাকি, আমার পাশের মানুষটাকে বা আশপাশের মানুষগুলোকে তেমনটা রাখতে না পারলে, আমার কোনও ভাবেই ভাল থাকা হবে না। শুধু নিজেকে নিয়ে ভাল থাকা যাবে না এখন, নিজেকে ভাল রাখতে হলে, পাশের মানুষটির দিকেও সমান খেয়াল রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, করোনামুক্ত পৃথিবী তৈরি করতে না পারলে, করোনা থেকে একা বাঁচা মুশকিল।
ঘরে থাকার সাত দিন হয়ে গেল প্রায়। ঘরের আনাচকানাচের খবর জানা হয়েছে আপনার। ঘরের মানুষকে হয়তো নতুন করে আবিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এই দুঃসময়ে সমস্ত ব্যাপারে আপনারা পরস্পরের সহকারী হয়ে উঠছেন তো? দুশ্চিন্তার পাশাপাশি কাজগুলোও বণ্টন করে নিচ্ছেন তো? নইলে কিন্তু এই অন্দর-বাসের একটা বড় ইতিবাচক দিক এবং ভাল থাকার চাবিকাঠি আপনি হারিয়ে ফেলবেন।
যার যতটুকু করার ক্ষমতা, ততটুকু করার চেষ্টা করুন সকলে। যিনি রান্না ভাল পারেন না, তিনি কুটনোটা হয়তো ভাল কুটতে পারেন, তাই করুন। আবার কুটনো না পারলে একটু ধোয়াধুয়ি করে দিন। এত কিছুও নয়, হয়তো চা খেয়ে কাপটা বেসিনে রাখছেন, তার আগে একবার ভাবুন, অন্য কাউকে এই কাজটা করতে হবে। এটা ভেবে ধুয়ে ফেলুন চট করে। এতে আপনারও একটু কাজ করা হবে, আপনার বাড়ির মানুষটিরও কাজ হাল্কা হবে। এতে করে দেখবেন, বাড়ির পরিবেশ কত ভাল হয়ে যাবে একলহমায়। ঘরবন্দি জীবনে এই কাজের সমবণ্টন খুব দরকার।
আমরা যেমন ভাবছি, এই খারাপ সময়ে ডাক্তার-নার্সরা অসুস্থ হলে কী বিপদ হবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার, তেমনই বাড়ির মানুষটিও যদি কাজের চাপে শারীরিক বা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে আপনি ভাবতেও পারছেন না, গোটা সংসার-ব্যবস্থারও কতটা বিপদ হবে!
শুধু কি তাই? ছোটদের উপর এই ঘরবন্দি জীবন যে কী প্রভাব ফেলছে, তা হয়তো আমরা এখনও আন্দাজও করতে পারছি না। তারা তো ছোট, তারা বোঝে না। তাদের স্কুল নেই, বন্ধু নেই, মাঠ নেই। চারদেওয়ালের ভিতরে একই মানুষের মুখ দেখছে তারা। ফলে এসময়ে তারা ঘ্যানঘ্যান করতে পারে, খিটখিটে হয়ে যেতে পারে। তাকে চিয়ার করার দায়িত্ব নিন সবাই মিলে। ভাগ করে নিন আনন্দগুলো, আনন্দের উপাগুলো।
রান্নাঘরে ফিরিয়ে আনুন মজা। দোকানপাট তেমন করে হচ্ছে না, অনেক জিনিসই ফুরোচ্ছে। দেখুন তো ডাল ভিজিয়ে ফেলে, সকালে উঠে বেটে নিয়ে বড়ি দেওয়া যায় কিনা? বড়ি হয়তো হবে না, বড়াই হবে। কিন্তু আনন্দ কি কম হবে, নিজের হাতে বানানো সেই বড়ির তরকারি খেতে?
শুধু নিজের ঘরে নয়, আশপাশের মানুষগুলোরও খবর রাখতে হবে। কোনও বয়স্ক মানুষের খাবার সমস্যা হচ্ছে কিনা, কারও ওষুধ পেতে অসুবিধা হচ্ছে কিনা, খবর নিন কমিউনিটি তৈরি করে। এখন অনলাইন কানেকশনেই খুব সহজেই করা যায় এই কাজ। যদি মনে হয় কেউ ভাল নেই, অসুবিধায় পড়েছেন, তাঁর পাশে থাকুন সাধ্যমতো। প্রশাসনকে জানান প্রয়োজনে।
আর আপনার বাড়ির বাইরেই বাস করা না-মানুষগুলোকে খেতে দিন। বারান্দায় রাখুন জল-খাবার। পাখিরাও ভাল থাকুক তাদের মুক্ত জীবনে।
আপনার এই ছোট্ট পদক্ষেপগুলোই করোনামুক্ত পৃথিবীর দিকে দিকে আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।