
শেষ আপডেট: 23 July 2018 12:49
'চিকিৎসক' রাজকুমার বাসফোঁড়।[/caption]
উচ্চমাধ্যমিকে পাশ করতে পারেননি তিনি, অকপটে জানান রাজকুমার বাসফোঁড়। যশোডাঙাতে সাফাইকর্মী হিসেবে কাজ করবার সময় এক জন চিকিৎসকের সান্নিধ্যে 'এই সমস্ত কাজ' শিখেছেন তিনি। এখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডক্টর নেই, অথচ মানুষের অসুখবিসুখ তো তা মানে না। তাই তিনিই রোগীর রোগ সমস্যা শুনে নামধাম লেখা থেকে ড্রেসিং করা বা ক্ষতের সেলাই করা ইত্যাদি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য, “সকালে এসে নিজের কাজ (হাসপাতাল সাফসুতরো করা) শেষ করে টেবিলে এসে বসি। রোগীরা আসেন। এই কাজ শুরু করি।”
কী বলছেন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কম্পাউন্ডার বা ফার্মাসিস্ট বিজয় বিশ্বাস? তাঁর বয়ান, "এক জন চিকিৎসক ছিলেন, তিনি উচ্চশিক্ষায় বাইরে গেছেন। তিনি ছাড়া এক জন হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক আছেন। কিন্তু অন্য কোনো আলোপ্যাথি ডক্টর নেই। তাই এভাবেই চলছে। আমরা প্রেসক্রিপশন দিতে পারি না। জ্বর-পেটব্যথা এ সবের ওষুধ দিয়ে দিই। ওষুধ না দিয়ে রোগীদের ফেরাব কি ভাবে?”— পাল্টা প্রশ্ন তাঁর। কিন্তু সূত্র বলছে, সামান্য জ্বরজারি ছাড়াও অন্যান্য রোগের জীবনদায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধও দেওয়া হয় এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্টাফ নার্স প্রভা লামা জানান, উপরমহলে আমরা এই অবস্থা জানিয়েছি। তাঁরা বলেছেন ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই, তাই এই অবস্থাই চলছে, জানিয়েছেন তিনি। নইলে অসুখে ভোগা ছাড়া অন্য উপায় নেই স্থানীয়দের। নেই কোনও বিকল্প।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রহ্লাদ বিশ্বাস, জীবন দেবনাথরা জানান, আশপাশে ছ’টি চা বাগান ছাড়াও রয়েছে কয়েকটি কৃষিপ্রধান জনপদ। কয়েক হাজার মানুষ চিকিৎসা পরিষেবার জন্য এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল। তাঁদের বক্তব্য, “ওষুধ তো পাচ্ছি, সেরেও যাচ্ছি। কিন্তু কোনো কাগজ (প্রেসক্রিপশন) পাচ্ছি না। তাই বাড়ি গিয়ে মাঝেমাঝে গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।”
ওবিসি মোর্চার সদস্য কর্মীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে গিয়ে সাফাইকর্মীর চিকিৎসা পরিষেবা দান দেখে হতবাক হয়ে পড়েন। সংস্থার তরফে শ্যামল নাথ জানান, এখানে যা চলছে তা ভাবা যায় না। “এভাবে রোগীদের জীবন বাজি রাখা দেখে ভাষা হারিয়েছি। অবিলম্বে এই ব্যাপারে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের হস্তক্ষেপ চাইছি।”—বলেন তিনি।
[caption id="attachment_21150" align="aligncenter" width="1152"]
রোগীর সমস্যা খাতায় লিখে নিচ্ছেন মন দিয়ে।[/caption]
কিন্তু এ সব জেনেও এক রকম ‘অপারগ’ রাজকুমার। বললেন, “আমি জানি, আমি পড়াশোনা জানি না, চিকিৎসক নই। কিন্তু তবু চেষ্টা করি। নইলে এত মানুষই বা যাবেন কোথায়! এমন তো নয়, আমি কোনও চিকিৎসকের বদলে কাজ করছি। আমার কাছেও নিরূপায় হয়েই আসছেন মানুষ। আমিও নিরূপায় বলেই ফেরাতে পারছি না।”
এটাই অন্যতম এক ছবি এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার। পরিকাঠামো থাকলেও পরিষেবা নেই। দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত প্রান্তে হাতুড়ে ডাক্তারদের কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা কম হয়নি এযাবৎ। কিন্তু এটাও ভেবে দেখার বিষয়, যে সরকার যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়েজনীয় শর্ত হিসেবে এক জন চিকিৎসক জোগান দিতে পারছে না, সেখানকার মানুষগুলি কী করবেন। কোথায় যাবেন অসুখ করলে। সেখানে কোনও কিছুই না পাওয়ার চেয়ে ন্যূনতম চিকিৎসাটুকু অপ্রশিক্ষিত কেউ দিলে সেটুকুই মেনে নেওয়া যায় কি না, এ নিয়ে তর্ক রয়েছে গভীর এবং বিস্তৃত।
চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরী অবশ্য বলছেন, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমনটা কোনও ভাবেই মানা যায় না। যেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, সেখানে কোনও মানুষ দায়িত্ব নিয়েছেন সেটা যদি বা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকার পরেও সেখানে চিকিৎসক নেই, এটা ভীষণ বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তাঁর কথায়, “যেখানে আলো নেই সেখানে মোমবাতি হয়ে জ্বলেন কেউ কেউ। কিন্তু যেখানে আলো থাকার কথা, সেখানে সরকার বাধ্য আলো জ্বালাতে। এই অবস্থায় রাজকুমারের মতে মানুষদের চেষ্টাকে ছোট করার অবকাশ থাকে না এটা ঠিক। কিন্তু সেই সঙ্গে এই সমালোচনাও ভীষণ ভাবে জরুরি, এক জন অপ্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর উপরে কী ভাবে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্ব হতে পারে!”
বস্তুত, রাজকুমার আইনত অপরাধ করলেও, একটা বড় সংখ্যার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এ ‘অপরাধ’ জরুরি। আবার তার থেকেও বেশি জরুরি, এই ‘অপরাধ’ দিনের পর দিন করে যেতে বাধ্য কেন হচ্ছেন রাজকুমার। কেনই বা বিকল্প সুব্যবস্থা আনছে না প্রশাসন।
দেখে নিন রাজকুমারের বক্তব্য।
https://www.youtube.com/watch?v=VSUVsRt7noY&feature=youtu.be