
শেষ আপডেট: 22 November 2019 11:41
২০১৬-র ভোটে কালিয়াগঞ্জে বাম-কংগ্রেস জোটপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রমথনাথ রায়। কয়েক মাস আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাই উপনির্বাচন হচ্ছে রায়গঞ্জ লোকসভা আসনের অন্তর্গত এই বিধানসভায়।
লোকসভা ভোটে জোট না হলেও এবার তিন উপনির্বাচনে জোট বেঁধেই ভোট লড়ছে বাম-কংগ্রেস। কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রয়াত প্রমথনাথবাবুর মেয়ে ধীতশ্রী রায়। রাজনীতিতে নবাগতা ধীতশ্রী। প্রমনাথ রায়ের মৃত্যুর পরই জাতীয় কংগ্রেসের তরফে বলা হয়েছিল, উপনির্বাচনে প্রয়াত বিধায়কের মেয়েকেই প্রার্থী করবে তারা। আর হয়েছেও তাই। অনেকের মতে, সহানুভূতির ভোটের জন্যই তাঁকে দাঁড় করিয়েছে কংগ্রেস।
তৃণমূল এখানে প্রার্থী করেছে তপনদেব রায়কে। তপনবাবু দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা। একইসঙ্গে কালিয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাধিপতি। ফলে, হাতের তালুর মতো এলাকা চেনেন তিনি। পঞ্চায়েতের কাজের জন্যই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও নিয়মিত। তাই প্রচারের ক্ষেত্রে জনসংযোগে প্রার্থী পরিচিতর জন্য বিশেষ সময় নষ্ট করতে হচ্ছে না বাংলার শাসকদলকে।
কালিয়াগঞ্জে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কমল সরকার। আরএসএস থেকে উঠে আসা এই নেতা উত্তর দিনাজপুর জেলাপরিষদের একমাত্র বিজেপি সদস্য। অনেকের মতে, পঞ্চায়েত ভোটে অত গন্ডগোলের মাঝেও কমলবাবুর জয় বুঝিয়ে দিয়েছিল কালিয়াগঞ্জে বাড়ছে গেরুয়া প্রভাব।
১৬-র বিধানসভায় কংগ্রেস জিতলেও গত লোকসভা ভোটে কার্যত খুঁজে পাওয়া যায়নি বাম-কংগ্রেসকে। সবাইকে পিছনে ফেলে উল্কাগতিতে কালিয়াগঞ্জে নিজেদের উত্থান ঘটিয়েছে বিজেপি। লোকসভার নিরিখে তৃণমূল আর বিজেপির ভোটের ফারাকটাও পাহাড় প্রমাণ। দেখা যাচ্ছে, রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে থাকা এই বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের থেকে প্রায় ৫৬ হাজার ভোটে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি।
রাজবংশী সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস কালিয়াগঞ্জ কেন্দ্রে। বস্তুত তাঁরাই এই কেন্দ্রের ভোট নিয়ন্ত্রক। আর এই জনতার সামনে বিজেপির হাতিয়ার একটাই—নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। কালিয়াগঞ্জের বুথে বুথে ঘুরছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিনহা। প্রচারে গিয়েছেন দিলীপ ঘোষ, মুকুল রায়রাও। সবার মুখেই সেই এক কথা—ভয় পাবেন না। কোনও হিন্দুকে দেশ ছাড়তে হবে না। তবে অনুপ্রবেশকারীদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করা হবে। যা গত সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার নেতাজি ইনডোরে স্টেডিয়ামে এসে বলে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। পর্যবেক্ষকদের মতে, কালিয়াগঞ্জ কেন্দ্রে বিজেপি যে মেরুকরণের কৌশল নিয়েছে তা হিন্দু ভোটারদের মধ্যেই। তথাকথিত নিম্নবর্ণের সামনে বিজেপির আশ্বাসবাণী—সবাইকে এদেশের নাগরিক হওয়ার অধিকার দেবে নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
পাল্টা তৃণমূল যেমন অসমের এনআরসির কথা উল্লেখ করে হিন্দুদের ‘মর্মান্তিক’ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরছে, তেমন শাসক দলের নেতারা গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে একথাও বলছেন, এই ভোটে সরকার বদলাবে না। তাই উন্নয়নের ধারা তরান্বিত করতে বিধানসভায় পাঠান তৃণমূলের প্রার্থীকেই। পরিবহণ ও সেচমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের তরফে এই জেলার পর্যবেক্ষক। তাঁর সঙ্গেই কালিয়াগঞ্জে প্রচারে রয়েছেন আরএক মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। গত লোকসভা নির্বাচনের পর সাংগঠনিক রদবদলও হয়েছে উত্তর দিনাজপুরে। কানহাইয়ালাল আগরওয়ালকে জেলাসভাপতি করে সংগঠন সাজিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শাসক দলের চিন্তা লোকসভার ব্যবধান। যদিও তৃণমূল নেতারা বলছেন, লোকসভা ভোট আর বিধানসভার উপনির্বাচন এক ব্যাপার নয়। অনেকেই জাতীয় রাজনীতির উদাহরণ দিয়ে বলছেন, সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি ভাল করলেও, রাজ্যের নির্বাচনগুলিতে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
মনে রাখা ভাল, লোকসভা ভোটে উত্তরবঙ্গে শূন্য পেয়েছে শাসক দল। কোচবিহার থেকে মালদহ পর্যন্ত একটিও লোকসভা কেন্দ্র জিততে পারেনি তৃণমূল। ফলে উত্তরবঙ্গের সমর্থন কোন দিকে যাবে একুশের ভোটে, সেটাও কালিয়াগঞ্জ থেকে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে মত পর্যবেক্ষকদের অনেকের।