দ্য ওয়াল ব্যুরো, বীরভূম: শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সির ‘শজারুর কাঁটা’ গল্পটার কথা মনে আছে? যিনি আততায়ীর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন স্রেফ তাঁর শরীরের ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উল্টো অবস্থানের জন্য। মানে হৃদপিণ্ড ডানদিকে, যকৃৎ-অগ্ন্যাশয় প্রভৃতি বাঁ দিকে। তাই শরীরের বাঁ দিক দিয়ে ঢোকানো শজারুর কাঁটা প্রাণঘাতী হতে পারেনি। বীরভূমের মুরারই থানার সন্তোষপুর গ্রামের সাতাশ বছর বয়সী মিজানুর রহমানের শরীরের ভিতরের অংশের গড়নও তেমনই। তাঁর হৃদপিণ্ডও শরীরের ডানদিকে।
প্রথমে অবশ্য কেউই জানতেন না যে তাঁর শরীরের অভ্যন্তরীণ গঠন একেবারে উল্টো। দীর্ঘদিন পেটের ব্যথায় ভুগছিলেন মিজানুর। দক্ষিণ ভারতের একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েও সুবিধা করতে পারেননি। শেষে জানা গেল সমস্যা আসলে কোথায়।
বেশ কিছুদিন ধরেই মিজানুর পেটের ব্যথায় ভুগছিলেন। যে জায়গায় ব্যথা হচ্ছিল, তা সাধারণত গ্যাস-অম্বলের জন্যই হয়। সেই মতো চিকিৎসা চলছিল দীর্ঘ দিন ধরে। কিন্তু বিন্দুমাত্র সুরাহা হচ্ছিল না। দক্ষিণ ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করিয়েও আরোগ্য হয়নি। শেষমেশ একেবারে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে যান মিজানুরের পরিজনরা। এখানে এক্স-রে করে এবং ইউএসজি রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকরা বুঝলেন, গলব্লাডারে পাথর হয়েছে, তবে প্রধান সমস্যা হল তাঁর সাইটাস ইনভার্সাস টোটালিস রয়েছে। যাঁদের শরীরের ভিতরের গঠন উল্টো তাঁদের অপারেশন করা খুবই কঠিন, কারণ এমন অ্যানাটমিতে চিকিৎসকরা অভ্যস্থ নন।

চিকিৎসক সৌরভ মাঝি বলেন, “মানুষের শরীরের ভিতরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির অবস্থান একেবারে উল্টো হয়। যেমন হৃদপিণ্ড বাঁদিকের বদলে ডানদিকে থাকে। একই ভাবে যকৃৎ, অগ্ন্যাশয়, অ্যাপেন্ডিক্স থাকে ডানদিকের বদলে বাঁদিকে। আমরা দেখেছি, দশ থেকে কুড়ি হাজার জনের মধ্যে এক জন মানুষের অভ্যন্তরীণ গঠন এই রকম হয়। একে বলে সাইটাস ইনভার্সাস টোটালিস।”
যাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন বিপরীত, তাঁদের শরীরে রক্তসঞ্চালনও উল্টো ভাবে হয়ে থাকে, কারণ শিরা-ধমনীও উল্টো থাকে। তবে জীবন আর পাঁচজনের মতোই স্বাভাবিক হয়। অসুস্থ না হলে এই সমস্যার কথা আজীবন ধরা নাও পড়তে পারে।
চিকিৎসক সৌরভ মাঝি বলেন, “শুধু আমি কেন, আমরা যাঁরা আজ অপারেশন করেছি, কেউই আগে এই ধরনের রোগীর অপারেশন করিনি। আমরা এক ভাবে অপারেশন করে অভ্যস্ত। তাই যে কোনও সময় শরীরের ভিতরের কোনও অংশে ছুরি-কাঁচির আঘাত লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সহজ কথায়, বাঁ-হাতে অপারেশন করতে পারলে ঠিক হত, কিন্তু আমি বাঁহাতি নই, তাই বাঁহাতের কাজ ডান হাত দিয়ে করতে হয়েছে।”
এই জন্যই চিকিৎকদের কাছে এটা বিরল অস্ত্রোপচার। প্রায় পঞ্চাশ মিনিট ধরে চলে মিজানুরের অপারেশন। এখন সুস্থ তিনি।