দ্য ওয়াল ব্যুরো: কথায় বলে রাজনীতিতে সময় তথা টাইমিংটাও বড় অর্থবহ।
হয়তো তাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ যখন বাংলায় সফররত, ঠিক সেই সময়েই সাংবাদিক বৈঠক করে শক্তি দেখাতে চাইলেন একদা বিজেপির ‘কোলের শিশু’ বলে পরিচিত বিমল গুরুং।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতার এক হোটেলে সাংবাদিক বৈঠক করেন এই গোর্খা নেতা। তার পর দার্জিলিং পুরসভার ১৭ জন কাউন্সিলরকে বিজেপি থেকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চায় ফেরানোর ঘোষণা করেন তিনি। গুরুংয়ের কথায়, ওঁদের 'ঘর ওয়াপসি' হল।
বিজেপির সঙ্গ থেকে কদিন আগেই ঘর ওয়াপসি হয়েছে গুরুংয়ের। যেই দাপুটে গোর্খা নেতা পুলিশের হাতে গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে ছিলেন অন্য রাজ্যে, তিনি প্রায় তিন বছর পর রাজ্যে ফিরতে পেরেছেন। এবং বাংলায় প্রবেশের প্রায় মুহূর্ত পরেই গেরুয়া শিবির থেকে তাঁর আনুগত্য তৃণমূলে ট্রান্সফার করার ঘোষণাও করেছেন।
এদিন সাংবাদিক বৈঠকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার পতাকা ১৭ জন কাউন্সিলরের হাতে তুলে দেন গুরুং। তার পর বলেন, "১৭ বছর (যদিও মোর্চা সঙ্গে বিজেপির যোগ ১১ বছরের) ধরে বিজেপির প্রতারিত হয়েছি। আর নয়, একুশের ভোটে তৃণমূলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিজেপিকে সবক শেখাব।" শুধু পাহাড় নয়, গোটা উত্তরবঙ্গে জুড়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রভাব পড়বে বলে দাবি করেন মোর্চা সুপ্রিমো।
বিমল গুরুং বলেন, "পাহাড়ের রাজনীতিতে আমার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ২০১৭ সালে এই কাউন্সিলরদের বিজেপিতে যোগদান করানো হয়েছিল। ওদের সব দিয়েছি, পুরসভা, সাংসদ এমনকি বিধায়ক দিয়েছি দার্জিলিং থেকে। কিন্তু বিনিময়ে কোনও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি বিজেপি। তাই ওদের সঙ্গে আর নয়।"
তবে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু সিং বিস্তা বলেন, গুরুং ফেরার হয়ে যাওয়ার পর ওই ১৭ জন কাউন্সিলরের কিছু করার ছিল না। নিজেদের বাঁচাতে নিজেদের স্বার্থে বিজেপিতে এসেছিল, আবার ব্যক্তিগত স্বার্থেই ফিরে গেল। এতে বিজেপির কোনও ক্ষতি হয়নি।
রাজনৈতিক মহলের অনেকের ধারনা, অমিত শাহের রাজ্য সফরের দিনে দার্জিলিঙের কাউন্সিলরদের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার ফিরিয়ে আনার কৌশল আসলে তৃণমূল নেতৃত্বের। হয়তো বাংলার শাসক দলই ঘুরিয়ে বার্তা দিতে চাইছে যে রাজ্যে গেরুয়া শিবির দুর্বল হচ্ছে।
২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে প্রথমবার গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার জোট বাঁধে বিজেপির সঙ্গে। তৎকালীন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে কথা বলে দার্জিলিংয়ের বিজেপির প্রার্থী হন যশবন্ত সিং। একপ্রকার মোর্চার সমর্থনের ওপর ভর করে কালিম্পং, কার্শিয়াং ও দার্জিলিং বিধানসভায় ব্যাপক ব্যবধান পেয়ে সাংসদ হন যশবন্ত। কিন্তু, নিজের বইতে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ প্রসঙ্গে কয়েক লাইন লিখে দলের রোষানলে পড়েন তিনি। বহিস্কৃত হন এই প্রবীণ বিজেপি নেতা। ফাপরে পড়ে মোর্চা। ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি মোর্চা। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়াকে সমর্থন দেন বিমল গুরুং। ২০১৯ সালে দার্জিলিং থেকে বিজেপির প্রার্থী হন রাজু সিং বিস্তা। ২০১৭ থেকে পাহাড় ছাড়া হলেও, গুরুংয়ের সমর্থন পেয়েই পাহাড়ের তিন বিধানসভা আসন থেকে ব্যাপক ব্যবধানে এগিয়ে যান রাজু। যদিও, শিলিগুড়ি, ফাঁসিদেওয়া ও মাটিগাড়া নক্সালবাড়ি থেকেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন রাজু বিস্তা।
সূত্রের খবর, গত বছর নভেম্বর মাস থেকে রাজ্য সরকারের এক আমলা ও মন্ত্রীর নিরন্তর আলোচনায় তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতায় রাজি হন বিমল গুরুং। লকডাউনের সময় এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হলেও, গত সেপ্টেম্বর মাসে চূড়ান্ত চুক্তি হয় গুরুং তৃণমূলের। ফলস্বরূপ এদিন অমিত শাহ কে ধাক্কা দিতে বিমল গুরুংকেই হাতিয়ার করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।