দ্য ওয়াল ব্যুরো,পুরুলিয়া: অবসর নিয়েছেন ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু, স্কুলে আসা ছাড়েননি। কারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান। শিক্ষক নয় বন্ধুর মতোই মিশেছেন, বাবার মতো যে কোনও সমস্যায় আগলেছেন। আজ, শিক্ষক দিবসের দিনে পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত এলাকার এমনই এক শিক্ষকের নাম উঠে এল খবরের শিরোনামে।
রঘুনাথপুর মহকুমায় ‘বড়তোড়িয়া উচ্চতর বিদ্যালয়’-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক রামচন্দ্র ভট্টরু। ২০০০ সালে শিক্ষকের পদে যোগ দেন তিনি। স্কুল তখন তবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি ইট-কাঠ-পাথরই তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। ‘দ্য ওয়াল’কে রামচন্দ্রবাবু বললেন, ‘‘আমি শুরু থেকেই আছি। এখন অবসর নিয়েছি, কিন্তু নিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে আসি। তাদের সমস্যাগুলো শুনি, সমাধানের চেষ্টা করি।’’
নিয়ম করে প্রতিদিন সকাল হলেই ফিটফাট হয়ে স্কুলে চলে আসেন। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতেই মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাস নেন। কিন্তু, যে কোনও বিষয়েই তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছাড়াও অন্যান্য ক্লাসও নেন। দরকার পড়লে যে কোনও বিষয়ে পড়ুয়াদের প্রয়োজনীয় নোটও দেন রামচন্দ্রবাবু। শুধু পড়ানো নয়, স্কুল পরিচালনা ব্যবস্থারও খুঁটিনাটি থাকে তাঁর নখদর্পনে।
https://www.youtube.com/watch?v=dgSAQQ5HtNM
কী ভাবে স্কুল পরিচালনা করতে হয় সেটা রামচন্দ্রবাবুর থেকেই শিখেছেন বলে জানালেন বর্তমানে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘উনি যখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন তখন থেকেই স্কুলের উন্নতিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। এখনও করে চলেছেন। কৃতী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দেওয়ার প্রথা স্কুলে তিনিই চালু করেন।’’ পার্থবাবু বলেছেন, নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে দু’লক্ষ টাকা ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তির জন্য দান করেছেন তিনি। সেই টাকা থেকেই প্রতিবছর উচ্চমাধ্যমিকে কৃতী দু’জন ছাত্র এবং দু’জন ছাত্রীকে বৃত্তি দেওয়া হয়।
রামচন্দ্রবাবুর ভূয়সী প্রশংসা করে স্কুলেরই অপর এক সন্দীপ পণ্ডা বলেন, ‘‘দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ভট্টারুবাবুকে দেখে আসছি। তাঁর সান্নিধ্যে থাকতে পেরে আমরা গর্বিত। একজন আদর্শ শিক্ষক বলতে যা বোঝায় সত্যিই তিনি তাই।’’ একই মত পড়ুয়াদেরও। সত্যব্রত হাজরা নামে এক ছাত্র জানাল, নিয়মিত তাদের সবার সব সমস্যা মন দিয়ে শোনেন রামচন্দ্রবাবু। তার কথায়, ‘‘স্যার যে অবসর নিয়েছেন সেটা বুঝতেই পারিনা। নিয়ম করে স্কুলে আসেন। আমরা সবাই ওনার কাছে কৃতজ্ঞ।’’
স্কুলের সব কিছুতেই নজর রাখেন রামচন্দ্রবাবু। গোটা স্কুলটাই সবুজে মোড়া। নিজের হাতে অজস্র গাছ লাগিয়েছেন। সবুজায়নে পড়ুয়াদেরও উৎসাহিত করেন তিনি। ‘‘উনি খুব বড় মনের মানুষ। আমরা গর্বিত এমনই একজন আমাদের স্কুলে রয়েছেন,’’ বেশ গর্বের সঙ্গেই কথাটা বললেন প্রধান শিক্ষক পার্থবাবু। তাঁর মুখের হাসিটাই বলে দিল প্রত্যন্ত এলাকা হলেও এমন একজন শিক্ষককে স্কুলে পেয়ে শুধু তিনি বা তাঁর স্কুল নয়, গোটা এলাকাই যথেষ্ট গর্ব অনুভব করে।
আর রামচন্দ্রবাবু? তিনি ভাবলেশহীন। শুধু নিজের কাজ করে যেতে চান। বললেন, তাঁর জমা-পুঁজি থেকে আরও কিছু টাকা পড়ুয়াদের জন্য দান করে যাবেন। এখন তিনি শুধু পড়াতে চান। যতদিন শরীর দেয়, তিনি পড়িয়ে যাবেন। শিক্ষাদান করার মধ্যে যে আনন্দ, তার সবটুকুই তিনি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেন। তাই বয়সের গণ্ডি তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। আর কখনও পারবেও না।