তিয়াষ মুখোপাধ্যায়
অবশেষে ফাঁসি হল নির্ভয়া-কাণ্ডের অপরাধীদের। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর যে নৃশংস অপরাধের কথা জেনেছিল গোটা দেশ। প্রতিবাদে-বিক্ষোভে পথে নেমেছিল দেশের প্রতিটা শহরের বাসিন্দারা। সেই অপরাধেরই অন্তিম পরিণতি ঘটল ২০২০ সালের ২০ মার্চ। এদিনও ভোর থেকে ঘুম ভেঙে সংবাদমাধ্যমে চোখ রেখেছেন বহু মানুষ। এত দিনের অপেক্ষার পরে কাঙ্ক্ষিত সুখবর পেয়ে স্বস্তিও পেয়েছেন স্বাভাবিক ভাবেই।
যদিও ফাঁসির আগে শেষ মুহূর্তে মরণ-কামড়ের মতোই ফাঁসি রোখার তীব্র চেষ্টার কোনও কসুর করেননি অপরাধী পক্ষের আইনজীবী এপি সিং। ভোরে ফাঁসি হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে, সারা রাত ধরে চলে টানটান উত্তেজনা। যদিও শেষরক্ষা হল না। নির্ধারিত সময় সাড়ে পাঁচটাতেই ফাঁসি হয়ে গেল নির্ভয়া কাণ্ডের চার অপরাধী পবন গুপ্ত, মুকেশ সিং, অক্ষয় ঠাকুর ও বিনয় শর্মার। পঞ্চম অপরাধী রাম সিং ধরা পড়ার কিছু দিন পরেই আত্মহত্যা করেছিল। ষষ্ঠ অপরাধী নাবালক হওয়ায় ছাড়া পেয়েছে কয়েক বছর সংশোধনাগারে থেকে।
এ ফাঁসি যেমন স্বস্তি আনল, তেমনই ভারতীয় আইন ব্যবস্থার ইতিহাসে গড়ে দিল এক মাইলফলকও। কারণ নির্ভয়া মামলার পরেই বিরলের মধ্যে বিরলতম অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জায়গা তৈরি হয় আদালতে। অবশ্য এমনটা হওযারই ছিল। গোটা দেশের মানুষের গরিষ্ঠমত এমনই রোষের পথে গড়ে উঠেছিল, মৃত্যুদণ্ডের অবতারণা করারই ছিল এই মামলায়। এই মামলায় নতুন করে গরিষ্ঠ মতের প্রত্যাশা রাখল আইন।
কিন্তু একইসঙ্গে আইনি দীর্ঘসূত্রিতার এক চরম উদাহরণ তৈরি করল এই মামলাই। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বরে ঘটা অপরাধের চার্জশিট তৈরি হয়ে গেছিল কয়েক দিন পরেই। কিন্তু ফাঁসির সাজা কার্যকর হতে লেগে যায় দীর্ঘ ৬ বছর। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে সাজা ঘোষণা হলেও, ফাঁসির আদেশ ঘোষণা হতে গড়িয়ে গেল আরও দুটো বছর। ২০২০ সালের গোড়ায় দিন ঘোষণা হয় ফাঁসির। এক বার নয়, পরপর তিন বার। তিন বারই কোনও না কোনও কারণে, আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে ফাঁসি এড়িয়ে যায় অপরাধীরা। পিছিয়ে যায় তারিখ।
প্রকাশ্যেই ভেঙে পড়েন নির্ভয়ার মা আশাদেবী। চিৎকার করে প্রশ্ন তোলেন, "বিচারের নামে তামাশা হচ্ছে! আমার মেয়েটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে মেরেছিল এরা, এদের বাঁচাতে একের পর এক তারিখ!"
তামাশাই বটে। ফাঁসির সাজা ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরেও, সবরকম আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পরেও, আইনকে কাজে লাগিয়েই কী করে আইনি পথে বারংবার খুনের ও গণধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের আসামিদের বাঁচানো যেতে পারে, তার যেন নয়া নজির তৈরি করে দেখালেন অপরাধীদের আইনজীবী এপি সিং। এক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এসএ বোবদে-ও এই মামলা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, "কোনও লড়াই-ই অনন্তকাল চলতে পারে না।"
জনমানসে প্রশ্ন ওঠে, একটা এত বড় অপরাধের মামলায় অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও আক্রান্ত পরিবারের বিচার পেতে যদি এত বছর লেগে যায়, তাহলে সেই বিচারের অর্থ কী? এ তো বিচারের নামে প্রহসন। এতে তো প্রমাণ হয় আইনেক ফাঁক গলে যে কেউ বেরিয়ে যেতে পারে বা অফুরন্ত সময়কাল ধরে মামলা চালিয়ে যেতে পারে।
এরই মধ্যে, গত বছরের শেষে চলে আসে হায়দরাবাদ ধর্ষণ-কাণ্ডে অভিযুক্তদের এনকাউন্টারের ঘটনা। এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় চার অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়, তার পরে কোনও রকম বিচারের আগেই পুলিশের গুলিতে নিহত হয় তারা। পুলিশ জানায়, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অকুস্থলে নিয়ে গেলে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্তরা, তাই তাদের গুলি করতে বাধ্য হন সাইবারাবাদের পুলিশ কমিশনার ভিএস সাজ্জানার।
এই খবর শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন বহু মানুষ। উদয়াস্ত নারী নিগ্রহ, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির খবর পড়তে পড়তে ক্লান্ত, নির্ভয়া-মামলার দোষীদের বিচার না হওয়া নিয়ে বিরক্ত হয়ে পড়া সেই সব মানুষের কাছে এ খবরটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। পুলিশ, বিচারব্যবস্থার প্রতি যাঁরা বিশ্বাস হারিয়েছেন, যাঁরা দেখেছেন, ঘৃণ্য অপরাধ করেও দিনের পর দিন এক শ্রেণির অপরাধী কী ভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে, তাঁরা এ খবরে খুশি হয়েছিলেন খুবই।
আর এর পাশাপাশিই আবারও উস্কে ওঠে নির্ভয়া-অপরাধীদের দিনের পর দিন কোনও সাজা না হওয়ার বিষয়টি। আইন যেখানে প্রহসনে পরিণত হয়েছে, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা, সেখানে হায়দরাবাদের এনকাউন্টারকেই সঠিক পথ বলে মনে করে বলেন অনেকে।
তবে আজ সে বিতর্কের দিন নয়। সমাজের নানা স্তরে, নানা চিন্তার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ফারাক থাকবেই। সকলের অভিজ্ঞতাও সবসময় সমান হয় না। বিচারের আশায় দীর্ঘদিন ধরে দোরে দোরে ঘোরা মানুষগুলোর মনের অবস্থা হয়তো অনেক সময়েই বোঝা যায় না অন্য কোনও দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই ফাঁসি হওযা উচিত কি উচিত নয়, ফাঁসির বদলে আরও কড়া কোনও শাস্তি দরকারি কিনা-- এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক সরিয়ে রেখে বরং এটা ভাবা যেতে পারে, যে ধর্ষককে ফাঁসি দেওযার মতো ঘটনা আগেও ঘটার পরেও ধর্ষণের পরিসংখ্যান কেন কমছে না।
শুধু ফাঁসি নয়। ধর্ষককে আদালত চত্বরে পিটিয়ে মারার মতো ঘটনাও দেখেছে এই দেশ। দেখেছে এনকাউন্টারও। তাহলে শাস্তির ভয়ে কেন এতটুকু কম হচ্ছে না অপরাধপ্রবণতা? এখনও কেন প্রতি কয়েক মিনিট অন্তর কোনও না কোনও বয়সের কোনও না কোনও মেয়েকে ধর্ষিত হতে হয় এই দেশে? ধর্ষণ করে খুন করার মতো ঘটনাও কম ঘটে না। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার একাধিক ঘটনা যেন জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে মহিলাদের প্রতি হওয়া নৃশংস অপরাধের।
হয়তো লড়াইটা কেবল আইনি পথে নয়, শুরু করতে হবে সামাজিক পথে, আরও গোড়া থেকে। বিচার পাওয়ার জন্য দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইয়ের অনেক আগেই যেন আমরা জিতে যেতে পারি লিঙ্গবৈষম্য বা গৃহহিংসার মতো ধাপে ধাপে সাজিয়ে রাখা লড়াইগুলিতে।
মহিলাদের প্রতি সম্মানের জায়গাটা যদি একেবারে গোড়া থেকে তৈরি হয়, তাহলে এই ধরনের অপরাধ করার মানসিকতা রোখা খানিকটা সহজ হতে পারে।