
শেষ আপডেট: 12 September 2019 08:45
যারা পড়তে আসে তাদের কারও বাবা সবজি বিক্রেতা কিংবা মাছ বিক্রেতা, কারও বাবা ট্রাক চালক, কেউবা কারখানার সাধারণ শ্রমিক বা ভাগচাষীর সন্তান। তবে ওদের সকলেরই পড়াশোনা করার ইচ্ছেটা আর পাঁচজনের থেকে বড্ড বেশি। মেধার জোরে ভর করেই প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হতে চায় ওরা সব্বাই। তাই তো ওদের স্বপ্ন সফল করতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অজয় বাহাদুর সিং। সত্যিই বাহাদুরির কাজই করছেন বটে। এতগুল ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি ওদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। 'জিন্দেগি'-র উঠোনে ওদের জন্য রয়েছে হস্টেল। আছেন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। পড়ুয়ারা যেমন প্রাণপাত করে খাটে, তাদের গুরুরাও আপ্রাণ চেষ্টা করেন যাতে ছেলেমেয়েগুলোর ভালো হয়। ওরা জীবনে সফল হয়।
সময়টা ১৯৯০ সাল। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলে অজয় তখন জোরকদমে নিজেকে তৈরি করছে মেডিক্যালের এনট্রান্সের জন্য। হাতে বেশি সময় নেই। তবে ছেলেটা জানে ওর যা মেধার জোর তাই দিয়ে সব কিছুকে হারিয়ে দিতে পারবে। জয় হবেই। কিন্তু ভবিষ্যৎ কেই বা জানতে পারে। আচমকাই অজয়ের বাবার ধরা পড়ল কিডনির অসুখ। ট্রান্সপ্লান্ট করতে না পারলে বাঁচানো যাবে না মানুষটাকে। ঘরবাড়ি, গয়না বেচেও জোগাড় হয়নি টাকা। পরিবারের সকলে আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের টাকা জোগাড়ের। আর মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেনি অজয়। পড়াশোনা শিকেয় তুলে ময়দানে নেমেছিল সংসারের জোয়াল টানতে। বাবার ওষুধের বিল মেটাতে গিয়ে নিজের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ততদিনে চুরমার হয়ে গিয়েছে। জীবনে লক্ষ্য একটাই, বাবাকে বাঁচাতে হবে।
এক ঝটকায় নিজের শখ আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়েছিল ছেলেটা। বইয়ের মুখ দেখা ভুলেছিল। বদলে বাড়ির পাশের মন্দিরের মাঠে মেলায় চা-সরবত বিক্রির কাজ নিয়েছিল সে। উপার্জন করে সংসার চালানোর বিপুল বোঝা তখন তার কাঁধে। এরপর বাবা মারা যাওয়ার পর পাটনা চলে আসেন অজয়। সেখানেই আশেপাশের বাচ্চাদের টিউশন পড়ানো শুরু করেন তিনি। এর মধ্যেই ওড়িশায় একটি হাই স্কুলে পড়ানোর ডাক পান অজয়। চাকরি পাওয়ার পরেই ঠিক করেন এ বার তাদের জন্য কিছু করতে হবে যারা ঠিক তার মতোই হয়তো অভাব-অনটনে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। মাইনের পয়সা জমিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন সংগঠন 'জিন্দেগি'। পাশে পেয়েছিলেন আরও অনেককেই। যাঁদের অনেকেই আজ এখানকার শিক্ষক।
National Eligibility cum Entrance Test (NEET)-র জন্য দুস্থ মেধাবী ছাত্রদের তৈরি করে অজয় বাহাদুর সিংয়ের সংগঠন। ওড়িশা জুড়ে প্রথমে চলে বাছাই পর্ব। সেখান থেকে সিলেক্টেড ছাত্রছাত্রীরা 'জিন্দেগি'-তে পড়ার সুযোগ পান। প্রথমে চলে মানসিক প্রস্তুতির ক্লাস। তারপর শুরু হয় আসল পড়াশোনা। শিক্ষক-শিক্ষিকিরা বলছেন, "ওরা যে সফল হতে পারবে এই বিশ্বাসটাই আগে ওদের মধ্যে জন্মাতে দিই আমরা। তারপর শুরু হয় সিলেবাসের পড়া। মনযোগ সহকারে প্র্যাকটিস।" ২০১৮ সালেও ১৪ জন চান্স পেয়েছে NEET-তে। এদের মধ্যে সকলের বাড়িতেই নুন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা। কিন্তু ছেলেমেয়েগুলোর পড়াশোনার ইচ্ছে ওদের খিদেকেও ভুলিয়ে দিয়েছে।
এই বিশাল কর্মকাণ্ডের মহীরুহ অজয় বাহাদুর সিং এখন চল্লিশের কোঠায়। ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে এখনও কেঁদে ফেলেন। তবে ডাক্তার না হতে পারার আক্ষেপ এখন খানিক কমেছে। হাসিমুখে সকলকে বলেন, "যখন জানতে পারি ওই ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো জীবনে সফল হওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে, ডাক্তারি পড়তে পারবে-----এখন এতেই আমার শান্তি।"