দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত শনিবার বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করে ভারতের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নীতিতে বদল এনেছিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। কেন্দ্রের সেই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে উচিত পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছিলেন প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী।
সোমবার নয়াদিল্লির সেই পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলল বেজিং। চিনের বক্তব্য, ভারত যে ভাবে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির নীতি পরিবর্তন করেছে তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মুক্ত বাণিজ্য নীতির মৌলিক শর্তের পরিপন্থী। এই পদক্ষেপ বৈষম্যমূলক।
শনিবার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের নিয়ম পরিবর্তন করে কেন্দ্র জানিয়েছিল, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি থেকে কোনও বিনিয়োগ অটোমেটিক রুটে আসতে পারবে না। এ ধরনের কোনও প্রস্তাব ভারতের কোনও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এলে তা আগে খতিয়ে দেখা হবে। সন্তোষজনক মনে হলে তবেই অনুমতি দেওয়া হবে।
কেন্দ্রের সেই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য যে চিনের আগ্রাসী বাণিজ্য নীতিকে রুখে দেওয়া তা বুঝতে বাকি ছিল না কারও। কারণ, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উন্নত এবং উন্নতিশীল রাষ্ট্রের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাতে বিনিয়োগ করবে চিনা সংস্থাগুলি। তার পর তাতে আধিপত্য কায়েম করবে। প্রকাশ্যেই এ ব্যাপারে তাঁর আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। ভারতের ঋণদানকারী সংস্থা হাউজিং ফিনান্স ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন তথা এইচডিএফসিতে চিনের পিপলস ব্যাঙ্ক অব চায়না ১ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করার পরই এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন রাহুল। কেন্দ্রও পদক্ষেপ করতে দেরি করেনি। তবে সরকার যে নীতি বদল করেছে তাতে আলাদা করে চিনের কথা কিন্তু বলা হয়নি। বলা হয়েছে, প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলি থেকে বিনিয়োগ এলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
এখন তাৎপর্যপূর্ণ ভাবেই ‘যার কথা তার গায়ে’ বেজেছে। নয়াদিল্লিতে স্থিত চিনের দূতাবাসের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদেশি লগ্নির পথে ভারত যে নতুন শর্ত আরোপ করেছে তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শর্তকে লঙ্ঘন করেছে। উদার ও মুক্ত বাণিজ্যের জন্য তা পরিপন্থী। আমরা আশা করব যে ভারত এই নীতি বদল করবে এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সব দেশকে সমান দৃষ্টিতে দেখবে, কোনও বৈষম্য করবে না। যাতে মুক্ত ও স্বচ্ছ বাণিজ্যের পরিবেশ বজায় থাকে।
চিনের এই বিবৃতি নয়াদিল্লির উপর চাপ তৈরির চেষ্টা বইকি। কিন্তু তাতে ভারত এখনই দমে যাবে না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, তাঁদের মতে এ ব্যাপারে মোদী সরকারের উপর সঙ্ঘ পরিবার ও ঘরোয়া রাজনীতির পাল্টা চাপও রয়েছে। বরং যতদূর জানা যাচ্ছে, চিন যাতে ঘুরপথেও ভারতের বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিতে আধিপত্য কায়েম না করতে পারে সে ব্যাপারে সজাগ নর্থ ব্লক।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের আশঙ্কা রয়েছে যে, চিনা সংস্থাগুলি হয়তো অন্য দেশের কোম্পানির নাম করে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করবে। সেজন্য আগামী দিনে ভারতে যে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, তার ওপরে কড়া নজর রাখবে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া তথা সেবি। বিদেশ থেকে কোনও সংস্থা বিনিয়োগ করতে এলেই খতিয়ে দেখা হবে, তার সঙ্গে চিনের যোগযোগ আছে কিনা।
মূলত কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ, সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ড এবং লুক্সেমবুর্গ থেকে যে বিনিয়োগ আসবে, তার ওপরেই বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখবে সেবি। কারণ চিনা সংস্থাগুলি অনেক সময় ওই সব দেশের নাম করে ভারতে বিনিয়োগ করে। কয়েক বছর আগে চিন থেকে হংকংয়ে ১০০ কোটি ডলারের এক তহবিল গঠন করা হয়। সেই তহবিল থেকে তারা নানা দেশের বাজারে বিনিয়োগ করে। এই জাতীয় বিনিয়োগ করা হয় মূলত কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের মাধ্যমে।
কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের বেশ কয়েকটি কোম্পানি হংকংয়ের শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত। ২০১৭ সালে হংকংয়ের শেয়ার বাজারে লিস্টেড কোম্পানিগুলির ৫০ শতাংশই ছিল কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের। এক পর্যবেক্ষক জানিয়েছেন, হংকং থেকে সরাসরি কোনও দেশে বিনিয়োগ করা হয় না। চিনা সংস্থাগুলি কেম্যান দ্বীপপুঞ্জে প্রথমে একটা কোম্পানি তৈরি করে। সেখান থেকে ভারত ও অন্যান্য দেশের বাজারে বিনিয়োগ করে।
হংকংয়ে চিন থেকে যে তহবিল তৈরি করা হয়েছে, তাতে চিনা নাগরিকরা টাকা গচ্ছিত রাখেন। ওই তহবিলের সিংহভাগ অর্থই আসে চিনা নাগরিকদের থেকে। ফলে সেই তহবিল থেকে যখন কোথাও বিনিয়োগ করা হয়, তখন লাভবান হন চিনারাই। হংকংয়ের তহবিল থেকে কেম্যান দ্বীপপুঞ্জে নানা কোম্পানি গড়ে তোলা হয়। সেই কোম্পানিগুলি অন্যান্য দেশে বিনিয়োগ করে।
সিঙ্গাপুর থেকে এভাবে ছদ্মবেশী চিনা কোম্পানিগুলি নানা দেশে বিনিয়োগ করে। এক পর্যবেক্ষক জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই চিনা। সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের মালিকানাধীন অনেক কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ করে। কিন্তু দেখা যায়, ওই মালিকদের সঙ্গে চিনের যোগাযোগ আছে। একইসঙ্গে আয়ারল্যান্ড ও লুক্সেমবুর্গেও চিনাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত আছে। সেখান থেকেও ভারতে বিনিয়োগ করার চেষ্টা হতে পারে। তাই চোখ কান সর্বদাই খোলা রাখতে চাইছে সেবি।