প্রলয়ের সময় যেমন নোয়াহ একটি নৌকা বানিয়ে জীবনকে রক্ষা করেছিলেন, তেমনই আজকের সময়েও প্রয়োজন এক আশ্রয়ের, যেখানে হারিয়ে যেতে বসা ভাষা, বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি, নির্যাতিত মানুষের না-বলা কষ্ট কিংবা নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করা পুরুষদের কান্না জায়গা পাবে। ‘তরী’ নামটির মধ্যেই সেই দর্শন লুকিয়ে - “যে বা যারা বা যা কিছু বিপন্ন”, তাদের রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল প্রতিজ্ঞা।

ছবিঃ দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 22 February 2026 19:16
দ্য ওয়াল ব্যুরোঃ ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে সম্বল করে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে (International Mother Language Day) কলকাতায় শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, অধিকার বঞ্চিত ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নিয়ে সুজাতা সদন-এর মঞ্চ থেকে আত্মপ্রকাশ করল ‘তরী’ (Tori)। ভাষার মর্যাদার দিনেই যেন সমাজের নীরব, উপেক্ষিত (Rights-Deprived) ও অসহায় মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হল এক আশ্রয়ের প্রতীক - এক আধুনিক নৌকা, যা বিপন্নদের নিরাপদ তীরে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে।
প্রলয়ের সময় যেমন নোয়াহ একটি নৌকা বানিয়ে জীবনকে রক্ষা করেছিলেন, তেমনই আজকের সময়েও প্রয়োজন এক আশ্রয়ের, যেখানে হারিয়ে যেতে বসা ভাষা, বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি, নির্যাতিত মানুষের না-বলা কষ্ট কিংবা নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করা পুরুষদের কান্না জায়গা পাবে। ‘তরী’ নামটির মধ্যেই সেই দর্শন লুকিয়ে - “যে বা যারা বা যা কিছু বিপন্ন”, তাদের রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল প্রতিজ্ঞা।
সরস্বতী ভাণ্ডার ও ঊর্জা তাদের অভিজ্ঞতা ও শক্তিকে একত্রিত করে এই সংগঠন গড়ে তুলেছে। লক্ষ্য একটাই - যা কিছু পৃথিবী হারাতে বসেছে, তাকে আগলে রাখা। তা সে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য হোক, বাংলার লোকসংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া ধারা হোক, গার্হস্থ্য হিংসার শিকার কোনও নারী হোক কিংবা মানসিক যন্ত্রণায় নীরব কোনও পুরুষ - সবার জন্যই থাকবে একটি নিরাপদ পরিসর। পাশাপাশি সংকটে পড়া মানুষ, প্রাণী বা সম্প্রদায়ের জন্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষা, সচেতনতা ও ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঊর্জার তরফে দেব ঘোষ বলেন, “Technology Scales. Humans Heal.” তাঁর কথায়, প্রযুক্তি কাজের বিস্তার ঘটাতে পারে, কিন্তু আরোগ্য দেয় মানুষের মানবিকতা। মঞ্চে তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখানে প্রযুক্তি থাকবে সহায়ক শক্তি হিসেবে, তবে আসল শক্তি হবে মানবিক অনুভব ও দায়বদ্ধতা। এই ভাবনা থেকেই ‘তরী’ তাদের প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম NGO.NEXT-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যেই কাজ করে চলা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে বৃহত্তর প্রভাব তৈরি করতে চায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজকে গতি দেবে, কিন্তু পথ দেখাবে মানুষ।
সরস্বতী ভাণ্ডারের কর্ণধার ঝর্ণা ভট্টাচার্য বলেন, ভাষা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তারা সব সময় সরব থেকেছেন - সে অবলা হোক বা সবলা। প্রতিবাদে উত্তেজনা নয়, কটু শব্দ নয়, বরং সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খোঁজাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এবার ‘তরী’র মাধ্যমে সেই কাজ আরও বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা গৌতম ঘোষ, বাচিকশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রখ্যাত দাবাড়ু দিব্যেন্দু বড়ুয়া, পুরুষ কমিশনের কর্ণধার নন্দিনী ভট্টাচার্য, আইপিএস শান্তি দাস, অভিনেতা অশোক রায়, অবসরপ্রাপ্ত ডিসিপি মনোজ দাস, গায়ক জয় শঙ্কর মহাশয়সহ বহু বিশিষ্টজন। নাচ, গান ও মঞ্চনাট্যের আবহে এক আন্তরিক পরিবেশে শুরু হয় ‘তরী’র পথচলা।
ভাষা দিবসের দিনে এই উদ্যোগ কেবল একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ নয়, বরং একটি বার্তা - যা কিছু বিপন্ন, তাকে রক্ষা করার দায় আমাদের সকলের। প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ে ‘তরী’ সেই দায়িত্বের ভার তুলে নিল নিজের কাঁধে।