দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৭৮ সাল । ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছন্দ জুড়ে একটি গোরিলার ছবি নজর কেড়েছিল। আয়নার দিকে তাকিয়ে সে নিজেরই ছবি তুলছে। পশুদের মানুষের মতো ট্রেনিং দেওয়ার ব্যাপারে তখনও অতটা কৌশল রপ্ত হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘অ্যানিমাল ট্রেনিং’ ভিডিওর ছড়াছড়িও নেই। কাজেই ওই সময় দাঁড়িয়ে এমন চালাক-চতুর গোরিলা খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিল। নাম ছিল কোকো।
১৯৮৫ সাল। ফের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের কভার পেজে সেই গোরিলার ছবি। এবার আর হাতে ক্যামেরা নেই, বরং বুকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে একটি বিড়ালছানাকে। এবারের ছবিতে কোকোর ছেলেমানুষি ভাবটা নেই। চোখের চাউনি, মুখের ভঙ্গিতে পরিণত মনের ছোঁয়া লেগেছে। সেই সঙ্গে মাতৃত্বের ভাবও স্পষ্ট। হু হু করে ভাইরাল হল ছবি। আরও কয়েকটি ম্যাগাজিনে খবর ছাপল এই গোরিলাকে নিয়ে। সেলিব্রিটি হয়ে গেল কোকো।
কোকো নেই, তবে তার স্মৃতি আজও টাটকা। ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু হয়েছিল এই স্ত্রী গোরিলার। তার বুদ্ধির চর্চা আজও ফিকে হয়নি। বিশেষত যে বিজ্ঞানী কোকোকে ট্রেনিং দিয়েছিলেন সেই পেনি প্যাটারসন আজও বিজ্ঞানীমহলে জনপ্রিয়।
https://twitter.com/NatGeo/status/1295542179419619328
ক্যালিফোর্নিয়ার গোরিলা ফাউন্ডেশনে কোকোর মতোই ট্রেনিং দেওয়ার চেষ্টা হয় গোরিলাদের। এতদিন পরে ফের কোকোর নাম সামনে এনেছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। তাদের টুইটার হ্যান্ডেলে ট্রেনার প্যাটারসনের সঙ্গে কোকোর পুরনো দিনের ছবি, ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। ক্যাপশনে বলা হয়েছে, পশুদের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের সেতু তৈরি করে দিয়েছিল কোকো। আশ্চর্য উপায় সে বুঝে যেত মানুষের মনের ভাব। সে নিজেও ছিল আবেগী। আকার-ইঙ্গিতে কথা বলত, সুখ-দুঃখ-আনন্দ-ভালবাসা সবই প্রকাশ করতে পারত মানুষেরই মতো।
[caption id="attachment_251429" align="aligncenter" width="650"]
পেনি প্যাটারসনের সঙ্গে কোকো[/caption]
হাজারের বেশি ‘সঙ্কেত’ জানত কোকো, দু’হাজারের বেশি ইংরাজি শব্দ বলতে পারত
কোকোর জন্ম ১৯৭১ সালে জাপানে। পরে তাকে সান ফ্রান্সিসকোর চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসা হয়। কোকোর মা জ্যাকলিন এক বিরল রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তার মৃত্যুর পরে ছোট্ট কোকোকে চিড়িয়াখানায় বন্দি না রেখে সব দায়িত্ব নেন পেনি প্যাটারসন। তিনি তখন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে প্রাণীবিজ্ঞান নিয়ে পোস্ট ডক্টরেট করছেন। গবেষণার খাতিরেই কোকোকে ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেন। পরে দু‘জনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। প্যাটারসন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কোকো ছিল একেবারে মানুষের মতো। ‘আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ’ (ASI) শিখে গিয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি। হাজারের বেশি সাইন জানত কোকো। সাঙ্কেতিক ভাষায় সবই বোঝাতে পারত। প্রায় হাজার দুয়েক ইংরাজি শব্দ জানত। শারীরিক ভঙ্গিতে শুধু নয় সাইনের মাধ্যমেও ‘Good’, ‘Bad’, ‘Sad’, ‘Very Sad’ বলতে পারত। যে কোনও নাম কয়েকবার শুনেই শিখে ফেলত। প্যাটারসন বলেছিলেন, নিজের ভাষায় কোনও ব্যকরণ মানত না কোকো। কয়েকটা শব্দকে জুড়ে বাক্য তৈরি করত। আর তার প্রতিটা বাক্যই অর্থপূর্ণ হত। বছর তিনেকের বাচ্চা যেমনভাবে কথা বলতে পারে, তেমনভাবেই আকারে-ইঙ্গিতে কথা বলত কোকো।

শব্দ তৈরি করতে পারত কোকো, নাম দিয়েছিল পোষ্যের
কোকোর ট্রেনার প্যাটারসন জানিয়েছিলেন, খুব কম বয়সেই বয়সেই ‘মিরর টেস্ট’-এ পাশ করে গিয়েছিল সে। আয়নাকে নিজেকে চিনতে পারত। ছবিতে অন্যান্য গোরিলাদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারত। ১৯৭২-৭৭ সালের মধ্যে বিশ্বের নানা বিজ্ঞানীদের কাছে ইনফ্যান্ট আইকিউ টেস্টে ৭০-৯০ রেঞ্জের মধ্যে রেজাল্ট করে কোকো। প্যাটারসন বলেছিলেন, কোনও কোনও সময় মনে হত আট বছরের বাচ্চার মতোই হাবভাব, বুদ্ধি কোকোর বা কখনও তারও বেশি।

স্বজাতি ছাড়া অন্যান্য প্রাণীদের প্রতি কোকোর অনুভূতি কেমন সেটা জানতে ১৯৮৩ সালে তার ঘরে একটি বেড়াল ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রথমে তাকে খুব একটা পছন্দ না করলেও পরে দেখা যায় বেড়ালটিকে নিজেই ট্রেনিং দেওয়ার চেষ্টা করছে কোকো। তাকে কথা বলানোর চেষ্টা করছে। গোরিলার এমন হাবভাব সাড়া ফেলে দেয় বিশ্বের প্রাণীবিজ্ঞানী মহলে। সেই বেড়ালটির নামও রেখেছিল কোকো ‘অল বল’ । তবে কোকো যে কারণে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল সেটা ছিল তার মাতৃত্বের প্রকাশ। দুটি বেড়ালছানাকে সযত্নে লালন করেছিল কোকো। তাদের নাম দিয়েছিল ‘লিপস্টিক’ ও ‘স্মোকি’ । আশ্চর্যের বিষয় হল এই দুই শব্দেরই মানে জানত সে। প্যাটারসন বলেছেন, শব্দের মানে বুঝেই নামকরণ করেছিল কোকো। কোনও প্রাণী হোক বা বস্তু, নাম দেওয়ার আগে এক অদ্ভুত ছেলেমানুষি কাজ করত তার মধ্যে। ঠিক মানবশিশুর মতো।
গোরিলার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাংবাদিক
সেটা ১৯৮৫ সাল। কোকোর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাংবাদিক, লেখিকা সিন্থিয়া গর্নেকে। সিন্থিয়া জানিয়েছিলেন, তাকে প্রথমে বিশেষ পছন্দ করেনি কোকো। সাঙ্কেতিক ভাষায় স্পষ্ট বলেছিল ‘বেরিয়ে যাও’ । সেটা না শোনায় ফের বলেছিল ‘টয়লেট’ । সেই সঙ্গে একটা খারাপ ভঙ্গি। পরে অবশ্য ভুল স্বীকারও করেছিল কোকো। সেটাও সাঙ্কেতিক ভাষাতেই। কোকোর মন জয় করতে একটু সময় লেগেছিল সিন্থিয়ার। তবে পরে কোকো নাকি ঘণ্টাখানেক ধরে তার সব প্রশ্নেরই জবাব দিয়েছিল। সাঙ্কেতিক ভাষায় আনন্দ প্রকাশও করেছিল। গানও নাকি গাইতে পারত সে। গিটার নিয়ে স্টাইলও দেখাত খাসা।

২০০১ সালে কোকোকে নিয়ে অসংখ্য ডকুমেন্টারি হয়। তার একটিতে ছিলেন অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস। ২০১৮ সালে কোকোর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন প্যাটারসন। সেই খবরও ছাপা হয়েছিল কয়েকটি প্রথম সারির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। গোরিলা ফাউন্ডেশনে এখন কোকোর মতোই চালাক-চতুর অথচ আবেগী গোরিলা তৈরির ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনও নাকি কোকোর যোগ্য উত্তরসুরির খোঁজ মেলেনি।