
শেষ আপডেট: 3 November 2022 16:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজেপি জগদীপ ধনকড়কে (Jagdeep Dhankhar) প্রার্থী করার পর তাঁকে ‘জনগণের রাজ্যপাল’ আখ্যা দিয়েছিলের দলের সভাপতি জেপি নাড্ডা। বাংলার (West Bengal) সেই প্রাক্তন রাজ্যপাল এখন দেশের উপ রাষ্ট্রপতি।
কিন্তু কেরলের (Kerala) রাজ্যপাল (governor) আরিফ মহম্মদ খানের (Arif Mohammad Khan) কার্যকলাপ ঘিরে আলোচনায় উঠে আসছে ধনকড়ের বাংলার রাজভবন পর্ব। রাজ্যপালগিরিতে দু’জনের আশ্চর্য মিল নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে, আরিফ মহম্মদ খানও কি জনগণের রাজ্যপাল হয়ে ওঠার দৌড় শুরু করেছেন!
ধনকড়ের সময় বাংলায় রাজ্য-রাজ্যপাল বিবাদ রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত পালায় পরিণত হয়েছিল। ওদিকে, কেরলে সিপিএম শাসিত রাজ্য সরকারের সঙ্গে রাজ্যপাল আরিফের বিবাদ প্রচারের আলো এতটাই কেড়ে নিচ্ছে যে রাজ্যের বিজেপি নেতারা হাত কামড়াচ্ছেন। রাজ্যপাল প্রায়ই রাজভবনে সাংবাদিকদের ডেকে রাজ্য সরকারকে নিশানা করে তোপ দাগছেন। তিনি কখনও উপাচার্যদের পদত্যাগ করার হুকুম জারি করেছেন, কখনও মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়ে কোনও মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার নিদান দিচ্ছেন। আর সবশেষে বোমা ফাটানো অভিযোগ করেছেন, চোরাকারবারে পৃষ্ঠপোষকতা করছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের অফিস।
রাজ্যপালের এহেন অতিসক্রিয়তায় বিপাকে পড়েছেন কেরলের বিজেপি নেতারা। মিডিয়ায় পাত্তা পাচ্ছেন না দক্ষিণের ওই রাজ্যের পদ্ম শিবিরের নেতারা। ধনকড়ের সময় বাংলায় যে দশা হয়েছিল দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারীদের।
ধনকড় প্রমোশন পেয়ে উপ রাজ্যপাল হয়েছেন। অনেক সময়ই তাঁকে ছাপিয়ে যাওয়া আরিফ মহম্মদ কোন পদের আশায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, দু’জনের রাজনীতিতে উত্থানে আশ্চর্য মিল নিয়েও আলোচনায় মেতেছে কেরলের রাজনীতি।
রাজনীতিতে ধনকড়ের হাতেখড়ি কংগ্রেসে। প্রথম জীবনে রাজস্থান বিধানসভায় কংগ্রেসের বিধায়ক ছিলেন। ১৯৮৯-এর লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের ভরা়ডুবির পর রাতারাতি যোগ দেন জনতা দলে। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের আশীর্বাদে জনতা দলের টিকিটে লোকসভায় যান। নয়ের দশের গোড়ায় জনতা দল ভেঙে গেলে ধনকড় মেলামেশা শুরু করেন বিজেপি শিবিরে। কিন্তু রাজস্থানের বিজেপির নেতারা দলবদলু ধনকড়কে জায়গা ছাড়তে রাজি হননি। আইনজীবী ধনকড় পাকাপাকিভাবে দিল্লি পাড়ি দেন। ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন অমিত শাহের।
তবে অটল বিহারী বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদবানিদের সময় বিজেপিতে গুরুত্ব পাননি উত্তরপ্রদেশের এই নেতা। কপাল খুলে যায় নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের সময়ে। কেরলের রাজ্যপাল করে পাঠানো হয় তাঁকে। আর শুরু থেকেই সেখানে চালিয়ে খেলছেন। রাজ্যপাল হিসাবে যাঁর পদক্ষেপ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও আলোচনায় মেতেছেন। এমনকী মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার দাবি তুলে, মুখ্যমন্ত্রীর অফিসকে টার্গেট করে কেরলের রাজ্যপাল আরিফ বাংলার ভূতপূর্ব রাজ্যপাল ধনকড়কেও ছাপিয়ে গিয়েছেন, মনে করছে রাজনীতির পণ্ডিতদের অনেকে।
আরিফ মহম্মদ খানেরও রাজনীতির শুরুটা কংগ্রেসে। রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন উত্তরপ্রদেশের এই নেতা। শাহ বানু মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় বাতিল করতে রাজীব লোকসভায় বিল পাশ করালে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মন্ত্রিসভা ছাড়েন আরিফ। রাজীব গান্ধী তাঁকে দল থেকেও তাড়িয়ে দেন। আরিফ যোগ দেন জনতা দলে। জায়গা পান বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের মন্ত্রিসভাতেও। সেখানে কিছুকাল কাটিয়ে হাত মেলান বিএসপি নেত্রী মায়াবতীর সঙ্গে। কিন্তু ২০০২-এ গুজরাত দাঙ্গার সময় মায়াবতীর হাত ছেড়ে ফের কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ হন। উত্তরপ্রদেশে বিএসপি তখন বিজেপির সঙ্গী। আরিফ মহম্মদ খান অভিযোগ তোলেন গুজরাত দাঙ্গায় যুক্ত দলের সঙ্গে বিএসপির বন্ধুত্ব মানা যায় না। কিন্তু দু’বছর পর নিজেই যোগ দেন বিজেপিতে।
আরিফকে নিয়ে বাড়তি চর্চার আরও একটি কারণ, নিজে মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে তাঁর অবস্থান সম্প্রদায়ের বাকিদের জনপ্রিয় ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। যেমন, কেরলের রাজ্যপাল আরিফ মনে করেন, দেশে সংখ্যালঘুদের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। একটি স্বাধীন দেশে কারও বিশেষ মর্যাদা থাকতে পারে না। তিনি আরও মনে করেন, মাইনরিটি কমিশন, মাইনরিটি ফাইন্যান্স কমিশনের কোনও প্রয়োজন নেই দেশে। উন্নয়নে কেন হিন্দু-মুসলিম করা হবে?
তাঁর কথায়, দেশে মানবাধিকার কমিশন আছে। সংখ্যালঘুদের কারও মানবাধিকার হরণ হয়ে থাকলে তিনি সেখানেই সুবিচার চাইতে পারেন। পৃথক কমিশনের কী প্রয়োজন?
আরিফ মহম্মদের বক্তব্য, সংবিধানে সংখ্যালঘুদের বিশেষ মর্যাদার কথা বলা আছে ঠিকই। কিন্তু সংখ্যালঘু কিভাবে নির্ধারণ করা হবে তার কোনও ব্যাখ্যা সেখানে নেই।
তাঁর আরও অভিমত, ভারতে সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরুর ধারণা ব্রিটিশদের তৈরি করা। তারা ভারতবাসীকে কতগুলি সম্প্রদায়ের সমাহার হিসাবে দেখত। যেমন হিন্দু সম্প্রদায়, মুসলিম সম্প্রদায়, খ্রিস্টান সম্প্রদায় ইত্যাদি। ভারতীয়দের তারা কখনও একটি জাতি হিসাবে বিবেচনা করেনি। স্বাধীনতার পরও সেই ধারণায় আটকে আছে বহু মানুষ। তাই সংখ্যালঘুদের বিশেষ মর্যাদার কথা আসে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই মর্যাদার বিনিময়ে সংখ্যালঘুদের প্রাপ্তি কী?
সব মিলিয়ে বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনও বিরোধ নেই। রাষ্ট্রপতি ও উপ রাষ্ট্রপতি ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশের পর হিন্দুত্ববাদী শিবিরের একাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি তোলে আরিফকে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কিংবা উপ রাষ্ট্রপতি করা হোক।
উত্তরপ্রদেশের মানুষ আরিফ মহম্মদ খান মুসলিমদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নে অবস্থানের ক্ষেত্রে বরাবরই বাকি সম্প্রদায়ের বাকি নেতাদের থেকে পৃথক অবস্থান নিয়ে চলেছেন।
সেই ধারার সূত্রপাত আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন তিনি রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভায় ছিলেন। সেই সময় শাহ বানু মামলার রায় নিয়ে সরকারি পদক্ষেপ ঘিরে তাঁর সঙ্গে রাজীবের বিরোধ বাধে।
কী ছিল সেই মামলা? ভূপালের তালাকপ্রাপ্ত মহিলা শাহ বানু আদালতে খোরপোষ দাবি করে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর দাবি মেনে নিয়ে বলে স্বামী খোরপোষ দিতে বাধ্য।
ওই রায় নিয়ে রে রে করে নেমে পড়ে মুসলিম সমাজের একাংশ। রাজীব গান্ধী তাদের খুশি করতে সংসদে বিল এনে মামলার রায় খারিজ করে দেন। সেই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন আরিফ। তাঁর বক্তব্য ছিল, আদালত অসহায় মুসলিম মহিলাদের স্বার্থে রায় দিয়েছে। সরকারের উচিত নয় তা বদলে দেওয়া।
আরিফের বিরোধ হয় পরের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সঙ্গেও। বিশ্বনাথ প্রতাপের সরকার সংখ্যালঘু অর্থ ও বিত্ত নিগম তৈরি করে। মন্ত্রিসভার সদস্য আরিফ তাতেও আপত্তি তোলেন। তাঁর বক্তব্য, উন্নয়ন, সরকারি সুবিধা ইত্যাদি প্রদানের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু কেন থাকবে?
তবে আরিফ মহম্মদ খানের এই সব অতীত ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে কেরলের রাজ্যপাল হিসাবে তাঁর ভূমিকা। অনেকেই মনে করছেন, সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক পদে ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরণের সুযোগ কম। আইন ও সংবিধানের আধারেই যা করার করতে হয়।
রাজ্যপাল তথা আচার্যের উপাচার্যদের পদত্যাগ করতে সময় বেঁধে দেওয়া, মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে মুখ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দেওয়া রাজ্যপালের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না তা নিয়ে বিজেপি-অবিজেপি, সব শিবিরেই আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, অবিজেপি শাসিত সব রাজ্যেই রাজ্য-রাজ্যপাল বিরোধী চলমান রাজনীতির চেনা অধ্যায় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেরল হয়ে ওঠেনি কোনও রাজ্য।
জগদীপ ধনকড় বাংলার রাজভবন ছেড়ে চলে যাওয়ার পর রাজ্যপালের ক্ষমতা জাহিরে আরিফ মহম্মদ খানের ধারেকাছে কেউ নেই। এখন দেখার ধনকড়ের মতো বিজেপি নেতারা তাঁকেও ‘জনগণের রাজ্যপাল’ বলে আরও মাথায় তোলেন কি না এবং পদোন্নতি হয় কি না আরিফের।
শুভেন্দু মালমুখো হচ্ছেন না মোরবির পর, দ্য ওয়ালের খবরই সত্যি হল