দ্য ওয়াল ব্যুরো: যেন এতদিনের ঋণ মেটালেন যমুনা দাস, ইস্টবেঙ্গলের লজেন্স দিদি। যেদিন লাল হলুদ ক্লাব তাঁবুতে প্রয়াত সুভাষ ভৌমিকের স্মরণসভা হল, সেদিন তিনি অকাতরে বিনে পয়সায় লজেন্স বিলিয়েছেন সদস্য, সমর্থকদের কাছে। প্রাক্তন ফুটবলাররাও টাকার বিনিময়ে লজেন্স চেয়েছিলেন, তিনি তাঁদেরও দিতে চেয়েছিলেন বিনামূল্যে। অনেকেই নেননি, কেউ কেউ নিয়েছেনও।
যমুনা নিজের কাজ করতে পেরে তৃপ্ত। ‘‘ময়দানের জন্যই তো আমি বেঁচে রয়েছি, মাঠ না থাকলে কবেই আমি মরে যেতাম। তাই সুভাষদা-র স্মরণসভায় আসার আগে ঠিকই করে নিয়েছিলাম, চারশো টাকার সব লজেন্স বিনে পয়সায় আজ দেব। মাঠ থেকে তো কতই পেয়েছি, আজ না হয় এমনিই দেব, তাতে কিচ্ছুটি হবে না।’’ বলছিলেন যমুনা।
যিনি গত দু’সপ্তাহ যাবৎ এত কেঁদেছেন, চোখের জল আর মনে হয় অবশিষ্ঠ নেই। শোকের সাগরে ভাসছেন এই মাঠ প্রেমী বিক্রেতা। খড়দহের বাড়িতে বসে যমুনা জানালেন, ‘‘আমি একপ্রকার শোকে পাথর হয়ে গিয়েছি। সুভাষদা যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তার আগেরদিন মায়ের পেটের ভাইকে হারিয়েছি। আমার থেকে কত ছোট ছিল, আচমকা হৃদরোগে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়টুকু দিল না আমার ভাই। তারপরের দিনই আমার দাদা সুভাষ ভৌমিকও চলে গেল। শুধু বাড়িতে বসে ভেবেছি ঈশ্বর আর কত কষ্ট আমার জীবনে রয়েছে, বলতে পারো!’’
যমুনার কাছে সুভাষ ভৌমিক ছিলেন নিজের দাদার থেকেও বেশি। প্রতি পুজোতে শাড়ি উপহার দিতেন ইস্টবেঙ্গল কিংবদন্তি। যে কোনও দরকারে পাশে থাকতেন। বোনের মতো ভালবাসতেন। একবার ভুবনেশ্বরে ফেড কাপে কাউকে না জানিয়ে ইস্টবেঙ্গল দলকে উদীপ্ত করতে যমুনা চলে গিয়েছিলেন ওড়িশায়। সেইসময় কোচ সুভাষ, তিনি যমুনাকে দেখে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘তোর এত সাহস হয় কী করে আমাকে না জানিয়ে চলে আসিস। আমাকে জানালে তো আরও ভালভাবে আসতে পারতিস রে আমার বোন।’’ তারপর দু’দিন পুরো দলের সঙ্গে ডিনার করেছিলেন যমুনা। সেই কথা স্মরণ করে ফোঁপাচ্ছিলেন লজেন্স দিদি।
বলছিলেন, ‘‘এই সাহস দেওয়ার লোকটা চলে গেল, কার কাছে যাব এবার সমস্যায় পড়লে? কে বলবে, বোন আমি আছি তোর পাশে, ভাববি আমিও তোর একটা দাদা।’’ সুভাষের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র অর্জুনের ফোন নম্বর খুঁজছিলেন। সেটি পেয়েছেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাব থেকে। সুভাষ পুত্রের সঙ্গেও কথা হয়েছে যমুনার। অর্জুনও কথা দিয়েছেন যে কোনও সমস্যায় তাঁর জন্য বাড়ির দরজা খোলা।
যমুনা বললেন, ‘‘ভাইফোঁটার দিন এতদিন সুভাষদা-র বাড়িতে পৌঁছে যেতাম, এবার জানি না কী হবে। তবে আমি এবারও ভাইফোঁটা দেব সুভাষদা-কে, তবে ওঁর ছবিতে। আমি আমার দু’ভাইকে হারিয়েছি পরপর দু’দিন, এরচেয়ে খারাপ কী হতে পারে!’’
করোনা জীবনে বহু কষ্ট সামলেছেন এই সাধারণ লজেন্স বিক্রেতা। মাঠে খেলা নেই, বেচাকানাও বন্ধ, ময়দানের বহু কর্তা এখনও খোঁজ নেন যমুনার। তাই হতাশা, কষ্টের মধ্যেও কোনওক্রমে দিন কাটছে এই লাল হলুদ প্রেমীর।