দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্পুটনিক ভি টিকার প্রথম ইউনিট চলে এসেছে। মঙ্গলবারই প্রথম দফায় ভ্যাকসিন নিয়ে আসার কথা ঘোষণা করেছে রাশিয়া। তবে জনসাধারণকে কবে টিকা দেওয়া হবে সে দিনক্ষণ তখনও স্পষ্ট করা হয়নি। রুশ ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থা গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রকের সম্মতিতে চলতি মাস থেকেই গণহারে টিকার প্রয়োগ শুরু হয়ে যাবে। ভ্যাকসিনের ডোজ পৌঁছে যাবে দেশের নানা প্রান্তে।
টিকার দৌড়ে এখন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে রাশিয়া ও চিনের মধ্যে। চিন ইতিমধ্যেই টিকার প্রদর্শনী শুরু করে দিয়েছে। সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম ও ক্যানসিমো বায়োফার্ম—এই তিন প্রথম সারির বায়োটেকনোলজি কোম্পানির টিকাও সার্বিক প্রয়োগের জন্য তৈরি বলে দাবি করেছে চিন। যার মধ্যে ক্যানসিনো বায়োফার্মকে জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার পেটেন্টও দিয়েছে শি জিনপিং সরকার। অন্যদিকে সিনোভ্যাকের টিকাও জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োগ করা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। তাই আর বেশি দেরি করতে চায় না রাশিয়া। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, স্পুটনিক ভি টিকার প্রথম দুই পর্বের ট্রায়াল ইতিবাচক। ল্যানসেটের রিপোর্টের পরে টিকার সুরক্ষা নিয়ে আরও কোনও সন্দেহ নেই। তৃতীয় স্তরের ট্রায়ালের সেফটি রিপোর্টও ভাল। তাই সার্বিক প্রয়োগ শুরু করা যেতেই পারে।
গত ১১ অগস্ট বিশ্বে প্রথম টিকা নিয়ে আসার ঘোষণা করে রাশিয়া জানিয়েছিল গণ টিকাকরণ জানুয়ারি মাসের আগে সম্ভব নয়। কিন্তু গতকালই গ্যামেলিয়া ন্যাশনাল রিসার্চ সেন্টার অব এপিডেমোলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি এবং রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, স্পুটনিক ভি টিকা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে সক্ষম। প্রথম দুই পর্বের ট্রায়ালে সে প্রমাণ মিলেছে। টিকার ডোজে মানুষের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। টি-কোষও সক্রিয় করে রোগ প্রতিরোধ তৈরি করছে। তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালের রিপোর্টও ভাল। এই পর্যায়ে বহু মানুষের শরীরে টিকার ইঞ্জেকশন দিয়ে দেখা গেছে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। কোয়ালিটি টেস্টে পাশ করার পরে মেডিক্যাল ডিভাইস রেগুলেটরের অনুমতিও মিলেছে। তাই গণ টিকাকরণ এ মাসের মধ্যেই শুরু হতে পারে।
রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের সদস্য ডেনিস লগুনভ বলেছেন, টিকার সেফটি ও কোয়ালিটি চেকের পরে গণ-প্রয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। ১৩ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই টিকার ইঞ্জেকশন দেওয়া শুরু হতে পারে। এই সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা চলছে।
প্রসঙ্গত, টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল ও উৎপাদনের জন্য ভারতের সাহায্য চেয়েছে মস্কো। রাশিয়ার এই প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক। নীতি আয়োগের সদস্য (স্বাস্থ্য) ভি কে পল বলেছেন, ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলির সঙ্গে চুক্তি করে এ দেশেও টিকার ট্রায়াল ও উৎপাদনের আগ্রহ দেখিয়েছে রাশিয়া। ভারতের সেরাম বছরে ১০ কোটির বেশি টিকার ডোজ তৈরি করতে পারে। এই পরিকাঠামো আরও কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিরও আছে। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হলে আখেরে লাভ হবে ভারতেরই। ব্রিটেনের পরে দ্বিতীয় কোনও বিদেশি সংস্থার ভ্যাকসিন তৈরি হবে ভারতে। পাশাপাশি, বন্ধু দেশ রাশিয়াকেও পাশে পাওয়া যাবে।
শুরু থেকেই রাশিয়ার ভ্যাকসিনের সুরক্ষা ও কার্যকারিতা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছিল আন্তর্জাতিক মহলে। প্রথম পর্যায়ে মাত্র ৭৬ জনের শরীরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করেই কীভাবে ভ্যাকসিন নিয়ে আসার কথা বলছে রাশিয়া, এই নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল নানা মহলেই। টিকার সুরক্ষাবিধিতেই বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন খোদ রাশিয়ারই অভিজ্ঞ ডাক্তার এবং এথিক্স কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান ডক্টর আলেক্সান্ডার। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভ্যাকসিন তৈরি ও তার ট্রায়ালের দায়িত্বে থাকা প্রধান দু’জন নিয়ম ভেঙে বেআইনিভাবে টিকার প্রয়োগ করেছেন। তাঁরা হলেন গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ভাইরোলজিস্ট আলেক্সান্ডার গিন্টসবার্গ এবং রুশ সেনার মুখ্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক সার্গে বোরিসেভিক। সরকারের এথিক্স কাউন্সিলের নিয়ম ভেঙে টিকার প্রয়োগ হয়েছে দাবি করে কমিটি থেকে পদত্যাগও করেছেন ডাক্তার আলেক্সান্ডার।
কিন্তু এই সব অভিযোগ উড়িয়ে টিকার প্রথম দুই পর্বের ট্রায়ালের রিপোর্ট খোলাখুলি সামনে আনে রাশিয়া। বিশ্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেটে টিকার ট্রায়ালের খুঁটিনাটি জানায় গ্যামেলিয়ার ভাইরোলজিস্টরা। বলা হয়, টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার ২১ দিনের মধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। গবেষকদের দাবি, দ্বিতীয় রিপোর্ট পাওয়া যায় ট্রায়ালের ২৮ দিন পর থেকে। দেখা গেছে, টিকার ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরেই রক্তে টি-কোষ তথা টি-লিম্ফোসাইট কোষ সক্রিয় হতে শুরু করেছে। এই টি-কোষ হল শরীরের মূল সুরক্ষা কবচ। এই কোষ সক্রিয় হলেই ভাইরাস বা প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে ‘অ্যাডাপটিভ ইমিউন রেসপন্স’ তৈরি হয় শরীরে। স্পুটনিক ভি টিকার প্রভাবেও রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হচ্ছে বলেই দাবি।