
শেষ আপডেট: 30 October 2021 18:16
কিন্তু হঠাৎ কেন হারিয়ে গিয়েছিল বিখ্যাত এই খাবারটি? প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সদুত্তর নেই কারোর কাছেই। তবে যেমন হটাৎ করেই হারিয়ে গিয়েছিল, তেমন হটাৎ করেই আবার ফিরে এল সেই বিখ্যাত 'বিফ রোল'। এই ফিরে আসাতেই সেজে উঠেছে নিজাম। বেলুন দিয়ে সেজে ওঠা নিজামে যেন সত্যিই জন্মদিন। বাইরে লেখা 'নিজাম'স ইস ব্যাক', 'নিজাম'স বিফ'। লেখাটাই ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির সরণিতে। ঐতিহ্যের দিক থেকে নিজামের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো রেস্তোরাঁ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
চটজলদি খাওয়ার মধ্যে রোলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া ভার। সেই রোলের জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত। তবে কলকাতার বুকে নিজামের বিখ্যাত রোলের জন্ম সেই ১৯০৪ সালে।
শেখ হাসান রাজ্জা ও পুত্র শেখ নিজামুদ্দিন দুজন মিলে কলকাতার অধুনা নিউমার্কেট চত্বরে একটি ছোট খাবারের দোকান দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কাবাব, রুটি বিখ্যাত ছিল সেই সময়। কিন্তু সাহেবদের হাত তৈলাক্ত হওয়ার থেকে বাঁচাতে কাবাব রুটিই কাগজে মুড়ে বিক্রি শুরু করেন শেখ হাসান রাজ্জা। ক্রমেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে খাবারের এই পদটি।
কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং তৈরি হলে তাঁর নিচেই দোকান দেন হাসান রাজ্জা। ছেলের নামে দোকানের নাম রাখেন 'নিজাম'। সালটা ১৯৩২। জনপ্রিয়তার নিরিখে ক্রমেই শীর্ষ স্থানে পৌঁছে যায় নিজাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানার হাত বদল ঘটে। বদল ঘটে খাবার তালিকারও। সেই পরিবর্তনের কোপে পড়ে একদিন হারিয়েই গেল বিখ্যাত 'বিফ রোল'।
মালিকানা না থাকলেও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে এখনও যুক্ত হাসান রাজ্জার পরিবার। তাঁরই উত্তরসূরি মাজিদ ইরশাদ এখন নিজাম হোটেল দেখভালের দায়িত্বে আছেন। নিজামের ভেতরে বসে কথা বলতে বলতে বারবারই পৌঁছে যাচ্ছিলেন ইতিহাসের পাতায়। তাঁর কথাতেই উঠে এল নিজাম ও বিফ রোলের ইতিহাস।
নিজামের নাম বিশ্ব বিখ্যাত। গিনিস বুক অফ রেকর্ডেও নাম উঠেছে নিজামের। সেই নিজামের ভেতরে বসে ইতিহাস শোনালেন ইরশাদবাবু। বহু মানুষের কাছে থেকে বারবার এই রোল ফিরিয়ে আনার অনুরোধ আসে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এই বিফ রোলের খোঁজ করতে আসত। তাই নতুন করে আবারও বিফ রোল ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথা জানালেন মাজিদ ইরশাদ।
এই রোলের দোকানেই জন্ম বলা চলে তাঁর। চার প্রজন্ম ধরে নিজামের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা। বাবা ইরশাদ আলমের হাত ধরেই ছোট থেকে এই দোকানে আসা-যাওয়া। আজও সেই পুরনো স্মৃতি খুঁজে পান তিনি। মালিকানা বদল হলেও নিজামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি তাঁর।
পুরনো মদ নতুন মোড়কে দেওয়ার মতোই নিজামের বিফ রোলের প্রত্যাবর্তন। তাই লাভ কম থাকলেও গুণগত মানের সঙ্গে কোনও রকম আপোষ করতে নারাজ ইরশাদবাবু। তাঁর কথায়, "জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে রোলের দামও বাড়াতে হয়েছে। কিন্তু স্বাদের সঙ্গে কোনভাবেই আপোষ করব না।" এই জনপ্রিয়তার সিক্রেটই হল এক বিশেষ মশলা, সেই জাদুতেই সুস্বাদু হয়ে ওঠে বিখ্যাত 'বিফ রোল' থেকে 'বিফ কাটি কাবাব'।
১৯৮৪ সাল থেকে এখানে কাজ করছেন মহম্মদ হায়দার আলি। বিফ রোল শুরু হতেই ফের রোল-কাবাবের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনিই।
সেই স্বাদ যে একটুকুও নষ্ট হয়নি তা এককথায় স্বীকার করে নিচ্ছেন খেতে আসা খদ্দেররাও। কৌশিক চ্যাটার্জি নামে এক খাদ্যপ্রেমি পুরনো 'বিফ রোল' ফিরে পেয়ে বেশ খুশি। তাঁর কথায়, "অনেকদিন আগে এখানে খেতে আসতাম, কিন্তু তারপর আবার আজ এসে সেই পুরনো স্বাদই ফিরে পেয়ে খুব ভালো লাগছে।" রোল খেতেই এসেছিলেন প্রশান্ত বর্ধন। পুরনো স্বাদ ফিরে পেয়ে খুশি তিনিও। বললেন, "নিজামের রোল জগৎ বিখ্যাত। সেই স্বাদ আজও একই আছে।"
খাবারের অভ্যাস নিয়ে বারবার নানা বিদ্রোহ উঠেছে নানা মহলে। গরুর মাংস খাওয়াকে অচ্ছুতের মতো মনে করতেন হিন্দুদের একাংশ। আজও কোথাও কোথাও সেই আওয়াজ ওঠে। যার জন্য বহু বিখ্যাত খাবারের দোকানের বাইরে টানাতে হয়েছে 'নো বিফ' লেখা সাইন বোর্ড। তবে কিছু মানুষের কাছে অন্য আর পাঁচটা খাবারের মতোই গরুর মাংস। তেমনই সুরে কৌশিকবাবু বলেন, "খেতে যেটা ভালো লাগবে, সেটাই খাব। সেখানে কোনও রাজনীতি নেই, কোনও ধর্ম নেই, কোনও চাপান-উতোর নেই।"
লকডাউন পর্বের পর নতুন রূপে সেজে উঠেছে নিজাম। রেস্তোরাঁর ভেতরে ধরা আছে পুরনো কলকাতাকে, আছে পুরনো সিনেমার পোস্টারে ছাপ। সঙ্গে আছে সাহিত্য জগতেরও নানা ছবি। তবে নিজামের এখন দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে বিফ ও অন্যদিকে বিফহীন খাবারের দোকান। ভেতরে ও বাইরে দুই জায়গাতেই বসে খাওয়ার সুবিধা। সব মিলিয়ে ফের পুরোনো ছন্দে ফিরল কলকাতার রোলের ঐতিহ্য।