ইতিহাস বলছে, একের পর এক মারণ রোগ মানবসভ্যতাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সেই রোগগুলির উৎস খুঁজতে গেলেই বারবার সামনে আসে এক নাম— বাদুড় (Bat)।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 13 January 2026 14:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইতিহাস বলছে, একের পর এক মারণ রোগ মানবসভ্যতাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সেই রোগগুলির উৎস খুঁজতে গেলেই বারবার সামনে আসে এক নাম— বাদুড় (Bat)। করোনাভাইরাস থেকে ইবোলা, আর সাম্প্রতিক আতঙ্কের কেন্দ্রে থাকা নিপা ভাইরাস, সব ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক ধারক হিসেবে উঠে এসেছে এই উড়ন্ত স্তন্যপায়ীর নাম।
বিজ্ঞানীদের মতে, বাদুড়ের শরীরের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যই তাকে বিপজ্জনক করে তোলে। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী। বহু ভাইরাস শরীরে বহন করলেও তারা নিজেরা অসুস্থ হয় না। দিনের পর দিন নির্বিঘ্নে ভাইরাস বয়ে বেড়াতে পারে। সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন সেই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে।

উড়তে পারা— ভাইরাস ছড়ানোর বড় অস্ত্র
স্তন্যপায়ীদের মধ্যে একমাত্র বাদুড়ই উড়তে পারে। ফলে অল্প সময়ে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় পৌঁছে যায় তারা। এতে ভাইরাসের বিস্তারও হয় বহুগুণ। গবেষকদের ভাষায়, দূরত্ব আর সীমান্ত ভাইরাসের কাছে অর্থহীন— উপযুক্ত পরিবেশ পেলে মানুষে-মানুষে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে সংক্রমণ।
শিকাগোর Field Museum of Natural History-এর গবেষক ব্রুস প্যাটারসনের গবেষণায়ও উঠে এসেছে এই তথ্য— বাদুড় বহু ভাইরাসকে ‘নীরবে’ বহন করে। আবার জার্মানি ও ঘানার বিজ্ঞানীরা ঘানার কোমাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে যৌথ গবেষণায় বাদুড়ের নমুনায় ইবোলা ও সার্সের মতো ভাইরাসের উপস্থিতির ইঙ্গিত পেয়েছেন।

আসল সমস্যা মানুষই?
তবে বিজ্ঞানীরা একমত— শুধু বাদুড় নয়, অনেক বন্যপ্রাণীই ভাইরাসের বাহক হতে পারে। সমস্যার গোড়া মানুষের আচরণে। বহু অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর মাংস খাদ্যতালিকায় রয়েছে। জঙ্গল থেকে শিকার করে বাজারে বিক্রি হয়, কোথাও কোথাও বাদুড়ের মাংসও খাওয়া হয়। এই প্রবণতাই মানুষকে সরাসরি ভাইরাসের সংস্পর্শে এনে দেয়।
নিপা: বাদুড় থেকে মানুষের দেহে
নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রেও ছবিটা প্রায় একই। এই ভাইরাসের মূল উৎস ফলখেকো বাদুড়। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল সুস্থ ফলের সঙ্গে মিশে গেলে সেখান থেকেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক বা দৈনন্দিন জিনিস থেকেও নিপা ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপার মৃত্যুহার ভয়ঙ্কর— প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। তাই একে বলা হয় জুনোটিক ভাইরাস—যা পশুর শরীর থেকে মানুষের শরীরে আসে। আক্রান্ত পশুর দেহাংশ বা মলমূত্র থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে উদ্বেগ
এই আবহেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গে নিপা সংক্রমণের আশঙ্কা। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের দুই নার্সকে নিপা সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের অবস্থা সঙ্কটজনক। ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা চলছে। নিশ্চিতকরণের জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে পুণেতে।
উপসর্গ কখন, কী লক্ষণ?
চিকিৎসকদের মতে, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশির যন্ত্রণা—সবই সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো। কিন্তু হঠাৎ আচ্ছন্ন হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, পরিচিত মানুষকে চিনতে না পারা—এসব হলে দেরি না করে উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করাতে হবে। মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফেলাইটিস) হলে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়; শ্বাসকষ্ট থাকলে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও বাড়ে।
এখনও পর্যন্ত নিপার কোনও টিকা নেই। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয়, আক্রান্তকে আলাদা রাখা এবং সতর্কতাই একমাত্র রক্ষাকবচ।
সব মিলিয়ে, বাদুড় ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের অসতর্ক সহাবস্থানই বারবার নতুন বিপদের দরজা খুলে দিচ্ছে—এ বিষয়ে একমত বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা। প্রকৃতির সঙ্গে দায়িত্বশীল সহাবস্থানই পারে আগামী বিপর্যয় ঠেকাতে।