
শেষ আপডেট: 7 May 2023 13:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা ও বাঙালিকে নিয়ে যত বঞ্চনার কথা শোনা যায়, তাতে তাঁর নামটা সম্ভবত সবচেয়ে ওপরের দিকেই থাকবে (Wriddhiman Saha)।
আমেদাবাদের মোতেরা। পাশে সদর বাজার অবধি এসে একেবারে তুলির টানের মত বাঁক দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে সবরমতী। যে নদীর ধারে বানানো আশ্রমেই অহিংসার সত্যানুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন পোরবন্দরের এক বিলেতফেরত ব্যারিস্টার। সেই মোহনদাস করমচন্দ গান্ধী জীবনে তাঁর আশ্রম, কারাগার এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে সবচেয়ে বেশিদিন যেখানে কাটিয়েছিলেন, তা হল বাংলা। শোনা যায়, গুজরাতি, হিন্দি, ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাটাও তিনি ভাল জানতেন। রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালেও তিনি নানা কাজের ফাঁকে তাঁর নিয়মিত বাংলার শেখার পাঠ নিয়েছিলেন।
আমদাবাদে পাপালি ঝড়, ২০ বলে ঝোড়ো হাফসেঞ্চুরি ঋদ্ধিমানের
সেই মহাত্মা গান্ধীর ভাবশিষ্য সর্দার প্যাটেলের নামাঙ্কিত স্পোর্টস কমপ্লেক্সে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নামাঙ্কিত বিশাল স্টেডিয়ামে যেন সমস্ত ক্ষোভ, বঞ্চনা, যন্ত্রণা উগরে দিয়ে গেলেন ৩৮ বছরের এক বাঙালি।
ঋদ্ধিমান সাহা (Wriddhiman Saha)। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের পরে তিনিই তর্কাতীতভাবে ভারতীয় ক্রিকেটে বাংলার মুখ। অথচ বাংলাই যেন তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে চায়। কতকটা যেন উত্তরবঙ্গের বঞ্চনার কাহিনী তাঁর সঙ্গে মিলে যায়। তিনিও যে আদতে উত্তরবঙ্গের। শিলিগুড়িতে ছোটবেলা কাটিয়েছেন। অথচ আইপিএলে তিনি খেলেন গুজরাতের হয়ে। রঞ্জিতেও তিনি চলে গিয়েছেন ত্রিপুরায়। বাংলাকে ছেড়ে।

'কলকাতা নাইট রাইডার্স' দলের জন্মলগ্নে তিনি ছিলেন কলকাতাতেই। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, তাতেন্দা তাইবুকে ছাপিয়ে তিনি খেলেছেন কেকেআরের প্রথম দলে। তখন কলকাতা দলে বাংলার কিছুটা হলেও জায়গা ছিল। অধিনায়ক সৌরভের সঙ্গে খেলতেন অশোক দিন্দা, দেবব্রত দাস, লক্ষ্ণীরতন শুক্ল, মনোজ তিওয়ারি। কিন্তু সাফল্য আসেনি। পুরোদস্তুর কর্পোরেট পথে হাঁটা শুরু করে কেকেআর। বেঙ্কি মাইসোরের বাছাইপর্বে বাদ পড়েন একের পর এক বাংলার খেলোয়াড়রা। বিদায় নেন ঋদ্ধিও।
মাথিশার বোলিং অ্যাকশনে দিশেহারা ব্যাটাররা! ‘বেবি মালিঙ্গা’কে কী উপদেশ দিলেন মাহি
ভারতীয় দলেও ঋদ্ধিমানের জায়গা পাকা হয়নি। উইকেটকিপারের জায়গায় দিবাকরের মত গনগন করছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। আর কারোর নাম মাথাতেই আসবে না। পরে টেস্ট দল থেকে ধোনি সরে দাঁড়ানোয় তাঁর কপাল খোলে। কিন্তু ওয়ানডে-তে তাঁর ভাগ্য আর খোলেনি। ২০১০ সালের নভেম্বরে গুয়াহাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে একদিনের ম্যাচে অভিষেক হয় তাঁর। মাত্র ৫ বলে ৪ করেই আউট হয়ে যান। ২০১৪ সালে হায়দরাবাদে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তিনি শেষবারের মত ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলে ফেলেন। শিখর ধওয়ন আর বিরাট কোহলির দাপটে ৬ উইকেটে সেই ম্যাচ জিতে নেয় ভারত।
তারপর আর ওয়ানডেতে ঋদ্ধিমানের সুযোগ হয়নি। টেস্টেও তাঁর জায়গা নড়বড় করেছে। ঋষভ পন্থের উত্থানের পর আরোই তিনি অনিশ্চিত হয়েছেন।
গত বছর এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে ঋদ্ধিমান জানিয়েছিলেন, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে বলেছিলেন, তিনি যতদিন বিসিসিআই সভাপতির পদে আছেন, ততদিন ঋদ্ধিমানের দলে জায়গা পাকা থাকবে। অথচ কোচ রাহুল দ্রাবিড় ঋদ্ধিকে ঠারেঠোরে জানিয়েছিলেন, তাঁরা নতুন প্রতিভার সন্ধানে আছেন, তাই তাঁর অবসর নিয়ে নেওয়াই ভাল হবে। শুধু দেশের হয়েও নয়, বাংলাতেও একইরকম অপমানিত তাঁকে হতে হয়েছে। তিনি নাকি বারবার ঘরোয়া ক্রিকেট এড়িয়ে যাচ্ছেন নানা অজুহাতে, এরকম অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। ক্ষুব্ধ ঋদ্ধি বাংলা ছেড়ে যোগ দিয়েছেন ত্রিপুরা দলে।
আইপিএলে সবচেয়ে বেশি শূন্য করার রেকর্ড গড়ে ফেললেন রোহিত শর্মা
আজ মোতেরায় পড়ন্ত বিকেলের রোদে যেন এই সমস্ত ক্ষোভই আছড়ে পড়ছিল ব্যাটে। লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিরুদ্ধে গুজরাত টাইটানসের হোম ম্যাচ। ওপেনে নেমেছেন ঋদ্ধিমান আর শুভমন গিল। গ্যালারিতে বেশি ভিড় নেই। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট মাঠের কমলা গ্যালারির অর্ধেকও ভরেনি। শুধু মাতিয়ে দিয়ে গেলেন গুজরাতের বাঙালি ওপেনার। মাঠের কোনও জায়গা ফাঁকা রাখেননি। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট, ডিপ মিড উইকেট, লং অফ, স্কোয়ার লেগ সবেতেই হাঁকিয়েছেন। পঞ্চাশ রানে পৌঁছেছেন ক্রিজ থেকে বেরিয়ে সজোরে লং অফে ছক্কা মেরে। শেষে ১২ ওভারের প্রথম বলে আবেশ খানকে স্টেপ আউট করে ডিপ স্কোয়ার লেগে তুলে দিলেন, লখনউয়ের প্রেরক মাঁকড় ভুল করেননি। স্কোরবোর্ড বলছে, ৪৩ বলে করেছেন ৮১, মেরেছেন ১০-টি চার, ৪০-টি ছয়, স্ট্রাইক রেট ১৮৮ ছাপিয়ে গিয়েছে।
সঙ্গী শুভমন গিলও ছাড়েননি। কলকাতা নাইট রাইডার্সের প্রাক্তন তারকা গিলও ৫১ বলে ৯৪ করে গেলেন। লখনউয়ের মালিক বাংলার শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েঙ্কা। তাঁর দলও ঋদ্ধিমানকে নেওয়ার কথা ভাবেনি। সারা জীবন বিতর্ক এড়িয়ে চলা, নম্র, বিনয়ী বঙ্গসন্তান যা বলার আজ সবরমতীর তীরে ব্যাট দিয়েই বলে দিয়ে গেলেন।