টেস্ট ক্রিকেট আর বিরাট কোহলি কালক্রমে একে অন্যের নামান্তর হয়ে উঠেছে। লাল বলের ক্রিকেটকে ভালবেসেছেন বিরাট। পাল্টা সমাদর ফিরে পেয়েছেন।

বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 13 May 2025 11:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০০৬ সালে প্রায় জনশূন্য ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে ব্যাট করতে নেমেছিলেন বিরাট কোহলি। তখন তিনি পশ্চিম দিল্লির নাদান ছোকরা। গা থেকে সদ্য-তারুণ্যের গন্ধ উবে যায়নি। সবে আঠারোয় পা রেখেছেন। ওই ম্যাচে ৯০ রান করেছিলেন বিরাট৷ ফলো অন থেকে উদ্ধার পেয়েছিল দিল্লি।
কিন্তু রান নয়। অধরা সেঞ্চুরিও নয়। ওই রঞ্জি ম্যাচ চিরজীবন বিরাটের মনে থাকবে একটাই কারণে। বাবা প্রেম কোহলি মারা গিয়েছেন। সৎকারের আয়োজন প্রস্তুত৷ তবু খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা টিমের হাত ছেড়ে পরিবারের পাশে ছুটে যাননি ‘চিকু’। দলকে বাঁচিয়ে তারপর শ্মশানের পথে হেঁটেছিলেন।
কাট টু। ২০২৫। বছর ছত্রিশের গ্লোবাল সুপারস্টার বিরাট কোহলি খেলতে নেমেছেন সেই দিল্লির মাটিতে। মধ্যের ১৯ বছরে অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। মায় ফিরোজ শাহ কোটলার নাম পর্যন্ত! কোহলিও আর ‘চিকু’ নন। এখন তিনি দলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। রেলওয়েজের বিরুদ্ধে আপাত-গুরুত্বহীন ম্যাচ তাঁর কাছে ‘রোগ’ সারানোর উপায়। অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দেওয়ার রোগ৷ কিছুতেই নিস্তার নেই! তাই রঞ্জির মাঠে ফের আত্মপরীক্ষায় নামা। এবার জাত চেনাতে নয়, সম্মান বাঁচাতে৷
অনামী পেসার হিমাংশু সাংওয়ানের বলে ক্লিন বোল্ড হয়ে সেদিন মাঠ ছেড়েছিলেন কোহলি। ২০ হাজার অনুরাগীদের হইচই, হর্ষ-উল্লাস মুহূর্তে স্তব্ধ। নতমস্তকে ড্রেসিং রুমের পথে যখন পা বাড়াচ্ছেন বিরাট, হয়তো সেদিনই মনের অগোচরে উঁকি মারছিল সন্দেহ, খোঁচা দিচ্ছিল যন্ত্রণা৷ এটাই কি সময়? এবার কি এতদিন ধাপে ধাপে ধরে গড়ে তোলা ‘ফর্ম’ সত্যি হাতছাড়া হল?
সোমবার, সপ্তাহের প্রথম দিন টেস্টের ময়দান থেকে অবসর ঘোষণার মুহূর্তে তামাম সমর্থক ও অনুরাগীর মনে হয়তো একটাই প্রশ্নই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল: ঠিক কবে নিজের প্রিয়তম ক্রিকেট-মঞ্চকে আলবিদা জানানোর সিদ্ধান্ত নেন বিরাট?
নিজের বিদায়ী-বার্তায় ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার গানকে সাক্ষী মেনে যে নাতিদীর্ঘ বয়ানটি পেশ করেছেন, সেখানে এই কারণের উল্লেখ নেই। শুধু বলা আছে, সিদ্ধান্তটা ‘সহজ’ না হলেও ‘সঠিক’। এই সহজ আর সঠিকের দোলাচলের নিষ্পত্তি কবে হবে বা আদৌ হবে কি না, সেটা একমাত্র বিরাট-ই জানেন! হয়তো বর্ডার-গাভাসকার ট্রফিতে সেঞ্চুরি সত্ত্বেও চার টেস্ট মিলিয়ে আর মাত্র ৯১ রান করার কেঠো, তেতো সত্য তাঁকে মেনে নিতে বাধ্য করে: সময় আসন্ন! দলের স্বার্থে, নিজের গরিমা বাঁচাতে সরে দাঁড়ানোটাই বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত।
সবাইকে তাজ্জব করে আচমকা নিষ্ক্রমণ সত্ত্বেও অনুরাগীদের স্মৃতিতে সতত সজীব থাকবে প্রাক-কোভিড পর্বে বিরাটের দাপট। সেই দাপটের মহিমা এমনই যে, কয়েক সেকেন্ডের ইনস্টাগ্রাম রিল আর কয়েক ঘন্টার আইপিএলে মজে থাকা আস্ত প্রজন্ম গোটা দিন ধরে টেস্ট ইনিংস দেখার—দেখে চেটেপুটে খাওয়ার আস্বাদ হাতছাড়া করতে চায় না। গুরুত্বহীন রঞ্জি ম্যাচ সপ্তাহের কাজের দিনে হাতের যাবতীয় দায়িত্ব ভুলে দেখতে ছুটে যায়!
টেস্ট ক্রিকেট আর বিরাট কোহলি কালক্রমে একে অন্যের নামান্তর হয়ে উঠেছে। লাল বলের ক্রিকেটকে ভালবেসেছেন বিরাট। পাল্টা সমাদর ফিরে পেয়েছেন।
অনেক প্রশ্ন আর দ্বন্দ্ব নিরসন না করেই অস্তাচলের পথে পা বাড়ালেন তিনি। অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল নিয়ে অস্বস্তি রয়ে গেল৷ শচিন, রোহিতের মতো নিখুঁত সুইপ শটও বিরাটের ব্যাট থেকে খুব একটা বেরতে দেখেনি ক্রিকেট-বিশ্ব। কিন্তু ভারতের মতো দেশে বেড়ে ওঠা একজন তারকা, যেখানে ক্রিকেট আসলে সমাজেরই আয়না, সেখানে বিরাট কোহলি চিরন্তন মেগাস্টার হয়ে থাকবেন। তাঁর যাবতীয় মানুষী ও ক্রিকেটীয় দুর্বলতা ও খামতি নিয়েই দ্যুতি ছড়িয়ে যাবেন ‘চিকু’... দিল্লির ঘরের ছেলে।