
শেষ আপডেট: 26 March 2023 15:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৯ সালের ঘটনা। বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৫২ কেজি মহিলাদের বিভাগে কোনও যোগ্যতা অর্জন পর্ব ছাড়াই সুযোগ পেয়েছিলেন মেরি কম। সেই সময়েই সামনে এসেছিল ২২ বছরের এক দক্ষিণ ভারতীয় মেয়ের কথা। কারণ তিনিই মেরি কমের এই সুযোগ পাওয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে দাবি করেছিলেন, যোগ্যতা অর্জন পর্ব জরুরি। গত বছরের টোকিও অলিম্পিক্সেও ভারতীয় বক্সার হিসেবে সুযোগ পান মেরি কম। ফের ন্যায্য সুযোগের দাবি করেন সেই দক্ষিণী তরুণী (Nikhat Zareen)। মেরি কম খানিক ব্যঙ্গের স্বরেই প্রশ্ন করেছিলেন, 'কে এই মেয়ে?'

কে এই মেয়ে! এই উত্তরই আজ পেয়ে গেছে সারা দেশ! সে মেয়েকে অভিনন্দন, প্রশংসা, শুভেচ্ছার বন্যায় ভরিয়ে দিচ্ছে সকলে। যে উত্তর তিন বছর আগে সামনে এসেছিল নিছক একটা নাম হিসেবে, সে নাম আজ সোনায় মোড়া। ভারতীয় মহিলা বক্সিংয়ে সোনার মেয়ে সে। নিখাত জারিন (Nikhat Zareen)। নিজামাবাদের অগ্নিকন্যা। আজ, রবিবার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী স্পোর্টস কমপ্লেক্সে বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে লাইট ফ্লাইটওয়েট (৪৮ কেজি-৫০ কেজি) বিভাগে সোনা জয় করলেন তিনি।

প্রাক্তন ফুটবলার ও ক্রিকেটার মহম্মদ জামিলের চার মেয়ে। তিনি চেয়েছিলেন, একটি মেয়েকে অন্তত তৈরি করবেন খেলাধুলার জগতে। তৃতীয় কন্যা নিখাতই এই বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব পায়। ছোটবেলা থেকেই দারুণ খেলত সে। রাজ্যস্তরে একের পর এক পুরস্কারও পেতে শুরু করে। বক্সিং করা শুরু ১৪ বছর বয়সে, তার আগেই সে স্প্রিন্টার হিসেবে বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। মেয়েকে তৈরি করার জন্য সৌদি আরবের চাকরি ছেড়ে নিজামাবাদে ফেরেন জামিল। শুরু করেন মেয়ের ট্রেনিং।

তবে কোনও কিছুই সহজ ছিল না। সংরক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে নিখাত। খেলতে গেলে পরতে হবে গেঞ্জি-প্যান্ট। তাও কি সম্ভব! হাজারো বাধা পরিবারে, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে। তবে বাবা তো বটেই, মা পারভিন সুলতানাও প্রথম থেকেই মেয়ের পাশে ছিলেন।
নিখাতের দুই দিদি ডাক্তার। ছোটবোন ব্যাডমিন্টন খেলে। নিখাত যখন বক্সিং শুরু করল, তখনও বাবার মনে দ্বন্দ্ব ছিল খানিকটা। মেয়ে কি পারবে এই কঠিন স্পোর্টসে সফল হতে! আত্মীয় পরিজনরাও ক্রমাগত বলে গিয়েছেন, এই খেলা মেয়েদের জন্য নয়। এত ছোট পোশাক পরে মেয়েদের সকলের সামনে যাওয়া উচিত নয়! এসবের মাঝে নিখাতের কঠোর ট্রেনিং অবশ্য থামেনি। ২০১১ সালে টার্কি থেকে জুনিয়র বিভাগের বক্সিংয়ে পুরস্কার জিতে আনে নিখাত। জানায়, সে বক্সারই হতে চায়।

এর পরে আর কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না। ২০১৬ সালে হরিদ্বারে ফের জয় পায় নিখাত। এবার সিনিয়র বিভাগে। তবে ২০১৭ সালে কাঁধের একটা চোটে বড় ধাক্কা আসে। জাতীয় প্রতিযোগিতায় খেলতেই পারেনি সে। ২০১৮ সালে ফের প্রত্যাবর্তন, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে এবার ব্রোঞ্জ। ২০১৯ সালের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং থাইল্যান্ড ওপেনে নজর কাড়ে সে। তবে সুযোগ মেলেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে। মেরি কমই প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন দেশের।

তখন থেকেই বোধহয় সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন নিখাত। সাইয়ের প্রাক্তন কোচ ইমানি চিরঞ্জিবী জানান, ২০১৪ থেকে তিনি নিখাতকে ট্রেনিং করাচ্ছেন। অনেকটা সময় দিয়ে বক্সিংয়ের নানা প্যাঁচ শিখিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, 'নিখাতের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে, ওর মনের জোর দুর্দান্ত। সেই সঙ্গে ও প্রতিপক্ষর স্ট্র্যাটেজি ধরে ফেলতে পারে। কখন পাঞ্চ করবে, কখন ব্লক করবে, কখন ডজ করবে-- এসব ওর মধ্যে সহজাত ভাবে চলে আসে। শুধু শরীর দিয়ে নয়, মন এবং মাথা পুরোটা কাজে লাগায় রিংয়ের ভেতরে। সেটাই ওকে অনেক এগিয়ে দিয়েছে।'

যদিও এত লড়াই করেও, মেরি কমের মতো কিংবদন্তী সামনে থাকায়, নিখাতের প্রতিটি পারফরমেন্সই যেন ছায়ায় লুকিয়ে থেকে গেছে। তবে কথায় বলে, সত্যিকারের প্রতিভা কখনও চাপা থাকে না। তাই সুযোগ আসে গত বছরের মে মাসে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে যান নিখাত, প্রমাণও করেন নিজেকে। বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে থাইল্যান্ডের প্রতিপক্ষকে ৫-০তে হারিয়ে স্বর্ণপদক জয় করেন তিনি। এবার ফের সেই জয়ের পুনরাবৃত্তি। আবারও ৫-০তে হারলেন নিখাতের প্রতিপক্ষ, ভিয়েতনামের নুয়েন থি থাম।
আর সেই সঙ্গেই মেরি কমের সঙ্গে একই খাতায় নাম লিখিয়ে ফেললেন তিনি। মেরি কমের পরে নিখাতই এ দেশের দ্বিতীয় মহিলা বক্সার, যিনি দু'টি আন্তর্জাতিক সোনার খেতাব জিতলেন। ভারতের হয়ে রেকর্ড গড়লেন।

গর্বিত বাবা মহম্মদ জামিল বলেন, 'বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতা একটা দারুণ ব্যাপার। কিন্তু সাধারণ মুসলিম পরিবার থেকে এসে এই জয় আরও অনেকের থেকে অনেক বেশি কঠিন। দেশের প্রতিটা মেয়ের স্বপ্নের উড়ানের সামনে নিখাত একটা উদাহরণ। বাধাদের হারিয়ে দিয়ে নিজের জয়ের পথ তৈরি করে নিতে হয়।'
বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে এর আগে দু'টি সোনা এসেছে। মহিলাদের বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনার খাতা খুলেছিলেন নীতু ঘাঙ্ঘাস। গতকাল তিনি ৪৮ কেজি (মিনিমাম ওয়েট) বিভাগে মঙ্গোলিয়ার লুতসাইখান আলতানসেতসেগকে হারিয়ে ছিলেন। নীতুর সোনা পাওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ৮১ কেজি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন সুইটি বুরা। এবার সেই খাতায় নাম লেখালেন নিখাতও।
স্মৃতি ইরানির প্রথম রোজগার বাসন মেজে! কোথায়, কেমন দিন কাটিয়েছিলেন তিনি, জানালেন নিজেই