
আইপিএলে দুরন্ত মেজাজে অভিষেক, পাশে কোচের সঙ্গে ময়দানে একান্তে।
শেষ আপডেট: 8 May 2024 20:36
আইপিএলে স্বপ্নের ইনিংস খেলছেন বাংলার ছেলে অভিষেক পোড়েল। গত মঙ্গলবার রাতে রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে চন্দননগরের ছেলের ব্যাটিং দেখে পুরো দিল্লি শিবিরই মুগ্ধ। খেলা শেষে দিল্লি দলের সহকারী কোচ প্রবীণ আমরে জানিয়েছেন, একটা ভারতীয় ব্যাটার এমন দাপটে ব্যাটিং করছেন, এটাই দারুণ বিষয়। নেটেও অভিষেক খুব সাবলিল ব্যাটিং করছে, ওকে শুরু থেকেই বেশ উজ্জ্বল দেখিয়েছে।
চন্দননগরের রথের সড়ক এলাকার এই ছেলেটি গত রাজস্থান ম্যাচে করেছেন ৩৩ বলে ৬৫ রান। তারমধ্যে ২৮ বলে হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। তিনি ৫০ রান পূর্ণ করেছেন আবেশ খানকে ওভার বাউন্ডারি মেরে। অভিষেকের গড় ৩৩.৩৭, স্ট্রাইকরেট ১৫৭.৯৮। মোট রান করেন ২৬৭।
যে কোনও সাফল্যের আড়ালে একটা বৃহত্তর লড়াই থাকে, সেটাই রয়েছে অভিষেকের জীবনে। যাঁকে নয় বছর বয়সে আবিষ্কার করেছিলেন ময়দানের নামী কোচ বিভাস দাস। যিনি কলকাতা ও জেলাতেই একাধিক কোচিং অ্যাকাডেমির হেড কোচ পদে রয়েছেন। যাঁর হাত ধরে ক্লাবের ক্রিকেটের উন্নতি সাধন হয়েছে। সেই ক্লাবেই ক্রিকেট হাতেখড়ি অভিষেকের, যিনি সারা চন্দননগর ও চুঁচুড়ায় কিট্টু (ডাকনাম) নামে পরিচিত।
শচীনের যেমন আচরেকর স্যার, কোহলির যেমন রাজকুমার শর্মা, ধোনির যেমন কেশব স্যার, তেমনি অভিষেকের ক্রিকেটীয় উত্থান বিভাস স্যারের হাত ধরেই। ওই অভিজ্ঞ ক্রিকেট শিক্ষক বুধবার বিকেলে বলছিলেন, ‘‘আমি অভিষেককে তৈরি করিনি! বরং ওর জেদই ওকে বড় করেছে, সাফল্য এনে দিয়েছে। আমি শুধু পথটা দেখিয়ে দিয়েছি কীভাবে সফল হওয়া যায়, এটাই আমার কাজ ছিল।’’
বিভাসবাবুই বলছিলেন, ‘‘২০২০-২১ সালে করোনার সময় অভিষেকের বাড়ির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, বাড়িতে দু’বেলা কী খাবে, সেই নিয়েও সংশয় ছিল। সেইসময় মন্ত্রী ছিল লক্ষ্মীরতন শুক্লা, ওঁকে ফোন করে অভিষেকের জন্য কিছু করতে বলেছিলাম। লক্ষ্মী আমার কথা অমান্য করেনি, যথাসাধ্য করেছিল।’’
আইপিএলে বাঘা বাঘা বিশ্বের বোলারদের সামলাচ্ছেন ২১ বছরের তরুণ। খেলায় এতটাই পরিণতবোধ যে, শৈশবের কোচও মুগ্ধ। সাহসের সঙ্গে খেলছেন মিচেল স্টার্ক, অশ্বিন, ট্রেন্ট বোল্ট, রাবাদা, চাহালদের মতো অভিজ্ঞদের। এই সাহস পেলেন কোথা থেকে? প্রশ্নের জবাবে অভিষেকের কোচ বললেন, যাদের পেটে খিদে থাকে, তাদের সাহসও বেশি হয়। ভাল খেলার তাগিদ তাদের ভয় কাটিয়ে দেয়, কিট্টুরও তাই দিয়েছে।’’
এও জানালেন, ‘‘অভিষেকের থেকেও তাঁর জ্যাঠামশাইয়ের ছেলে ঈশান পোড়েলকে বেশি সপ্রতিভ মনে হয়েছিল। ঈশানকে দেখেই মনে হয়েছে, ও ভারতীয় দল খেলবে। খেলেছেও। অভিষেককে সেটি মনে না হলেও ওর জেদ ওকে ব্যতিক্রম করে তুলেছে।’’
বাংলা রঞ্জি দলেও অভিষেক নামতেন ছয় কিংবা সাত নম্বরে। সেখানে দিল্লির মতো তারকাসমৃদ্ধ দলে ওপেনিংয়ের মতো স্লটেও সমান ছন্দে। ১০ বলে ৩২ রান করে শুরুতেই চমক দেখান। তারপর টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচেও সমান মেজাজে হুগলির ছেলেটি। যাঁর আইপিএলে ডাক পাওয়ার দিনটিও বিশেষ নাটকীয়। দিল্লির মূল কোচ রিকি পন্টিং ফোন করেছিলেন বাংলার নামী প্রতিভাকে। সেইসময় দুপুরে খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিলেন তিনি। মিসড কল দেখে ফোন করতে পালটা পন্টিং বলেছিলেন, ‘‘অভিষেক ইউ আর সিলেকটেড ফের নেক্সট সিজন।’’
অভিষেককে দিল্লি দলে জায়গা করে দেওয়ার মূলে অবশ্য সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। দাদার পছন্দের ছেলে অভিষেক। তবে দলে টিকে থাকার মন্ত্র তিনি শিখেছেন বিভাস স্যারের কাছ থেকে। সেদিনও ফোনে প্রিয় ছাত্রকে বলেছেন, হ্যাঁ রে, আর চারটি বল বেশি খেললেই তো ৪২টা ৫০ হয়ে যেত। সেটি করছিস না কেন! গত ম্যাচে অভিষেক সেটি করায় তৃপ্ত স্যার।
যে দলে সৌরভ, রিকি পন্টিংয়ের মতো বিশ্বের সেরা ক্রিকেটমস্তিষ্করা রয়েছেন, এমনকী ঋষভ পন্থের মতো দলনেতা রয়েছেন, সেই দলের প্রথম একাদশ গড়তে গেলে তাঁরাও সবাই মিলে ওপেনিংয়ে লিখছেন বাংলার এক ছেলের নাম, এটাই বাংলা ক্রিকেটের অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন। ছেলেবেলার কোচ ঠিকই বলেছেন, পেটে খিদে থাকলে এমনিতেই সাহস আসে, বড় আকাশ দেখা যায়!