আবহমান কাল ধরে বাঙালি শরতকালে দুর্গাপুজো করে। কিন্তু পুজোয় সরকারি সাহায্য দেওয়া প্রচলিত হয়েছে মাত্র বছর কয়েক। যত দিন যাচ্ছে, সাহায্যের পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার পুজো কমিটিগুলোকে দিয়েছিল ১০ হাজার টাকা করে। ২০১৯ সালে অনুদানের পরিমাণ বেড়ে হয় ২৫ হাজার। এবছর হয়েছে দ্বিগুণ। অর্থাৎ ৫০ হাজার।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পুজো কমিটির প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। সেখানে মমতা ঘোষণা করেন, রাজ্যের প্রায় ৩৭ হাজার পুজো কমিটিকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। কারণ হিসাবে বলেছেন, করোনা সংকটের মধ্যে অনেকে পুজোয় স্পনসর পাচ্ছেন না। তাই এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
করোনার সময় সারা দেশেই ব্যবসা বাণিজের অবস্থা খারাপ। এই অবস্থায় বিভিন্ন সংস্থা পুজো স্পনসর করতে উৎসাহী নাও হতে পারে। কিন্তু তা বলে রাজ্য সরকারকে স্পনসর করতে হবে কেন? স্পনসর করতে যে টাকাটা বেরিয়ে যাচ্ছে, তার পরিমাণ কম নয়। প্রায় ১৮৫ কোটি টাকা। এই অতিমহামারীর সময় এত টাকা দান-খয়রাতি করা কি শোভা পায়?
একটা প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠেছে, টাকাটা কারা পাবে? বড় বড় যে ক্লাবগুলো দুর্গাপুজো করে, তাদের কাছে ৫০ হাজার টাকা কিছুই নয়। তাছাড়া কোনও না কোনও স্পনসর তাদের জুটেই যাবে। তাদের টাকা দেওয়া মানে তেলা মাথায় তেল দেওয়া।
দেশে এখনও কোভিড পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পশ্চিমবঙ্গেও দৈনিক সংক্রমণ বেশ কয়েকদিন ধরে তিন হাজারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। অনেকে বলছেন দেশে সংক্রমণের হার নিম্নমুখী। তেমন হলে ভাল। কিন্তু অতিমহামারীর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ আসে। ইউরোপের অনেক দেশে যেমন এসেছে। আমাদের এখানেও করোনা সংকট আগামী দিনে কী রূপ নেবে বলা সম্ভব নয়।
এই অবস্থায় পুজোয় কি এত টাকা খরচ না করলেই চলছিল না? ১৮৫ কোটি টাকায় একটা হাসপাতাল তৈরি হতে পারত। চিনে করোনার সংক্রমণ যখন তুঙ্গে, তখন তড়িঘড়ি অস্থায়ী হাসপাতাল বানানো হয়েছিল। এখানে ভবিষ্যতে তেমন প্রয়োজন হতে পারে। সেজন্য কোষাগারে যথেষ্ট টাকা আছে তো?
এবছর নমো নমো করে পুজো হলেই ভাল হত। এখন কি উৎসবের সময়? নিছক নিয়মরক্ষার জন্য যেটুকু না করলে নয়, সেটুকু করলেই হত। অনেক ক্লাব ঠিক করেছিল ছোট করে পুজো করবে। কেউ ভেবেছিল, শুধু ঘটপুজো করবে। অনেকের বক্তব্য, পুজো না হলে মণ্ডপশিল্পী, প্রতিমাশিল্পী, আলোকশিল্পী ইত্যাদিরা লোকসানের মুখে পড়বেন। কিন্তু সরকার যখন পুজোয় টাকা দিত না, তখন কি পুজোর সঙ্গে যুক্ত নানা পেশার মানুষ উপার্জন করেননি?
এবার বড় করে পুজো হলে একটা বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। মমতা যে গাইডলাইন দিয়েছেন, তাতে পুজোয় মাস্ক, ফেস শিল্ড, স্যানিটাইজার ইত্যাদি ব্যবহারের কথা বলা আছে। কিন্তু বললেই তো হল না। একশ্রেণির মানুষ আছেন যাঁরা কিছুতেই সতর্ক হতে চান না। তাঁরা মাস্ক পরেন না। স্যানিটাইজারও ব্যবহার করেন না। পুজো মণ্ডপে এই শ্রেণির লোকজন ভিড় জমাবেন। তাতে নতুন করে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা।
সরকার এই বিপদগুলোর কথা বিবেচনা করেনি। কারণ ভোট বড় বালাই। ২০২১ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। এইসময় পুজোয় উৎসাহ দেওয়া শাসক দলের পক্ষে খুবই প্রয়োজন। নইলে বিজেপি তাদের বলবে হিন্দুবিরোধী। এমনিতে তারা মমতার নামে ওকথা বলে। পুজোয় সাহায্য না করলে আরও বেশি করে বলবে।
অতএব ভোটের কথা ভেবে তৃণমূল সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়কে পুজোয় উৎসাহ দিচ্ছে। যে কোনও তোষণই খারাপ। সংখ্যালঘু তোষণ যেমন খারাপ সংখ্যাগুরু তোষণও খারাপ। আমাদের দেশে ভোটের রাজনীতি এখন হয়ে উঠেছে তোষণের রাজনীতি। এই করোনা পরিস্থতিতে সেই রাজনীতির জন্য বড় মূল্য দিতে হতে পারে।