
শেষ আপডেট: 29 March 2020 10:53
জানি, খুব বিতর্কিত এই বাক্যটা, ভাইরাস জিতে গেছে!! একটু ব্যাখ্যা করি-- বিগত তিন মাসে সারা পৃথিবীব্যাপী এর বিস্তার ঘটেছে-- মানুষ থেকে মানুষে সরাসরি ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই এর জিত। মানুষের থেকে মানুষকে পৃথক করে রাখাটা যে প্রায় অসম্ভব, প্রতিদিন এক্সপোনেন্সিয়ালি বেড়ে চলা আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাই তার প্রমাণ! লকডাউন বা সোশ্যাল ডিস্টান্সিং এগুলো যতটা তাত্ত্বিক, ততটা বাস্তবিক নয়! একথা মানতে কষ্ট হবে, তবে সত্যি এটাই, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা সবাই এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হব! ভয় পাচ্ছেন-- পাবেন না, কারণ ততদিনে আপনার শরীর এই করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শিখে ফেলবে। সংক্রমণ আপনাকে বা আমাকে আক্রান্ত করতে পারবে না-- মৃত তো নয়ই! এই ভাইরাসটি পৃথিবীতে নতুন, নবীন প্রবীণ হয়ে উঠবে কয়েক বছরের মধ্যেই, এবং স্বাভাবিক নিয়মেই সে তার সমস্ত ভয়ঙ্করতা হারিয়ে ফেলবে! কিন্তু সে এসেছে থাকার জন্য এবং সারা পৃথিবীতে জানান দিয়েছে তার অস্তিত্ব! আগামী পৃথিবী তাই করোনাভাইরাসের মধ্যে ডুব দিয়ে থাকার পৃথিবী-- যেমন আমরা আরও লক্ষ লক্ষ ভাইরাসের মধ্যে ডুবে আছি-- জেনে বা না জেনে, কিছু কি এসে যায় তাতে!!
এবার পালা আপনাকে স্বস্তি দেবার! কেন আপনার অস্বস্তি সেটা খুঁজুন, একটু তলিয়ে ভাবুন-- কেটে যাবে সব ভয়! দেখুন ভয় কাটানোর সবচেয়ে সহজ রাস্তা-- তুলনামূলক শান্তি খোঁজা এবং এটা পরীক্ষিত মাধ্যম! যেমন আপনার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে আপনি ৫৭% মার্কস পেয়েছেন, মন খারাপ-- যেই শুনলেন কাছের বন্ধুটি ৪৮% পেয়েছে অমনি মনে পুলক ফিরে এল! এও খানিকটা সেরকম! আর একটি প্যারাসাইট এর নামের সাথে আপনাদের খুব পরিচয় আছে - প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরেম ( ম্যালেরিয়ার একটি ভয়ঙ্কর স্ট্রেন )। জানেন, এই প্যারাসাইটটি পৃথিবীতে কত মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী ? ঢোঁক গিলবেন না-- কয়েকশো কোটি মানুষ মারা গেছে এর প্রভাবে, যবে থেকে মানুষ এসেছে পৃথিবীতে! প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এর অস্তিত্ব-- বৈজ্ঞানিক ঔষধির সঙ্গে আমরা ওয়াকিবহাল প্রায় দু’শো বছর (কুইনাইন-- ১৮২০ সালে এর প্রথম বৈজ্ঞানিক নিষ্কাশন হয় সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে), একশো আঠারো বছর আগে (১৯০২) এর চিকিৎসা ও রিসার্চের ওপর নোবেল পুরস্কার পান-- ডক্টর রোনাল্ড রস-- তবু আজকের দিনে এই ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে ভাইরাসটির দাপট দেখলে চমকে যাবেন-- আজও প্রতিবছর দশ লক্ষাধিক মানুষ মারা যায় এর প্রভাবে, আমাদের সব জ্ঞান, বিদ্যা, সাবধানতা, সচেতনতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে! করোনার প্রভাবে ঘাবড়ে যাওয়া আমাদের মানায় না!
নতুন বলেই এত মাতামাতি, দাপাদাপি-- ভাইরাসের, আমার আপনারও! এই নতুন ভাইরাসকে বিজ্ঞান কীভাবে সামলাবে, বিজ্ঞানীদের চিকিৎসকদের ভাবতে দিন। থোড়াই কার্গিল যুদ্ধের সময় আপনি-আমি রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম! মনের গভীরে যেমন বিশ্বাস ছিল সেনাবাহিনীর ওপর, তেমনই ভরসা রাখুন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর! শুধুমাত্র সময়ের খেলা! এখন প্রশ্ন-- কতদিন সে সময়? জুলাই, অগাস্ট, বড়জোর সেপ্টেম্বর! কয়েকমাসের ব্যাপার, তারপর-- আর যেকোনও সাধারণ অসুখের মতোই এটা গণ্য হবে! দিনযাপনের চাপে ভুলেই যাব-- যেমন ভুলে যাই-- ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া বা সর্দি-জ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা! করোনা ছাড়াও রোজ পৃথিবীতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মারা যায়-- সেটাই দস্তুর! করোনা-মৃত্যুর আরও একটা কারণ-- এই স্বাভাবিকতাকে গ্রহণ করতে শিখতে হবে! এর জন্য প্যানিক করা আসলে নিজের মানসিক ভার বাড়ানো-- কেন বাড়াচ্ছেন?
আতঙ্কিত হতে বারণ করা মানে কিন্তু নিয়ম পালনে শিথিলতা এক্কেবারে নয়! এই যে লকডাউনের ফরমান, এর পিছনে অনেক গণিত, অনেক ব্রেক দ্য চেইনের সমীকরণ! হয়তো আরও কিছুদিন বাড়তে পারে এই গৃহবন্দি সময়-- কুছ পরোয়া নেহি-- দু’বেলা খাবার জুটে যাবে ঠিক! অন্যথায় বিপদ ভারী-- সকলে এতদিনে বুঝতে পেরেছি-- ইতালি, স্পেনের হাল দেখে! তাই স্ট্যান্সটা বদল করুন-- বুঝুন এখন গ্রাফটা উঠতি তাই সময় লাগবে নামতে-- মাস-দুয়েক তো বটেই! এই সময় যুদ্ধ চলবে জোরদার-- সারা ভারত জোরকদমে তার প্রস্তুতি নিচ্ছে! মনে রাখবেন মাত্র ১-২ শতাংশ আক্রান্ত হলেও সংখ্যাটা ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে, এতটাই জনবহুল আমরা! তার জন্য উপযুক্ত হাসপাতাল, পরিকাঠামো প্রস্তুত করা ও দৃঢ় চিত্তে লড়াইয়ের মানসিকতা হারালে চলবে না! বিপদ বড় সন্দেহ নেই-- কিন্তু আমরাও যে হেরে যাবার বান্দা নই সেটা এই নতুন ভাইরাস-শিশু বুঝুক! ভারতের মাটি দুর্জয় ঘাঁটি! তার ওপর প্রকৃতি আমাদের সহায়! গরম বাড়লে ভাইরাস কাবু হতে বাধ্য (কিছু রিসার্চের সমর্থন আছে আমার এই উক্তির পিছনে)-- সামনেই দাপুটে গরমের এপ্রিল-মে! তার ওপর আমাদের দুর্দম ইমিউনিটি ও জনসংখ্যায় যৌবনের প্রাবল্য! একটু দেরি হলেও এই একুশ দিন ব্যাপী (বাড়তেও পারে কয়েক হপ্তা) সংযম ও সামাজিক অসংঘবদ্ধতা অনুশীলনের সুফল! সর্বোপরি স্যানিটাইজার ও সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুঅভ্যেস গড়ে তোলার সার্বিক প্রচেষ্টা! তাছাড়া অগাধ ভগবৎ বিশ্বাস, যা আসলে আত্মবিশ্বাসের নামান্তর; তো আছেই!
এই দুর্দিন কেটে যাবে-- কিছু বিজ্ঞানী বলছেন, আমাদের টেস্টিং প্রোটোকল আরও ব্যাপক হওয়া উচিত ছিল। হয়তো ঠিকই বলছেন-- তবে যা হয়নি তা নিয়ে তো হাত কামড়ানোর মানে হয় না! আরও অধিক সচেতনভাবে ও আগে থেকে এয়ারপোর্ট আগত মানুষকে স্ক্রিন করে আইসোলেট করা উচিত ছিল-- কিন্তু ওই, চোর এখন পালিয়ে গেছে-- বুদ্ধি বাড়িয়ে লাভ নেই! এখন সময় ধৈর্য্য ধরার ও নিয়মালম্বী হওয়ার! আপনার হাঁচি যেমন একা আপনার নয়, তেমনই আপনার আতঙ্কিত হওয়াও আপনার একার নয়! নতুন ভাইরাস নতুনভাবে বেঁচে ওঠার মন্ত্র শেখাতে এসেছে-- যা আমাদের খুব চেনা গান-- একলা চলো রে! মজা এটাই, ডাক শুনে কেউ না এলেও মনখারাপের কিছু নেই, বরং সেটাই কাম্য! এই ঝড় কেটে যাবে-- ভারতবর্ষ আরও স্বাবলম্বী ও অগ্রগণ্য হয়ে উঠবে বিশ্বের মানচিত্রে! মাসখানেক নির্ভীক পরিণতমনস্কতা ও সচেতনতা দেখাতে পারলেই আমরা কিন্তু এগিয়ে যাব অনেকটা-- আসন্ন পরিবর্তিত বিশ্বের পরিপেক্ষিতে! জগৎসভা আমাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে! জয় হিন্দ!
অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়
(বায়োকেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর, ল্যাবরেটরি বিজ্ঞান সংক্রান্ত বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত।)
কভারের ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
পাঠকের চিঠি। আপনার সুচিন্তিত মতামত আমাদের মেল করুন, myletters.thewall@gmail.com-এ।