
শেষ আপডেট: 13 May 2020 05:00
তখনকার দিনে নিউজপেপার রিপোর্ট লিখতে হত। দুর্ঘটনার রিপোর্ট মানেই হালকা বা ভারী ট্র্যাজেডি। তারপর আছে ভূমিকম্প, সাইক্লোন। বিয়োগব্যথা থাকবেই। এদিকে আবার ‘সেনিসিটিভ’ বিলাস বাবাজীবন। বুঝেশুনে রিপোর্ট রাইটিং থেকে বিয়োগব্যথার কথা উড়িয়ে দিলেন হেডস্যার। বাস-ট্রেন দুর্ঘটনা, নৌকাডুবি— সব কিছুতেই শেষ পয়েন্টে কমেডি— ‘নো ডেথ অকার্ড’।
বিলাসের জন্য আমরা স্কুলে এক নন-ভায়োলেন্ট পরিবেশ পেয়ে গেলাম। স্কুলের বাইরে অবশ্য ছেলেপুলেরা ইচ্ছে করে মরার গল্প তুলে ধরত। বিলাস অঝোরে ঝরাত। সেই নিয়ে অন্যদের চলত হাসিঠাট্টা।
বয়েস একটু বাড়তেই অবশ্য গল্প গেল ঘুরে। প্রেমে পড়ল বিলাস। বেশ জমকালো প্রেম। আর তার পরেই কোনও এক ম্যাজিকে কেটে গেল তার কান্না রোগ।
কবিরা প্রেমকে কেন ‘মৃত্যুহীন’ বলেন তা কিছুটা অনুমান করেছিলাম এ গল্প শুনে। প্রেমের মৃত্যু হলে বিলাস ও পথ ভিজিয়ে ফেলত।
স্কুল পার হয়ে গেলাম কলেজে। তখন সবে ফার্স্ট ইয়ার। আবিষ্কার করলাম আর এক কান্না রোগীকে। এর সমস্যা অবশ্য মৃত্যু নয়।
রোগ ধরা পড়ল এক সরস্বতী পুজোর দিনে। চারপাশে খুশি খুশি পরিবেশ। বক্স বাজছে। হোস্টেলের ছাদে গিয়ে দেখি এককোণে বসে আছে বিশু। চোখে একটা দুঃখী ভাব।
“কী ব্যাপার রে বিশু, এখানে বসে?”
“ভেতরটা কেমন যেন হচ্ছে ভাই।”
“শরীর খারাপ লাগছে না কি? দুপুরে খিচুড়ি খেয়েছিস? অ্যাসিডিটি?”
“অ্যাসিড-গ্যাস না রে। গানগুলো যত শুনছি, ভেতরটা কেমন যেন উথালপাথাল করছে।”
গানে কান দিলাম। বক্সে বাজছে আধুনিক গায়কের গাওয়া পুরনো দিনের গান। মনে মনে ভাবছি, মনখারাপ কাটানোর কী নিদান দেওয়া যায়।
বিশু শুরু করল, “আসলে কী জানিস, ক'দিন ধরেই এমনটা হচ্ছে। ‘মায়াবী’ শব্দ শুনলেই নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারি না।”
ছড়িয়ে গেল খবর। ইন্টারেস্টিং কেস। জড়ো হল আরও কয়েকজন। বিশুকে ঘিরে ধরল সকলে। “মায়াবী শব্দ কী জিনিস ভাই?”
সকলের চোখ বিশুর চোখে। বিশু আমতা আমতা করে বলল, “কী বলি বল তো, যেমন ধর এই ‘খেলাঘর’, ‘নীড় ভাঙা ঢেউ’, ‘পারাপার’, ‘যমুনা’, ‘তুমি নেই’, ‘বিরহ’, ‘এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি’ — এইসব শব্দ। শুনলেই বুকে কে যেন হাতুড়ি পেটায়।
কারও এক হালকা হাসি পিচিক করে বেরিয়ে এল। ভেসে এল প্রশ্ন, “ছোট থেকেই এই অবস্থা না কি ভাই?”
“না, এই ক'দিন ধরেই হচ্ছে। শুধু গান নয়, কবিতা পড়লেও ওই এক অবস্থা। ভেতরে কী একটা কষ্ট। চোখে জলও চলে আসছে মাঝে মাঝে।”
আমাদের মধ্যে সমীর ছিল বিশেষ বোদ্ধা। হাত দেখতেও জানত। নিজেকে বলত ‘জ্যান্ত কিরো’। সে বিশুর হাতখানা তুলে নিল নিজের হাতে। তারপর লেন্স নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ। হাত দেখা হলে বিশুর চোখে চোখ মেলাল সে। ঘরে পিন-পতন নিস্তব্ধতা। হাতের রেখার পরে হয়তো চলছে কপাল-পাঠ। চারপাশে কৌতূহল।
সমীর বলল, “শোন বিশু, লক্ষণ ভাল নয়। সবই হল ঝড়ের পূর্বলক্ষণ। ঝড় কিন্তু উঠবেই ভাই। আর একেবারে লন্ডভন্ড করে দেবে তোকে। হয় ভগবৎ প্রেমে পাগল হবি, নয়তো মানব প্রেমে মাতাল। একটা কথা হলফ করে বলছি, তুই আর স্বাভাবিক থাকতে পারবি না ভাই।”
পাশ থেকে কে একজন বলল, “ আহা, ভয় না দেখিয়ে ভাল কোনও রাস্তা তো দেখা।”
সমীর বলল, “রাস্তা একটা আছে, আর সেটা হল ভুলেও কলেজের লেডিস হোস্টেলের রাস্তা যেন মাড়াস না।”
আড়ালে সমীর বলেছিল, “দিব্যদৃষ্টিতে দেখছি, ভালবাসার বারান্দায় বাঁধা এক ছাগল। তবে কার বারান্দায় বাঁধা আছে তা এখনও দেখতে পাচ্ছি না।”
দার্শনিক সমীর। নিশ্চয়ই তার তৃতীয় নয়ন ছিল। কিছুদিন পরে প্রকাশ পেল আসল কথা। লেডিস হোস্টেলের মিঠু নাকি বিশুর মন জুড়ে বসে। কিছু দূরেই লেডিস হোস্টেল। হোস্টেলের ছাদে বসে ‘এ কূল ও কূল’-এর রহস্য বোঝা গেল এতদিনে। ভালবাসা জমে যেতে সেরে গেল বিশুর উথালপাথাল। সেরে গেল কান্নারোগ।
কান্না-হাসির এই গল্প বলেছিলাম জীবনরসিক এক সুদর্শন মাঝবয়েসিকে। জীবনে সব ছিল। তবু সংসারে পা রাখেননি। কেন রাখেননি কেউ জানে না। একা থাকেন। সঙ্গী সিগারেট আর ভাল বই। গল্প শুনে বললেন, “বুঝলে ভায়া, প্রেম হল এক শোকসাগরের মতো। সে সাগরে ডুব দিলে ছোটখাটো শোক উবে যায়। দু’জনেরই আসলে বিষে বিষে বিষক্ষয় হয়ে গেছে। তাই মুছে গেছে কান্না।”
একটু সাহসী হয়েই বললাম, “প্রেম তো বোধহয় করেননি কোনওদিন। শোকসাগরের স্বাদ পেলেন কী করে?”
সেই দাদাটি হো হো করে হাসতে হাসতে বললেন, “পৃথিবীর সব সুন্দরীর বিয়ে হয়ে গেল। তাই প্রেম আর করা হল কই?”
আলো-আঁধারিতে দেখলাম, দাদাটির চোখের কোণ চিক চিক করে উঠল। না জেনে দুঃখ দিলাম কিনা কে জানে। নয়তো হাসির গপ্পো কেন কান্না টেনে আনে?
চিত্রকর: রাজ রায়
পড়ুন আগের পর্বগুলি...
দূরবীনে চোখ
আঁতেলনামা
লকডাউনে কল্লোলিনী