
শেষ আপডেট: 8 April 2020 16:29
তবে বরদাচরণই এ ব্যাপারে শেষকথা নন। আমার পাশের ফ্ল্যাটের মজুমদারবাবুকে দেখলে আপনারাও সেটা মেনে নিতেন। মজুমদার মশাইয়ের দুই ছেলে বাইরে বাইরে, ফ্ল্যাটে কেবল কর্তা-গিন্নি। দু’জনের দু’টি গামছা। বলা বাহুল্য, গিন্নিরটা নতুন এবং কর্তারটা সেকেন্ড হ্যান্ড। অর্থাৎ গিন্নির বাতিল করে দেওয়া গামছাখানা। সকালবেলা, তখনও পেট পরিষ্কার হয়নি, মজুমদার মশাই অসংখ্য ছিদ্র সম্বলিত গামছাখানা পরে ঘরের ভেতর অস্থির পায়চারি করছেন। গিন্নি সংসারের কাজে ব্যস্ত। মাঝেমাঝে কর্তার দিকে নজর পড়লে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিচ্ছেন। একসময় থাকতে না পেরে বলে উঠলেন, ‘ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন, বাথরুম যাবে তো যাও...।’
মজুমদারবাবু অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলেন, ‘দাঁড়াও... দাঁড়াও...।’
এরপর আরও কিছুক্ষণ কেটে গেছে। মজুমদারবাবুর একটা গোটা বিড়ি প্রায় শেষ হতে চলল। গিন্নি এবার ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘ছি ছি, তোমার সর্বস্ব দেখা যাচ্ছে... লজ্জায় তাকাতে পর্যন্ত পারছি না...।’
মজুমদারবাবু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। নির্বিকারভাবে গামছাখানা একবার দেখে বললেন, ‘দাঁড়াও ওটিপি আসুক...।’
‘ওটিপি! সে আবার কী?’
‘ও তুমি বুঝবে না, অনলাইন কেনাকাটায় দরকার পড়ে। এই ফুটোফাটা গামছা ছাড়া ওটিপি ঠিকমতো রিসিভ করা যাবে না--।’
বলতে বলতেই মজুমদার মশাইয়ের ভুঁড়ি ও ফ্ল্যাট কাঁপিয়ে সশব্দে ওটিপি আছড়ে পড়ল। তিনিও কোনওমতে বিড়িটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে, গামছার গিঁট আলগা করতে করতে দৌড়লেন বাথরুমের দিকে।
আমাদের স্টেশনের গ্যাংম্যান বিন্দুকে দেখেছি, কেবলমাত্র একখানা গামছা সম্বল করেই দূরদূরান্তে চলে যেতে। হাতে না ব্যাগ, না কোনও থলে-টলে। গামছার খুঁটে বাঁধা একঠোঙা ছাতু। রাস্তায় পুকুর-টুকুর দেখলে, ছাতুর ঠোঙাটা সাবধানে কোনও গাছের নীচে রেখে সে পুকুরে কয়েকটা ডুব দিয়ে নেয়। তারপর গামছা নিঙড়ে শুকিয়েও নেয়। শুকনো গামছায় ছাতু ঢেলে খানিক জল মিশিয়ে, মেখে দিব্বি খেয়ে নেয়। এরপর ফের গামছাটা কেচে, শুকিয়ে, টানটান করে মাটিতে পেতে ফার্স্টক্লাস দিবানিদ্রা।
তবে মজুমদারবাবুর গল্প এখনও শেষ হয়নি। তিনি যখন স্নানটান সেরে নিজস্ব গামছাখানা পরে ব্যালকনি থেকে সূর্যপ্রণাম সারেন, আশপাশের ফ্ল্যাটের কেউ আর বের হতে সাহস করে না।
কিন্তু হলে কী হবে, গামছা আটকে যেন গামছাতেই-- একদিন নিমীলিত নয়নে তিনি মন্ত্রোচ্চারণ শেষ করে চোখ মেলে দেখেন, কোথায় সূর্য! বদলে সামনের আটতলার ফ্ল্যাটে ঝুলছে তারই মতো একখানা শতশ্ছিদ্র সম্বলিত গামছা।
আমাদের ঠেকের সুপ্রাচীন মদ্যপ বংশীবাবু। আগের রাতে বউয়ের কাছে বেধড়ক ঝাড় খেয়ে সখেদে বলেছিলেন, ‘অনেক ভেবে দেখেছি, পুরুষমানুষ মরে গেলে পরের জন্মে গামছা হয়-- কী টাফ লাইফ! একটুও সহানুভূতি নেই রে...।’
গামছা-কাহিনি শেষ করব এক উদ্যোগী বৃদ্ধ শ্যামবাবুকে দিয়ে। রিটায়ারের পর মাত্র দু’শো টাকা দিয়ে জনৈক পুরুতমশাইয়ের কাছ থেকে তিনি দশখানি গামছা কিনে নিলেন। পুরুতমশাই খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত গামছা কী করবেন?’
শ্যামবাবু সেই মুহূর্তে কোনও জবাব দিলেন না ঠিকই, তার পরের দিন তাকে দেখা গেল দশখানা গামছা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের পাবলিক শৌচালয়ের সামনে। না, বিক্রি করতে নয়, ভাড়া দিতে। পনেরো মিনিটে একটাকা।
অভিজ্ঞজন মাত্রই জানেন, বাসে ওঠার পূর্বমুহূর্তে অনেকেরই পেট যেন একটু মোচড় দেয়। ঈশানকোণে মেঘ দেখে ইচ্ছে হয় ব্যাপারটা মিটিয়ে নিতে। স্রেফ একখানা গামছার অভাবে তা আর হয়ে ওঠে না।
শ্যামবাবুর ব্যবসা ভালই চলছিল। কোনও কাস্টমার কমপ্লেন নেই। কেবল একদিন, জনৈক কাস্টমার বললেন, ‘দু’দিন ধরে কিচ্ছু হচ্ছে না। আপনি বরং দু’টাকা রাখুন, আমার একটু দেরি হতে পারে...।’
প্রায় পঁচিশ মিনিটের মাথায় ভদ্রলোক মাথা নাড়তে নাড়তে বেরিয়ে এলেন, ‘নাঃ, আজও বিশেষ কিছু হল না--।’
কাস্টমার খুশি না হলে কার আর ভাল লাগে! শ্যামবাবু বললেন, ‘কেন, আপনাকে তো পয়া গামছাখানাই দিয়েছিলাম। এই গামছা সকাল থেকে যতবার গেছে পাঁচমিনিটের বেশি সময় নেয়নি...।’
ভদ্রলোক দুঃখিত হয়ে বললেন, ‘কী আর করব, সবই ভাগ্য! একেই বোধহয় বলে, এক গামছায় পৃথক ফল!’
আরও বারোয়ারি নকশা...
বিজ্ঞাপন লাইভ
সিনিয়র সিটিজেন
প্রেমপত্র
স্বাস্থ্যবিধি
প্রশ্নোত্তরে বিবাহিত জীবন
লুজ ক্যারেক্টার