
শেষ আপডেট: 5 April 2020 09:57
কম বয়েসে মানুষের অভিজ্ঞতা কম থাকে। আমারও ছিল। ‘গোরু’ শব্দটি যে কালে এ দেশে মারাত্মক মর্যাদা পাবে এবং বহু অর্থে ব্যবহৃত হবে তখন বুঝিনি। সেই অপরিপক্ক বয়েসে সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, ওই বেয়াড়া ম্যাজিশিয়ানের মাথা ভেঙে ঘিলু বের করে ছেড়ে দিই। কিন্তু আমার প্যাংলা শরীর। মারপিটে কারও সঙ্গেই পেরে উঠব না জানি। অতএব রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া গতি খুঁজে পেলাম না কোনও।
‘মেয়েরা বোকা নয়’— ম্যাজিশিয়ানের এই কথাটা অবিশ্যি আমি তখনও মানতাম, এখনও মানি।
পড়ার কথা নয় বলেই আমার প্রেমে কেউ পড়েনি কখনও। কিন্তু স্বভাবদোষে বসন্ত এলেই আমার মন উড়ু উড়ু হয়ে যায়। বাড়ির লোকজনকে তখন কেমন যেন অচেনা মনে হতে থাকে। মনে হয়, নিজেকে বিলিয়ে দিই। বসন্ত এলেই একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে আমার। ইচ্ছে করে, রাত্তিরবেলা ফাঁকা মাঠে শুয়ে আকাশের তারা গুনি একা একা। মাঝে মাঝে ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে যেতেও শখ হয় ঘর ছেড়ে বিবাগী হয়ে।
এ বছরেও তেমনটাই হচ্ছিল। কিন্তু বাধ সাধল এই কমপালসারি কোয়ারেন্টাইন। চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে হাঁফ ধরে যাচ্ছে। চার পাশে চেনা মুখের জঙ্গল। আয়নায় নিজের মুখের দিকে চোখ পড়লেও বিরক্তি আসে আজকাল। বাধ্য হয়ে বিকেল যখন সন্ধের দিকে গড়াতে শুরু করে, ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়াই। আমার বাড়ির সামনেই রাস্তা। রাস্তার পাশেই একচিলতে ফাঁকা মাঠ। মাঠের একধারে কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছের মাথায় লালচে রঙ ধরেছে সবে। এই ধু ধু নির্জন, হঠাৎ একা হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে আমি আর সেই গাছটি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। গাছ নির্বিবাদী। তার থেকে সংক্রমণের ভয় নেই। তার সামনে দাঁড়াতে মাস্কে মুখ ঢেকে ফেলতেও হয় না আমাদের।
আজ সেই গাছের তলায় দেখি আমাদের পাড়ার নীপা দাঁড়িয়ে আছে। হলুদে আর সবুজে ছাপানো সালোয়ার কামিজে কী মিষ্টি যে দেখাচ্ছে তাকে! কপালে ছোট টিপ, ঠোঁট রাঙিয়েছে যত্ন করে।
নীপা আমারই আসার পথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি রাস্তা পেরিয়ে মাঠে নামতেই নীপা লঘু পায়ে এগিয়ে এল। মাথা নিচু করে মৃদু গলায় বলল, ‘তোমার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছি। জানি তুমি রোজ এই সময়ে একা একা গাছের কাছে আসো।’
‘আমার জন্যে?’ অবাক হয়ে বলি।
‘হ্যাঁ তোমারই জন্যে’, নীপা আমার এক্কেবারে কাছে সরে আসে।
বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতির ঢেউ উঠছে। তিরতির করে ঠোঁট কাঁপছে আমার। মনে মনে বলছি, ‘বড্ড দেরি করে ফেলেছ নীপা। তোমার বন্ধুদের অনেকেই আমাকে কাকু ডাকে আজকাল...’
নীপা খপ করে তার নরম উষ্ণ হাত দিয়ে আমার কনুয়ের কাছটা চেপে ধরল, ‘তুমি বড্ড ভাল, আমি জানি, তোমাকেই একমাত্র ভরসা করা যায়...’
‘কী হয়েছে নীপা?’ প্রায় ফিসফিস করে আমি বলি।
‘এতদিন ধরে একটানা লকডাউন ভাল লাগে, তুমি বলো? বাড়ি থেকে বেরোতেই পারছি না। না আমি, না মুকুল। কত্তদিন দেখিনি ওকে...’ কথার শেষটায় মেনি বিড়ালের মতো আদুরে আর ঘড়ঘড়ে হয়ে উঠল যেন নীপার গলাটা।
‘মুকুল— ’
‘আমার বি এফ গো... মাই সুইট গাই...’ বলতে বলতেই ঝপ করে ইয়াব্বড় স্মার্ট ফোনের লক খুলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল নীপা। ‘সারাক্ষণ বাড়িতে বসে আছে। বাবা-মা রয়েছে বলে ভিডিও কল করতে পারছি না। ওর বাবা-মা হেবি কুচুটে জানো তো, ওর ফোন এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কার ফোন জানা চাই...’
‘আমি কী করব তার জন্যে?’ এইবার বিরক্ত হয়ে বলি।
‘আমি ভিডিও কল করব। আশপাশে কেউ এসে গেলেই তোমাকে ইশারায় ডেকে নেব। ঝপ করে নিজের হাতে ফোনটা নিয়ে যা হোক কিছু কথা বলে ম্যানেজ করে দিয়ো তুমি। ব্যস, ওর বাড়ির লোক ভাববে একটা ছেলেই ফোন করেছিল ওকে।’ বলেই আমার ওপরে একেবারে ঢলে পড়ল নীপা, ‘এইটুকুই তো। পারবে না কাকু?’
কাকু! কাকুই! নীপাও! বিরক্ত হয়েও কিছুই বলতে পারলাম না। আমার জীবনে বসন্ত ফিকে হয়ে এলেও নীপাদের বসন্ত তো এখনও রঙিন, এখনও উজ্জ্বল। টানা এতদিনের লকডাউন সত্যিই ওদের বসন্ত কেড়ে নিয়েছে এ বছর।
কোভিড ভয়ংকর শুধু নয়, বড় বিচ্ছিরি রকমের বেরসিকও...
আরও পড়ুন...
গৃহবন্দির জবানবন্দি
গৃহবন্দির জবানবন্দি ২