শেষ আপডেট: 21 April 2020 12:22
বাড়িতে অন্তরিন থাকার সময় সাবধানে থাকাই নিরাপদ। এই একমাস ঘরে থেকে শিখেছি, যত মস্ত বাড়িই হোক আর সে বাড়ির যে প্রান্তে গিয়েই আপনি লুকোন না কেন, একজোড়া চোখ সবসময় আপনাকে দক্ষতার সঙ্গে পাহারায় রেখেছে। বেশি চনমন করলেই বিপদ। একগুচ্ছ অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে আপনাকে। এই চাঞ্চল্য যে আপনার স্বভাবসিদ্ধ, এ চিত্তচাঞ্চল্য যেকোনও ব্যক্তিবিশেষের (পড়ুন, অন্য নারী) জন্যে নয় তা প্রমাণ করতে কালঘাম ছুটে যাবে আপনার। সে ঝক্কিতে গিয়ে অহেতুক সুগার, প্রেসার বাড়িয়ে না ফেলে বরং বাসন-টাসন মেজে এসে গিন্নির পাশে ঘন হয়ে বসে তাঁর রূপের প্রশংসা করুন আন্তরিক কণ্ঠে। গলায় পরম বিস্ময় এনে জিজ্ঞেস করুন, এত পরিশ্রমের পরেও কী করে এমন সোনার মতো ঝকমক করতে পারেন তিনি!
এ কথায় মৃদু লাজুক প্রতিবাদ উঠবে। যদিও সে প্রতিবাদ আদপে সানন্দ সম্মতিই। আপনি সেই ছদ্ম প্রতিবাদে দৃঢ় আপত্তি করে বলুন, বাইরে বের হওয়া নেই বলেই বোধহয় তাঁর চামড়ায় আর কোনও ট্যান নেই।
চামড়ায় ট্যান মানে মনেও কালচে রঙ ধরা। আর মনের সেই কালো রঙ, কুচকুচে বৃষ্টির মতন একমাত্র আপনাকেই ভেজাবে, আপনি জানেন। কাজেই তাঁর এই খাদহীন ঝকমকানির তত্ত্ব একবার যদি তাঁকে বিশ্বাস করাতে পারেন এই বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন আপনার কাছে শুধু সহনীয়ই নয়, মোহময় হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। হয়তো সংসারে আপনার কাজের বোঝাও খানিক লাঘব হতে পারে। বাসন মাজায় মিলতে পারে ছুটি, রান্নায় নিত্যনতুন এক্সপেরিমেন্টের ছটা আপনার রসনাকে তৃপ্তি দেবে। এমনকি অপ্রয়োজনে দু-একবার বাজারে
যাবার অছিলায় বাড়ির একই মুখ বার বার দেখার ক্লান্তি ঘোচাতে আপনি নিরাপদে বাইরে বেরিয়ে পড়তেও পারেন। অপরপক্ষ বাধা দেবে না।
আমি তেমনই অমোঘ উপায়ে হাতে বাজারের থলি নিয়ে সাতসকালে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলাম। রোদ্দুর এখন সহনশীল। দূষণহীন আকাশ আরও ঝকঝকে নীল। প্রশ্বাসে অতিরিক্ত অক্সিজেন ঢুকছে শরীরে। গতায়ু বসন্তেও ফুলগাছগুলি ফুলে ফুলে ভরে আছে। পাখি এসে বসছে গাছে। প্রজাপতি উড়ছে। মৌমাছিরা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে এ গাছ ও গাছ উড়ে বেড়াচ্ছে মনের আনন্দে। যেন প্রকৃতিজোড়া খুশির উদযাপন। কিন্তু সেই বর্ণিল আয়োজনে মানুষ কই, মানুষ? এমন অলৌকিক সুন্দর সকালও কি স্বভাব বৈপরীত্যে কলহপ্রিয় এবং ঈর্ষাকাতর মানুষ জাতিকে একে অপরের থেকে দূরেই সরিয়ে রাখবে? ভেবেছিলাম যে বৈচিত্র এবং বৈপরীত্য আমাকে ক্লান্ত করেছে এতদিন, আমাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে মনে মনে, আজ তার থেকে মুক্তি হবে আমার। কিন্তু কোথায় সেই মুক্তি?
রাস্তায় চলতে চলতে আরও খানিক পথ পেরিয়ে গেলাম। মাথা তুলে চাইলাম সামনের দিকে। হ্যাঁ, ওই তো ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কিছু মানুষ। একে অন্যের থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে আমারই মতো মুখে মুখোশ এঁটে নিজেদের পথে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। গন্তব্য না জেনেই। হয়তো অপ্রয়োজনেও। বৈপরীত্য নয়। অনন্ত ঐক্যের সুতোয় বাঁধা মানুষ। যারা প্রত্যেকে একা। যাদের প্রত্যেকের মুখ মুখোশে ঢাকা।
অচানক আমার বুক ভারী হয়ে উঠল। একটা অদৃশ্য ভাইরাসের এত ক্ষমতা যে সে আমাদের পরস্পরের থেকে এত দূরে সরিয়ে দেবে, প্রত্যেকের মুখে পরিয়ে দেবে অনিবার্য রঙিন মুখোশ?
আমি মাথা নাড়লাম। উঁহু। কোভিড নাইন্টিন আসলে এক আশ্চর্য আয়না। মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল আগেই। আমরা মুখোশের আড়ালে মুখও ঢেকেছি বহু আগেই। সে শুধু সামনে এসে জগতের সামনে এই সত্যকে নগ্ন করেছে মাত্র।
চিত্রকর: রাজ রায়
জয়দীপ চক্রবর্তীর ‘বারোয়ারি নকশা’র আগের পর্বগুলি...
গৃহবন্দির জবানবন্দি
গৃহবন্দির জবানবন্দি ২
গৃহবন্দির জবানবন্দি ৩
গৃহবন্দির জবানবন্দি ৪
গৃহবন্দির জবানবন্দি ৫
গৃহবন্দির জবানবন্দি ৬
গৃহবন্দির জবানবন্দি ৭
গৃহবন্দির জবানবন্দি ৮
গৃহবন্দির জবানবন্দি ৯
গৃহবন্দির জবানবন্দি ১০