ওইভাবে বলা মোটেই উচিত হয়নি প্রধানমন্ত্রীর
শুক্রবার সর্বদল বৈঠকে বিরোধীরা সকলেই উপস্থিত ছিলেন। মন দিয়ে তাঁর ভাষণ শুনছিলেন। আশা করা গিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী সারগর্ভ কিছু বলবেন। আগামী দিনে চিন যদি ফের বেয়াদবি করে, কীভাবে ঠেকানো যাবে তা নিয়ে আলোচনা করবেন। বিরোধীদের মতামতও ধৈর্য ধরে শুনবেন। কিন্তু তা না করে মোদী বলে বসলেন, "ওখানে আমাদের সীমান্ত পেরিয়ে কেউ ঢোকেনি। ওখানে আমাদের এলাকায় কেউ ঢুকে বসেও নেই”।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলায় চিনারা খুব খুশি হয়েছে। চিনের কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত 'গ্লোবাল টাইমস' পত্রিকায় লেখা হয়েছে, মোদী যা বলেছেন, তাতে ভারতের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থীরা আর মুখ খুলতে সাহস পাবে না।
রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তুলেছেন, চিনারা মোদীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ কেন? এই প্রশ্ন তিনি তুলতেই পারেন। গণতন্ত্রে বিরোধীদের কাজই হল সরকারকে প্রশ্ন করা। সরকারের ভুলভ্রান্তিগুলো নিয়ে মুখর হওয়া। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে দিয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। বর্ষীয়ান মনমোহন বলেছেন, মোদীর উচিত ভেবেচিন্তে কথা বলা। আমরা এখন কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন, তাতে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ প্রভাবিত হবে।
লাদাখ সংকটে বিরোধীরা এখনও পর্যন্ত ঠিকঠাক কর্তব্য পালন করেছেন। শুধু কংগ্রেস নয়, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি বা বহুজন সমাজ পার্টির মতো বিরোধী দল প্রকাশ্যে সরকারের নিন্দা করেনি। বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে যেভাবে সকলের একজোট হয়ে সরকারের পাশে দাঁড়ানো উচিত, তা দাঁড়িয়েছে। উল্টে মোদীই অতিনাটকীয় বক্তৃতা দিতে গিয়ে নিজের সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছেন।
এহেন নাটকীয়তা বর্তমান শাসক শ্রেণির একাংশের মজ্জাগত। আজ পর্যন্ত দেশে যতজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, মোদী তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শোম্যান। অতীতে দেখা গিয়েছে, ভোটের সময় তিনি প্রচারের সবটুকু আলো টেনে নেন নিজের ওপরে। বিরোধীদের একাই দুরমুশ করেন। বিশ্ব যোগ দিবসকেও তিনি বানিয়ে ফেলতে পারেন গ্র্যান্ড এক্সিবিশন। নিজের জন্মদিন পালন করেন ক্যামেরার সামনে। স্বচ্ছ ভারত অভিযানে নিজেই নেমে পড়েন ঝাঁটা হাতে। এমনকি ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড শো-তেও তাঁকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। লাদাখ সংকটের সময়েও তাঁর নাটক করার অভ্যাস বজায় আছে ষোল আনা। সর্বদলীয় বৈঠকে তিনি সকলকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, তাঁর মতো ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতিওয়ালা প্রধানমন্ত্রী থাকতে বিদেশিদের সাহসই হবে না ভারতে ঢুকে পড়ার।
মোদী নিজেও হয়তো পরে বুঝেছেন, ওকথা বলা উচিত হয়নি। যদি ভারতের অভ্যন্তরে কেউ না-ই ঢুকে থাকে, তাহলে দু'দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে মারামারি হল কেন? কেনই বা আমাদের ২০ জন সৈনিক প্রাণ হারালেন?
শুধু নাটক নয়, মোদীর ওকথা বলার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। তিনি এও বলেছেন, আগের জমানায় চিনারা যখন তখন ভারতের মধ্যে ঢুকে পড়ত। কেউ তাদের বাধা দিত না। এখন বাধা দিচ্ছে বলেই সংঘর্ষ হচ্ছে। তার মানে কংগ্রেস সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উদাসীন ছিল।
জনসভায় রাজনৈতিক ভাষণ দেওয়ার সময় বিজেপি নেতারা এই ধরনের কথা হামেশাই বলে থাকেন। মানুষকে বোঝাতে চান, তাঁরাই একমাত্র জাতীয়তাবাদী। বিরোধীরা দেশের শত্রু, পাকিস্তানের চর ইত্যাদি। মেঠো সভায় যেকথা মানায়, সরকারের প্রধানের মুখে তা মানায় না। বিশেষ করে এই সংকটের সময়ে। তা ছাড়া কথাটা ঠিকও নয়। মোদীর আমলে অনুপ্রবেশ আগের চেয়ে কমেছে এমন প্রমাণ নেই। কাশ্মীরে ও অন্যত্র জঙ্গি কার্যকলাপও কমেনি। এই করোনাভাইরাস অতিমহামারীর মধ্যেও সেখানে জঙ্গিদের সঙ্গে প্রায় রোজই সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ হচ্ছে। পাকিস্তানও প্রায়ই গোলাবর্ষণ করছে সীমান্তের ওপার থেকে। তার ওপরে লাদাখের গালওয়ান নদীর তীরে মারমুখী চিনা ফৌজের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে আমাদের সেনাকে।
চিনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং-এর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর তথাকথিত ‘বন্ধুত্ব’ সুবিদিত। একবার দু'জনকে দোলনায় বসে দুলতেও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। মোদীর সঙ্গে গলাগলির ফাঁকে জিনপিং ছুরি শানিয়েছেন। তার প্রমাণ একবার পাওয়া গিয়েছিল ডোকলামে। ফের পাওয়া গেল লাদাখে।
ফলে মোদী জমানায় গত দশ বছরে বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল হয়েছে বা তার অগ্রগতি হয়েছে মোটেই বলা যায় না। বরং পিছনে তাকালে দেখা যায়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছিল রাজীব গান্ধী জমানায়। '৬২-র যুদ্ধের পরে দীর্ঘদিন ভারতের সঙ্গে চিনের বিশেষ সম্পর্ক ছিল না। '৮৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী চিন সফর করেন। চিনের সর্বময় কর্তা দেং শিয়াও পিং-এর সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। তারপর থেকে ভারত-চিন সম্পর্কে শীতলতা কাটতে থাকে। সীমান্তেও উত্তেজনা কমতে শুরু করে।
এরপর ইউপিএ ওয়ান সরকারের আমলে ভারত ও চিন কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্কে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তাঁর বেজিংয় সফরে এ সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সাক্ষর হয়েছিল। এমনকি যৌথ সামরিক মহড়া শুরু হয় দু’দেশের সেনাবাহিনীর।
কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর দ্বিতীয় মেয়াদে ভারত-চিন সম্পর্ক শুধরোবে বলেই আশা ছিল। কারণ, বর্তমান বিদেশ মন্ত্রী এস জয়ঙ্কর অতীতে বেজিংয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ছিলেন। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভাল। তা ছাড়া বিদেশ সচিব ছিলেন জয়শঙ্কর। তাই আশা ছিল, নয়াদিল্লির কূটনীতি এ বার আরও ক্ষুরধার হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার পর দেখা গেল সেই পোড় খাওয়া দুঁদে কূটনীতিক বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গেই তাঁর মতের ফারাক হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় কোথাও যেন একটা অজিত ডোভালের মতো একজন কট্টরপন্থী প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধানের ছায়া দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানে সার্জিকাল স্ট্রাইক বা বালাকোটে বায়ুসেনা হামলা যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত বলেই ধারনা।
সুতরাং মোদ্দা কথা হল, প্রধানমন্ত্রীকে এই সংকটে যোগ্য ব্যক্তির পরামর্শ শুনতে হবে। একটা কথা বুঝতে হবে, ভোটের সময় নাটুকেপনা কাজে লাগতে পারে, কিন্তু বিদেশনীতিতে তা চলে না। রাজনীতিও চলে না। সরকারের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে নরেন্দ্র মোদী যত তাড়াতাড়ি এই কথাটা বোঝেন, ততই দেশের মঙ্গল।