
শেষ আপডেট: 26 September 2020 07:30
যে ব্যক্তির মূর্তি তিন তিন বার তিনটি পৃথক সময়ে ভেঙেছে সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শের রাজনৈতিক দল, বলাই বাহুল্য, সে ব্যক্তিকে খুব সহজে কোনও খোপে ফেলা যায় না৷ নারীমুক্তির অগ্রপথিক হিসেবেও সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নির্দিষ্ট খোপে ফেলা মুশকিল। ব্যক্তি বিদ্যাসাগর সীমাবদ্ধ ছিলেন কি না তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, তাঁর সমকালেরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। মনে রাখতে হবে, বিদ্যাসাগর এমন এক সময় কাজ করছিলেন, যখন 'ইয়ং বেঙ্গল'-এর প্রবল বিদ্রোহ ও চিৎকারে তাদের অপরতাই প্রকট হচ্ছিল।
বিদ্যাসাগরের মূল নারীমুক্তি প্রজেক্ট ছিল দুটি, বিধবাবিবাহ ও নারীশিক্ষা। বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের চেষ্টাও তিনি করেছেন। কিন্তু কার্যকরী আইন-টাইন করে উঠতে পারেনি।
তাঁর প্রথম সমাজ-সংস্কারমূলক প্রবন্ধটি অবশ্য 'বাল্যবিবাহের দোষ'৷ সেখানে বালিকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দাম্পত্য সম্পর্কের অসম্পূর্ণতা ইত্যাদি সেকিউলার যুক্তিই সাজাচ্ছেন সংস্কৃত পণ্ডিত। বিধবাবিবাহের কালে যেমন করবেন, তেমনভাবে শ্লোক খুঁজতে বসছেন না। 'এজ অফ কন্সেন্ট' আইন শেষপর্যন্ত চালু হয়েছিল ১৮৯১ সালে, বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর চার মাস আগে৷
বহুবিবাহ রোধের চেষ্টা করেন তিনি আরও পরিণত বয়সে। ১৮৭১ ও ১৮৭২ সালে প্রকাশিত হয় 'বহুবিবাহ রদ হওয়া উচিত কিনা এতদবিষয়ক প্রস্তাব' (পর্ব ১ ও ২)। ততদিনে অবশ্য বাস্তববুদ্ধি প্রয়োগ করেছেন, গোঁড়া হিন্দু সমাজকে জবাব দেওয়ার প্রয়োজনে লেখায় শাস্ত্রালোচনাও এসেছে। কিন্তু ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ইংরেজ সরকার ভারতীয়দের বিবাহনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে আর সহজে রাজি হল না।
অন্যদিকে, অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবীও মনে করতেন, শিক্ষার প্রসার ঘটলে বহুবিবাহ এমনিই লোপ পাবে৷ এই সংক্রান্ত কমিটিতে বিদ্যাসাগর ছাড়া অন্য তিন বাঙালি (সত্যশরণ ঘোষাল, রমানাথ ঠাকুর ও দিগম্বর মিত্র) সেই মতই প্রকাশ করেন৷ একমাত্র বিদ্যাসাগরই আইন করে বহুবিবাহ রদ করার প্রস্তাবে অনড় থাকেন, তাই নোট অফ ডিসেন্ট দেন। অর্থাৎ তিনি কিন্তু বহুবিবাহ-বিরোধী শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা করেই ক্ষান্ত হননি। আইন প্রণয়নে অন্যরা পিছপা হলে তিনিই বরং নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছিলেন।
এইবার তাঁর দুটি আপাতসফল প্রজেক্টে আসা যাক। বিধবাবিবাহ সম্পর্কে তিনি প্রথম লেখাটি লেখেন ১৮৫৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে৷ 'বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা'-- এই নামেই তা প্রকাশিত হয় 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায়৷ প্রথম পর্বটির পর শহর কলকাতার থেকে পেয়েছিলেন প্রচুর তিরস্কার, অপমান, বিদ্রুপ৷
প্যামফ্লেটে ছেয়ে গেছিল শহর৷ সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ আসছিল সংস্কৃত পণ্ডিত মহল থেকে৷ ১৮৫৫ সালে যখন 'বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদবিষয়ক প্রস্তাব' অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্ব লেখেন, তখন নিজের বক্তব্যের সপক্ষে আরও বেশি শাস্ত্রীয় ব্যখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। 'পরাশর সংহিতা' থেকে যে উদ্ধৃতি বের করেন খুঁজে, তা হল-- 'নষ্টে মৃতেবপ্রবজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।/পঞ্চিস্বাপৎসু নারীনাং পতিরন্যো বিধীয়তে'।
অক্ষয়কুমার দত্ত, 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকার সম্পাদক, বিদ্যাসাগরের সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার বিরোধী ছিলেন। একই অবস্থান ছিল রাজেন্দ্রলাল মিত্রের৷ তাহলে বিদ্যাসাগর কেন শাস্ত্র নিয়ে মাথাব্যথা করছিলেন?
উত্তর আছে সমকালেই, তার আগে সেই সমকালে বিধবাদের অবস্থাটি বোঝা দরকার। ১৮৫৬ সালের আগে বিধবাদের অবস্থা কেমন ছিল? 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকা প্রায়ই প্রকাশ করত, বিধবাবিবাহ প্রথার অনুপস্থিতিতে কীভাবে বিধবারা বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছেন। 'বিদ্যাদর্শন' প্রকাশ করেছিল কলকাতার এক বিধবার চিঠি। সেখানে নিজেকে কুলীন ব্রাহ্মণের বিধবা বলে পরিচয় দেওয়া এক বেশ্যা বলেন, বেশ্যালয়ে এসে তিনি তাঁর গ্রামের আরও জনা কুড়ি বিধবার দেখা নাকি পেয়েছিলেন। যে জগদুর্লভ চৌধুরীর বাড়িতে কলকাতায় এসে বালক বিদ্যাসাগর ঠাঁই পেয়েছিলেন, তাঁর বিধবা বোন রায়মণির ক্লেশের জীবনও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল৷
অথচ বিধবাবিবাহ প্রচলন করার চেষ্টা কিন্তু নতুন ছিল না৷ অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকার বিক্রমপুরের রাজা রাজবল্লভ নিজের বিধবা কন্যার বিবাহ দিতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মহারাষ্ট্র ও মাদ্রাজেও এরকম কিছু বিচ্ছিন্ন ও ব্যর্থ প্রচেষ্টার কথা শোনা যায়। মতিলাল শীল নামে এক বড়লোক বিধবাকে বিয়ে করলে ২০০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন, সেও বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত রচনার কিছু আগে৷ শ্যামাচরণ দাস নামে এক বিত্তবান কামারের বিধবা মেয়ের বিবাহ দিতে প্রথমে সম্মত হয়েও, পরে পিছিয়ে আসেন পুরোহিতরা৷ এমতাবস্থায় ১৮৪২ সালেই 'বেঙ্গল স্পেকটেটর' আভাস দেয়, 'পরাশর সংহিতা'-য় এমন কিছু থাকতে পারে যাতে বিধবাবিবাহের বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
সেই সময় বিধবা কন্যা ও তাঁদের পিতাদের দুর্গতির কথা থাকত বিধবাবিবাহের সমর্থকদের কাতর আর্জিতে। আর 'ইয়ং বেঙ্গল'-এর যুক্তিপূর্ণ লেখাগুলিতে ছিল নারী-পুরুষ সমানাধিকারের যুক্তি ৷ এখানে জানা দরকার, বিদ্যাসাগর ভারতের প্রথম বিধবাবিবাহটি দেননি। প্রথম বিধবা বিবাহ নিজেই করেছিলেন ইয়ং বেঙ্গলের দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়। বর্ধমানের রাজার বিধবা বসন্তকুমারীকে৷ অর্থাৎ ইয়ং বেঙ্গল যে সামাজিক স্তরে ওঠাবসা করে, তাতে তারা বিধবাবিবাহ করে ফেলতেই পারে, আইন প্রণয়ন ছাড়াই। কিন্তু বিদ্যাসাগর সাধারণ, দুস্থ বিধবাদের বিবাহ চাইছিলেন। আইনের গ্রহণযোগ্যতা চাইছিলেন৷ তাই তাঁদের বোধগম্য রীতিরেওয়াজ অনুসারেই বিয়ে চাইছিলেন। শাস্ত্র খুঁড়ে শ্লোক বের করা, তার বিধবাবিবাহ-মুখী ব্যাখ্যা করারও একই কারণ।
বিল তো পাশ হল। কিন্তু তা কার্যকর করা আরও বড় ঝক্কি। প্রথম যে বিবাহটি হল, পরিস্থিতির জটিলতা তাতেই বোঝা গেল৷ শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন বিধবাবিবাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও পিছু হঠলেন মায়ের চাপে৷
কিন্তু ঘটনাচক্রে মা-ভাইরা রাজি হলেন। বিদ্যাসাগর তথা বরযাত্রীদের জন্য ছিল পুলিশি প্রহরা৷ দশ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল প্রায় সওয়া দুশো বছর আগে অনুষ্ঠিত সেই বিয়েতে। কনে কালীমতি, বয়স মাত্র দশ। তার প্রথম বিয়ে হয়েছিল চার বছর বয়সে। ছয় বছর বয়সে সে বিধবা হয়।
১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর (১২ অগ্রহায়ণ, ১২৬৩ বঙ্গাব্দ) উত্তর কলকাতার ১২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিট (এখন ৪৮ কৈলাশ বোস স্ট্রিট) ঠিকানায় বিয়েটি হয়। নিমন্ত্রিত ছিলেন আটশো জন। অবশ্য এ অন্য প্রসঙ্গ যে, এই কালীমতির মৃত্যুর পর শ্রীশচন্দ্রকে প্রায়শ্চিত্ত করেই ফের জাতে উঠতে হয়েছিল।
সমকালীন বুদ্ধিজীবীরা তখন কী করছেন? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত স্থূল কবিতা লিখছেন-- 'বাঁধিয়াছে দলাদলি লাগিয়াছে গোল/বিধবার বিয়ে হবে‚ বাজিয়াছে ঢোল।'
বঙ্কিমচন্দ্র 'বিষবৃক্ষ'-এ সূর্যমুখীর পত্রে লিখছেন 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামে কলকাতায় কে না কি বড় পণ্ডিত আছেন। তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহের বহি বাহির করিয়াছেন। যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, তিনি যদি পণ্ডিত, তবে মূর্খ কে?' বিধবা মেয়েরা সাদা থান পরে, আধপেট খেয়ে থাকার মধ্যে বিবেকানন্দও দেখেছেন অপরিসীম সৌন্দর্য ও সহিষ্ণুতা।
কলকাতা শুধু নয়, গ্রামাঞ্চলেও বিধবাবিবাহ হতে লাগল। বিদ্যাসাগর সার্বিক দায়িত্ব নিতে থাকলেন। বিয়ের আর্থিক খরচও মূলত তিনিই বহন করতেন। ৬০টি বিবাহ দিতে তাঁর খরচ হয়েছিল ৮২০০০ টাকা, শোনা যায়। অন্যদিকে বিধবাবিবাহ যে পরিবারগুলিতে ঘটছিল, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বও তাঁকে নিতে হচ্ছিল বৈকি৷
এমনকি বিধবাবিবাহের পরও বউকে ছেড়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে বিদ্যাসাগরের থেকে টাকা নেওয়া হত, শোনা যায়। কিছু ক্ষেত্রে বহুবিবাহের ঘটনাও ঘটতে শুরু করল৷ সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্টের মধ্যে বিধবাবিবাহ-কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা এইবার অনুভব করলেন তিনিও৷ সেই সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট এল ১৮৭২ সালে।
ভাইকে চিঠিতে লিখেছিলেন, বিদ্যাসাগরের তত্ত্বাবধানে কলকাতায় বিয়ে হলে বধূ অনেক গহনা পাবে, এই লোভে অনেকেই বিধবার বিবাহ দিতে চাইছেন বা বিধবাকে বিয়ে করতে চাইছেন৷ এরপর যেন পাত্রীদের বাবা-মাকে আগাম জানানো হয় যে গহনার ব্যবস্থা করতে তিনি অক্ষম। শুধু বিধবার জন্য পাত্রের ব্যবস্থা করতে পারেন।
অনেকে কথা দিয়েছিলেন, বিধবাবিবাহ আন্দোলনে এবং কিছু কিছু পরিচিত বিধবাদের পুনর্বিবাহের সাহায্য করবেন। কাজে নেমে ঈশ্বরচন্দ্র দেখলেন, তাদের টিকিটিও নজরে আসছে না। ব্যক্তিগত চিঠিতে দু-একজনকে অনুযোগ করেছেন, তাঁদের কথায় ভরসা করে তিনি ধার-বাকি করে ফেলেছেন, অথচ, তাঁরা যে কিছু দেবেন না, তাও জানালেন না। পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি লিখছেন, ‘আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।’
আসলে শ্লোক-খোঁজায় নয়, বিধবাবিবাহ আইনের সীমাবদ্ধতা ছিল অন্যত্র। এই আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, বিধবাদের বিবাহ হলে পূর্ব-স্বামীর সম্পত্তিতে সব অধিকার তাঁরা হারাবেন৷ ফলে মধ্যবিত্তের সম্পদের মালিকানা বিষয়ক পিতৃতান্ত্রিক নীতিকে এই বিধবাবিবাহ আইন কোনওভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি৷ বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ বিধবাদের স্বনির্ভরতার ওপরেও জোর দেয়নি৷ পণপ্রথা ছাড়া বাবুসমাজে তাকে প্রতিষ্ঠা করাও তাঁর পক্ষে অসম্ভব হত৷ বালবিধবাদের বিবাহের হিল্লে এর মাধ্যমে হলেও, পরিণত বয়সে যাঁরা বিধবা হয়েছেন, তাঁদের দ্বিতীয় বিবাহ দেওয়ার আগ্রহ দেখা যায়নি এই আইনের পরে।
সামাজিক ব্যাভিচার কমেছিল কি? নাঃ, সংবাদপত্রে বিধবাবিবাহের সংবাদ যত না ছিল, তার তিনগুণ ছিল বিধবার ‘কিস্সা’। আইন প্রণয়নের থেকেও কঠিন সমাজমানসের সংস্কারসাধন৷ সে কাজ দীর্ঘমেয়াদি। সে কাজ একা বিদ্যাসাগরের ছিলও না৷
নারীশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। বিদ্যালয় পরিদর্শকের সরকারি পদে থাকার সুবাদে তিনি ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় এবং ১০০টি বাংলা স্কুল স্থাপন করেন। এমন এক সময়ে এসব তিনি করছেন যখন কিনা প্রবাদ ছিল, মেয়েরা লেখাপড়া করলে অল্প বয়সে বিধবা হয়। স্কুলগুলি স্থাপিত হয় বর্ধমান, মেদিনীপুর, নদীয়া, হুগলি ইত্যাদি জেলায়। এছাড়া ১৮৪৯ সালে কলকাতায় বেথুন সাহেবের সহযোগিতায় ‘হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়’ (বর্তমান বেথুন স্কুল) স্থাপন করা তো আছেই।
এখানে আবার সেই শাস্ত্রের আশ্রয় নেওয়ার প্রসঙ্গটি আসবে। ঘোড়ার গাড়ি বা পালকিতে চেপে ছাত্রীরা বিদ্যালয়ে আসত৷ বাস্তববাদী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিদ্যাসাগরের পরামর্শে সেই গাড়ি বা পালকির গায়ে খোদাই করে দেওয়া হয়েছিল মহানির্বাণতন্ত্রের মন্ত্র-- 'কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষনীয়াতি যত্নতঃ'।
তিনি বিলক্ষণ জানতেন শাস্ত্রের দোহাই না পাড়লে ধর্মভীরু মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে না৷। তিনি শাস্ত্রীয় শ্লোক ব্যবহার করেছিলাম কি না, তা গৌণ হয়ে যায়, যখন দেখা যায়, ঈশ্বরচন্দ্র নারীশিক্ষার ব্যাপারে কলকাতায় আবদ্ধ না থেকে বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী ছিলেন।
শিক্ষানুরাগী মিস মেরি কার্পেন্টারের সঙ্গে একটি বিষয়ে বিদ্যাসাগরের মতপার্থক্য দেখা যায়। মিস কার্পেন্টার এদেশীয় শিক্ষিকা গড়ে তোলার জন্য বেথুন স্কুলে একটি নর্মাল স্কুল তৈরির চেষ্টা করলেন। তখন একটি পত্রে বিদ্যাসাগর ছোটলাট উইলিয়াম গ্রে-কে লিখলেন, মিস কার্পেন্টারের পথ বাস্তবোচিত নয়। ছোট বালিকাদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে যে জাতির এত আপত্তি, তারা পরিণত বিবাহিতাদের শিক্ষিকা হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে পাঠাবেন না। বিধবাদের অবশ্য এই কাজে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাড়ির বাইরে পা রাখলে তারা আবার কলঙ্কিত হবেন। আজকের দিনে বিদ্যাসাগরের এই মতও অপ্রগতিশীল মনে হতে পারে। যাইহোক, 'ফিমেল নর্মাল স্কুল' তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ কিন্তু কয়েকবছর চলার পর দেখা যায়, বিদ্যাসাগর খুব ভুল বলেননি। সুফল না পাওয়ায় পরে এই স্কুল তুলে দিতে হয়৷
সমালোচনা হতে পারে আরও নানারকম। বিদ্যাসাগর নিজের স্ত্রীর শিক্ষালাভের চেষ্টা করেননি৷ তাঁর কন্যারাও শিক্ষার আলো পেলেন কই? তাঁর পিতা ঠাকুরদাসের এতে মত ছিল না যে! আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, সেই যে দশমবর্ষীয়া বিধবা কালীমতি, প্রথম বিধবাবিবাহের কনেটি, তাকে শিক্ষালয়ে নিয়ে যাওয়াই কি উচিত হত না, দশ বছর বয়সে পুনরায় বিয়ে দেওয়ার চেয়ে? প্রশ্ন থাকবেই, কারণ তিনি ছিলেন সহমর্মী এক কর্মী, তিনি ঈশ্বর নন।
তা সত্ত্বেও, শিক্ষাভিলাষী নারীর প্রতি তাঁর ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন ও অভিনন্দন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮৬ সালে শ্রীমতী চন্দ্রমুখী বসু প্রথম এমএ পাশ করেন। বিদ্যাসাগর তখন তাঁকে একটি সচিত্র শেক্সপিয়র সমগ্র উপহার দিয়েছিলেন, স্বহস্তে লিখেছিলেন আশীর্বাণী। পরবর্তী জীবনে কর্মটাঁড়ে, বর্তমান ঝাড়খণ্ডে তিনি যে মেয়ে-স্কুল তৈরি করেন, আদিবাসী বালিকাদের জন্য প্রথম স্কুলও সম্ভবত সেটিই।
আজকের অ্যাক্টিভিজমে তিনি কীভাবে প্রাসঙ্গিক? সেই যে তাঁর কথায় কথায় শাস্ত্র টেনে আনার প্রবণতা, তাকেই বা কী চোখে দেখব? কয়েক বছর আগে পর্যন্তও ভাবতাম, একবিংশ শতকে একটি সেকিউলার দেশে আর এসব হ্যাপা পোয়াতে হয় না, ভাগ্যিস!
কিন্তু বিদ্যাসগর, যিনি এককালে এও বলেছিলেন যে সংস্কৃত কলেজের সিলেবাসে তিনি বেদান্ত বা সাংখ্য চান না, কারণ নবজাগরণে তাদের বিশেষ ভূমিকা নেই, তিনিই আবার শিখিয়েছিলেন, বিপক্ষকে পরাস্ত করতে কখনও কখনও বিপক্ষের ডিসকোর্সকেই অবলম্বন করতে হয়৷
(লেখক সমাজকর্মী, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার)